× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চরমপন্থিদের উত্থান

এমপি প্রার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ৯ জেলায়

তানভীর হাসান

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২১ এএম

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৫:১৫ পিএম

এমপি প্রার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ৯ জেলায়

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন চরমপন্থী সংগঠনের সন্ত্রাসীরা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠছে। প্রকাশ্যে চলে এসেছে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকা সংগঠনের সদস্যরা। তাদের আনাগোনা বেড়েছে দুর্গম এলাকাগুলোতে। ফলে সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ। সাম্প্রতিক কয়েকটি খুনের পেছনেও নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনগুলোর সদস্যদের সরাসরি সম্পৃক্ততা মিলেছে। ভোটের ময়দানে প্রার্থীদের পক্ষ নিয়েও চরমপন্থীদের মাঠে নামার আশঙ্কা রয়েছে, যা আতঙ্কিত করে তুলছে সাধারণ ভোটারদের। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ইতোমধ্যে বিষয়টি আমলে নিয়ে র‌্যাব-পুলিশ চরমপন্থীদের তালিকা নিয়ে মাঠে নেমেছে বলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের আইজি বাহারুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু করতে বাংলাদেশ পুলিশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেকোনো ধরনের পেশাদার অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অপরেশন ডেভিলহান্ট-২ চালু রয়েছে।’ প্রতিদিনই তালিকাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর অনেক পেশাদার আসামি জামিনে মুক্ত হয়েছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই নতুন করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়ায় তাদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একসময় চরমপন্থীদের উপস্থিতি ছিল। তারা যদি নতুন করে অপরাধে জড়ানোর চেষ্টা চালায় তাহলে কঠোর হাতে দমন করা হবে।’ 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হত্যাসহ অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মাঠে নামানো হয় গোয়েন্দাদের। তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসেÑ নাটোর, পাবনা, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, সাতক্ষীরা ও বরিশাল জেলায় হঠাৎ চরমপন্থী গ্রুপের সদস্যদের তৎপরতা বেড়েছে। তারা ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর এলাকায় ফিরে পুরাতন রূপে চলাফেরা শুরু করেছে। এর মাঝে অনেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ও বাগিয়ে নিয়েছেন। এ কারণে স্থানীয়রা তাদের সমীহ করে চলতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কিছু জায়গায় চরমপন্থীরা পুরনো শত্রুদেরও হুমকি-ধমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা চরমপন্থীরা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি ও জনযুদ্ধের মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যরা পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে। এমনকি সুন্দরবনের দুর্ধর্ষ ডাকাত দলের সদস্যরাও লোকালয়ে ফিরছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব সংগঠনের সদস্যরা রাতের আঁধারে বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় গোপন বৈঠক করছে। চাঁদা ও অর্থ সংগ্রহ করছে। নতুন সদস্য সংগ্রহের মাধ্যমে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করছে। তারা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এলাকায় প্রভাব বিস্তারেরও চেষ্টা চালাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার ত্রিবেণী ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর শ্মশানঘাট এলাকার হানিফ আলী, লিটন হোসেন ও রাইসুল ইসলামকে খুন করে আলোচনায় আসে চরমপন্থী গ্রুপের সদস্যরা। এরপর হত্যার দায় স্বীকার করে ‘জাসদ গণবাহিনীর কালু’ পরিচয় দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠানো হয়।’

হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় দাবি করা হয়, ‘এতদ্বারা ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনাবাসীর উদ্দেশে জানানো যাইতেছে যে, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি নামধারী কুখ্যাত ডাকাত বাহিনীর শীর্ষ নেতা অসংখ্য খুন, গুম, দখলদারি, ডাকাতি, ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত হরিণাকুন্ডু নিবাসী মো. হানিফ তার দুই সহযোগীসহ জাসদ গণবাহিনীর সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন। তাদের লাশ রামচন্দ্রপুর ও পিয়ারপুর ক্যানালের পাশে রাখা আছে। অত্র অঞ্চলের হানিফের সহযোগীদের শুধরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। অন্যথায় আপনাদের একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। কালু জাসদ গণবাহিনী।’

জানা যায়, এরপর থেকেই পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, হকগ্রুগ ও লাল পতাকার সদস্যরা এক হয়ে প্রতিশোধের নেশায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। যদিও অপরাধীরা ঘটনা ঘটিয়ে পাশের একটি দেশে চলে যায় বলে তদন্তে উঠে আসে। তবে তাদের অনেক সহযোগী এখন মাগুরা ও যশোরের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে আছেন। সম্প্রতি যশোর বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনের খুনের ঘটনায় তারই জামাতা বাসেদ আলীকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে ভাড়াটে খুনি হিসেবে আসাবুল ইসলাম সাগর নামে এক চরমপন্থীর নাম। জানা যায়, আসাবুল ইসলাম সাগর একসময় ‘হক’ গ্রুপের হয়ে কাজ করত। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর এলাকায় ফিরে এসে হক গ্রুপকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিল। এ ছাড়া পাবনা জেলার ঈশ্বরদীতেও চর ও বালুমহাল দখলে চরমপন্থী ক্যাডারদের অস্ত্রের মহড়ার অভিযোগ উঠেছে। সাতক্ষীরা জেলায় ঘের দখলে চরমপন্থী গ্রুপের নেতা শৈলেনের নাম এসেছে। যদিও শৈলেন বেঁচে আছে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত নয় স্থানীয় পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরে তার ভারতে পলাতক থাকার কথা বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। 

