আরমান হেকিম
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৫ এএম
কাগজে-কলমে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের আকার এখন প্রায় অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার বা ৪৭০ বিলিয়ন ডলার। এই অঙ্কের পদ্ধতিগত নির্ভুলতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাস্তবতা হলোÑ ৫৪ বছরের দীর্ঘ যাত্রায় দেশ এই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। আর সেই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে ২০৩৫ সালের মধ্যে জিডিপিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা সামনে নিয়ে এসেছে বিএনপি। অর্থাৎ দলটিকে এক দশকের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে দেশকে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণেরও বেশি করার লক্ষ্য নিয়ে এগোতে হবে। এই লক্ষ্য বাস্তবসম্মত নাকি রাজনৈতিক উচ্চারণ সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করে, তাত্ত্বিকভাবে এটি অসম্ভব নয়। যদি
টানা এক দশক ৮ শতাংশ বা তার বেশি হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা যায়, তাহলে ২০৩৫
সালের মধ্যে বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু বাস্তব চিত্র
ভিন্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। বিশ্বব্যাংক
ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাসেও সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত নেই।
উচ্চ প্রবৃদ্ধি এখানে নিয়ম নয়, ব্যতিক্রম
বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, উচ্চ প্রবৃদ্ধি এখানে
ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র আড়াই
শতাংশ। সত্তরের ও আশির দশকে গড় প্রবৃদ্ধি তিন শতাংশের কাছাকাছি ছিল। নব্বইয়ের দশকে
বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধি সীমাবদ্ধ ছিল ৪ থেকে ৫ শতাংশে। মূলত ২০০০
সালের পর থেকেই প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ৫ শতাংশ ছাড়ায়। ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রথমবার
৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি আসে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭ শতাংশ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ শতাংশের
ঘর ছোঁয়া সম্ভব হয়। কিন্তু সেই উচ্চ প্রবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। করোনা মহামারিতে প্রবৃদ্ধি
নেমে আসে, আর পরবর্তী পুনরুদ্ধারও ছিল দুর্বল ও অসম।
সাম্প্রতিক অর্থবছরগুলোর চিত্রেও অস্থিরতা স্পষ্ট। ২০২২-২৩ অর্থবছরে
প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকে কিছুটা
গতি দেখা গেলেও সামগ্রিকভাবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে সেই গতি প্রতিফলিত হয়নি।
একই সময়ে মূল্যস্ফীতি উচ্চ হারে এক অঙ্কে আটকে আছে, যা প্রবৃদ্ধির গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত
করছে।
কী বলছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের
মতে, বাংলাদেশ এখন একধরনের দুষ্টচক্রে আটকে পড়েছে। তার ভাষায়, অর্থনীতি শক্ত মাটিতে
আছে নাকি চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। রাজনৈতিক অস্থিরতা
দীর্ঘ হলে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। তিনি মনে করেন, মসৃণ
রাজনৈতিক উত্তরণ হলে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর
পূর্বাভাস সে সম্ভাবনাকে সমর্থন করে না।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন আরও স্পষ্ট করে বলেন,
নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বড় ধরনের উল্লম্ফন ছাড়া ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি বাস্তবসম্মত
নয়। করোনা-পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান যে ধাক্কা খেয়েছে, তা এখনও কাটেনি। প্রতিবছর
বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের বড় অংশ কাজ পাচ্ছে না, আবার
শিল্প খাত দক্ষ জনবলের সংকটে ভুগছে। এতে শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের গভীর অসামঞ্জস্য
স্পষ্ট হয়। এই কাঠামোগত সমস্যার সমাধান ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না।
অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমানের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন
ডলার অর্থনীতিতে পৌঁছাতে হলে প্রতিবছর ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বছরে অন্তত
১০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির,
বিদেশি বিনিয়োগ কমছে, ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের চাপে নড়বড়ে। ব্যাংক ব্যবস্থা
থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার তথ্য, একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন এবং
রাজস্ব ঘাটতিÑ সব মিলিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও সংকুচিত হয়েছে।
তবে গ্লোবাল ম্যানেজমেন্ট কনসালটিং ফার্ম বোস্টন কনসালটিং গ্রুপের
(বিসিজি) ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত এক সমীক্ষা জানাচ্ছে, প্রবৃদ্ধি যদি যদি
৫ শতাংশেও নামে, তাতেও ২০৪০ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মাইলফলকে পৌঁছে
যাবে বাংলাদেশ।
কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলো
এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর ঘোষণাও আলোচনায় এসেছে। বিএনপি ক্ষমতায়
এলে দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কাঠামোগত সংস্কার এবং বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির কথা
বলছে। এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন, বাজারের নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ
ও প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তরের অঙ্গীকার করছে দেশের প্রধান এ দল। তবে অর্থনীতিবিদদের
মতে, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান
এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। শুধু ঘোষণা বা উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য যথেষ্ট
নয়।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও দুর্নীতি দমনের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা
করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছেÑ যাতে আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে
দেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারে রূপান্তরিত করা যায়। সাবেক সিনিয়র সচিব মো. শফিউল্লাহ
গত বছরের ২৯ নভেম্বর ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫’-এর তৃতীয় অধিবেশনে অংশ নিয়ে
জামায়াতে ইসলামীর এই লক্ষ্যের কথা জানান।
এদিকে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি নতুন করে চাপে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের
দারিদ্র্য ও বৈষম্য মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার
নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্য হ্রাসে যে অগ্রগতি
হয়েছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা উল্টো পথে হাঁটছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি হলেও যদি তা কর্মসংস্থান
ও আয়বৃদ্ধিতে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির সামাজিক ভিত্তি দুর্বলই
থেকে যাবে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটা কেবল অঙ্কের নয়। ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়নে নেওয়া মানে শুধু জিডিপির আকার বাড়ানো নয়, বরং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা, সুশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সমন্বিত রূপান্তর। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, গড়পড়তা ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ শতাংশ স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে পারলেও বাংলাদেশ বড় অর্থনীতির কাতারে যাবে। তার ওপরে উঠতে হলে উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি কঠিন বাস্তব সংস্কারের পথেই হাঁটতে হবে।