তানভীর হাসান
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৯ এএম
প্রতীকী ছবি
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এতে যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে, তেমনি জনমনেও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে চলাফেরা করছেন। পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, গত বছর অন্তত ১০২ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। সর্বশেষ চলতি বছরের শুরুতেই গত এক সপ্তাহে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন বিএনপি নেতা। অভিযোগ উঠেছে, অনেক ক্ষেত্রে ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্যাডার ও পেশাদার অপরাধীদের। জামিনে মুক্ত এবং গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া পেশাদার অপরাধীরাও পুলিশের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে বলে সংস্থাটির উচ্চপর্যায় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযানের মধ্যেও ব্যাপক খুনোখুনি
এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে শুরু
হয়েছে অপারেশন ডেভিল হান্টের দ্বিতীয় পর্ব। কিন্তু এ অভিযান চলার মধ্যেই গত ৫ জানুয়ারি যশোরে ব্যবসায়ী প্রতাপ বৈরাগী ও চট্রগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা জানে আলমকে
হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক
দলের সাবেক সদস্য সচিব আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি
করে খুন করা হয়। এর আগে গত ১৭ নভেম্বর পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব
গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় ওসমান হাদির
মৃত্যুর ঘটনা। চলন্ত মোটরসাইকেলে বসে খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করা হয়। এ খুনের পেছনেও
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জড়িতÑ এমন অভিযোগ উঠেছে। আবার খুন হওয়ার ভয়ে স্বেচ্ছাসেবক
দলের সভাপতি এসএম জিলানিকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে দেখা
গেছে। একটি ভিডিও ফুটেজে তাকে বলতে দেখা গেছে, নিরাপত্তাহীতার কারণে তিনি এই জ্যাকেট
পরেছেন। এছাড়া গতকাল গাজীপুরে এক এনসিপি নেতাকে গুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে তিনি প্রাণে
বেঁচে গেলেও দুর্বৃত্তরা তার মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের দাবি, রাজনৈতিক নেতা খুন হলে বেশি আলোচিত হয়। এ কারণে হয়তো কোনো একটি পক্ষ বেছে বেছে নেতাদের খুন করছে। এর পেছনে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও ধারণা করছেন তারা।
২০২৫ সালে সারা দেশে ৩৭৮৫ খুন,
৪০২ রাজনৈতিক সহিংসতা
পুলিশ সদরের তথ্যমতে, গত এক বছরে
সারা দেশে ৩৭৮৫ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৯৪, ফেব্রুয়ারিতে
৩০০, মার্চে ৩১৬, এপ্রিলে ৩৩৬, মে মাসে ৩৪১, জুনে ৩৪৪, জুলাইতে ৩৬২, আগস্টে ৩২১, সেপ্টেম্বরে
২৯৭, অক্টেবরে ৩১৯, নভেম্বরে ২৭৯ ও ডিসেম্বর মাসে ২৭৬ জন খুন হন। পুলিশের দাবি, এসব
খুনের মধ্যে বেশিরভাগেরই রহস্যভেদ করা সম্ভব হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে ভাড়াটে খুনি দিয়ে
খুনের সংখ্যা বেশি। এই খুনিদের অনেকেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্ত হয়ে এলাকায়
ফিরেছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্যনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৪৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হয়েছেন। এই সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অন্তত ৩৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৫৪ জন আহত এবং নিহত হয়েছেন ১০ জন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৫২০ জন আহত এবং ৩ মারা গেছেন। বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে ৪টি সহিংস সংঘর্ষের ঘটনায় শতাধিক আহত হয়েছেন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে ১৯২টি সংঘর্ষে ৩৯ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ২৩৮০ জন।
যা
বলছে পুলিশ
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের
এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সবসময়ই
কাজ করে যাচ্ছে। তারপরও কিছু ঘটনা ঘটে গেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তারে
অভিযান চালাচ্ছে। পাশাপাশি অনেক ঘটনার রহস্যও উদঘাটন করা হয়েছে। অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিকে
এরই মধ্যে গানম্যান দেওয়া হয়েছে। আরও অনেককেই দেওয়ার প্রক্রিয়া অব্যাহত। যদি কোনো ব্যক্তি
নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে তিনি গানম্যানের জন্য আবেদনও করতে পারেন।’
পুলিশ সদর দপ্তরের
ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘হঠাৎ খুনোখুনি নিয়ে আমাদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা আছে। এ বিষয়ে পুলিশ
সদর দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও বিস্তারিত
আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া বন্দি, চরমপন্থী
ও আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসীদের কীভাবে আইনের আওতায় আনা যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা
চলছে। পতিত আওয়ামী লীগ এসব অপরাধী ব্যবহার করছে বলে গোয়েন্দা
সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।’
তিনি বলেন, কারাগার
ভেঙে পালিয়ে যাওয়া বন্দিরা দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারা বিভিন্ন মামলার আসামি। দেশের চলমান খুন, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের
মতো অপরাধগুলোর পেছনে পালিয়ে যাওয়া অপরাধীদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা পলাতক সন্ত্রাসীদের
ইতোমধ্যে যশোরের মনিরামপুরে রানা প্রতাপ বৈরাগী এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করেছে
দুর্বৃত্তরা। গত সোমবার সন্ধ্যায় মনিরামপুরের কপালিয়া বাজারে এই ঘটনা ঘটে। তিনি একসময়
চরমপন্থী দলের সদস্য ছিলেন। তার নামে মামলাও রয়েছে। ব্যবসায়িক ও চরমপন্থী দলগুলোর বিরোধের
জেরে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের হাতে তিনি খুন হতে পারেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। তাছাড়া গত শনিবার যশোর শহরের শংকরপুরে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে গুলি
করে হত্যা করা হয়। সোমবার রাতে চট্টগ্রামের রাউজানে ফের একজনকে গুলি করে হত্যা করা
হয়েছে। তিনি উপজেলা যুবদলের সাবেক সিনিয়র সদস্য ছিলেন।
সূত্রমতে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের
শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ইচ্ছা করেই এতদিন কারাগার থেকে বের হননি।
জামিনের পরও তারা নানা কৌশলে কারাগারে
থেকে যান। কিন্তু পটপরিবর্তনের পর কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী
বের হয়ে নিজ এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালান। এ
নিয়েও খুনোখুনির ঘটনা বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধীদের মামলা, জামিন, গ্রেপ্তার
ও সামগ্রিক কার্যক্রমের ওপর পুলিশের বিশেষ শাখাসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার
নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সতর্ক
থাকতে পুলিশ সদর দপ্তর সবক’টি ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার এসপিদের
বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে।
জানতে চাইলে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আধিপত্য
বিস্তার, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের জন্যই টার্গেট কিলিং কিংবা রাজনৈতিক নেতাকর্মী
হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বাড়ছে। এসব ঘটনা যখন ক্রমাগত বাড়তে থাকে তখন আইনশৃঙ্খলা
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর যে সক্ষমতা, তাতে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
আর এই ঘাটতি বিভিন্ন অপরাধে কাজে লাগাচ্ছেন অপরাধীরা।’