এদিকে কুষ্টিয়ার চরমপন্থী আন্দোলনে ‘দাদা তপন’ (আব্দুল খালেক তপন) গ্রুপের শীর্ষস্থানীয় নেতা টিক্কা (টিক্কা শেখ) ও একদিল নিহত হলেও তাদের ক্যাডাররা আবারও সক্রিয় বলে পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে। মাগুরা জেলায় লালনের ক্যাডার, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে লাল্টু গাজীর ক্যাডারদের নাম আলোচনায় এসেছে। তবে গ্রেপ্তারের স্বার্থে এখনই সব ক্যাডারের নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা। জানা যায়, আলোচিত চরমপন্থী নেতাদের বেশিরভাগেরই বয়স এখন অনেক বেশি। এ কারণে তারা তরুণদের দলে ভেড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে চরমপন্থীদের ভয়ে তটস্থ স্থানীয়দের অনেককেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিতেও দেখা গেছে। 

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের থানাগুলোতে মোট ৫৩৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে খুলনা বিভাগে ৩৪৯ আর বরিশাল বিভাগে ১৮৬টি মামলা হয়। খুলনা বিভাগে থানাগুলোয় জানুয়ারিতে ৩০টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৩, মার্চে ৩৭, এপ্রিলে ৩৪, মে মাসে ৪১, জুনে ৩১, জুলাইয়ে ২৭, আগস্টে ৩৫, সেপ্টেম্বরে ২৮, অক্টোবরে ৩৯ ও নভেম্বরে ২৪টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগের থানাগুলোয় জানুয়ারিতে ১৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়। ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও এপ্রিলে ১৮টি করে মামলা নথিভুক্ত হয়। এ ছাড়া মে মাসে ১৬টি, জুনে ৯, জুলাইয়ে ১৬, আগস্টে ১৮, সেপ্টেম্বরে ১৮, অক্টোবরে ১৬ এবং নভেম্বরে সর্বোচ্চ ২৪টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়।

জানা গেছে, ১৯৯৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চরমপন্থীদের হাতে নিহত হন চার শতাধিক মানুষ। পাবনা, সিরাজগঞ্জ এলাকায় সত্তরের দশকে কিছু উগ্র বামপন্থী দল থাকলেও এখন আর তারা নেই। এর মধ্যে রয়েছে জাসদ গণবাহিনী, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (সর্বহারা), লাল পতাকা এবং গণমুক্তি ফৌজের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠী। এদের অনেকেই দলছুট হয়ে চুরি-ডাকাতির মতো কাজ করতে শুরু করে। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রমতেÑ বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও সামাজিক অসাম্যকে কেন্দ্র করে সত্তরের দশকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদে সশস্ত্র চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থান হয়। এরপর খুলনা ও বরিশাল বিভাগে একের পর এক খুন-ডাকাতির মতো অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে। এভাবে টানা দুই যুগেরও বেশি সময় এ জনপদে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছিল চরমপন্থী গ্রুপগুলো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তৎপরতায় চরমপন্থী গ্রুপের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতৃত্ব ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান। গ্রেপ্তার হয়ে অনেকে জেলেও যান। আবার কেউ কেউ জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নেয় প্রতিবেশী দেশেও।

জানা যায়, ১৯৯৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অন্তত দেড় হাজার চরমপন্থী আত্মসমর্পণ করে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যে সে সময় সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে তৎকালীন সরকার চরমপন্থীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। সরকারের ঘোষণায় সাড়া দিয়ে দুই হাজারের বেশি চরমপন্থী অস্ত্রসমর্পণ করেছিল। তবে চরমপন্থী সংগঠনগুলোর সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আত্মসমর্পণ করালেও সে সময় তাদের মামলা প্রত্যাহার না হওয়ায় ধীরে ধীরে অনেকে আবারও পুরনো পথে ফিরে যায়। ১৯৯৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল জেলায় আধিপত্য নিয়ে চরমপন্থীদের হাতে নিহত হয় চারশর বেশি মানুষ।

চরমপন্থী এলাকার কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু চরমপন্থী কারাগার থেকে বের হয়ে এসেছেন। যারা আত্মসমর্পণ করেছিল তাদের অনেকে আবারও পুরনো পেশায় ফিরে গেছেন। এমনকি আনসারে চাকরি পাওয়া সদস্যরাও চাকরি ছেড়ে নানা অপকর্ম করছেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। আমরা সতর্ক আছি। চরমপন্থীদের তৎপরতা প্রতিরোধ করতে যা যা করা দরকার পুলিশ তাই করছে ও করবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা