আবু কাওসার
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৬ এএম
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৩২ পিএম
যদি বলা হয় এই মুহূর্তে অর্থনীতির সবচেয়ে খারাপ খবর কী? সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবেন যে, জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিই এক নম্বর সমস্যা। বিশেষ করে চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন দাম বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠে গেছে। তবে হঠাৎ করেই এই মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। মূলত ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যমূল্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে। বর্তমানে যা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এর মূল কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। গত তিন বছর ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এর ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। পক্ষান্তরে মজুরি না বাড়ায় অনেকেই সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। গ্রাম-শহর উভয় জায়গাতেই আয়বৈষম্য আরও চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। শহরে ভিক্ষুকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে, যা সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।
পরিসংখ্যানে দেখা
গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে। পরিতাপের
বিষয় হলোÑ ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পর অনেক দেশই কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি
নিয়ন্ত্রণ করেছে। কিন্তু নীতি-সুদহার বাড়ানোসহ নানা উদ্যোগ নিলেও কার্যত ব্যর্থ হয়েছে
বাংলাদেশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বরে সামগ্রিকভাবে
মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৪৯ শতাংশ। এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশের
দেশ ভারতে মূল্যস্ফীতির হার এখন দশমিক ২৫ শতাংশ। দেউলিয়া অর্থনীতি থেকে ফিরে আসা শ্রীলঙ্কার
মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ১ শতাংশ। জেন-জির বিক্ষোভে নেপালে ওলি সরকারের পতন ঘটলে গত বছরের
১২ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেয় একটি অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকার এরই মধ্যে নির্বাচনের
তারিখ ঘোষণা দিয়েছে, যা হবে আগামী ৫ মার্চ। ফলে কেটেছে অনিশ্চয়তা। এর প্রভাবও আছে মূল্যস্ফীতিতে।
এই হার ১ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। মূল্যস্ফীতিতে পাকিস্তানই এখন কেবল বাংলাদেশের কাছাকাছি
অবস্থায় আছে। দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এর বাইরে ভুটান ও মালদ্বীপের
মূল্যস্ফীতির হার যথাক্রমে ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
এ কথা ঠিক যে, ক্ষমতাচ্যুত
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে মানুষের মধ্যে
অসন্তোষ ছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার
বিদায় নেওয়ার পর জনগণের মধ্যে বিশ্বাস ছিল, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন
অন্তর্বর্তী সরকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। বর্তমান
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ও মূল্যস্ফীতি কমাতে নিত্যপণ্যের
ওপর থেকে শুল্ক-কর প্রত্যাহার, নীতিসুদহার বৃদ্ধিসহ নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু
কোনো পদক্ষেপই কাজে আসেনি। বরং মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে
জিনিসপত্রের দাম।
মূল্যস্ফীতির
প্রভাব
রাজধানীর বাড্ডার
গৃহিণী নিলুফার ইয়াসমীন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এক বছর আগে যে খরচে সংসার চালিয়েছি,
সেই টাকায় এখন সংসার চলে না। সরকারি চাকরিজীবী স্বামীর আয় নির্ধারিত। মাস ফুরোবার আগেই
টাকা শেষ হয়ে যায়। প্রতি মাসেই ধার করতে হয়। তিনি বলেন, গত বছর এক কেজি চাল কিনেছি
৭০ টাকায়। সেই চাল এখন ৮০ টাকা। বাড়িভাড়া বেড়েছে এক হাজার টাকা, যাতায়াতের খরচ
বেড়েছে, অথচ তার সংসারে কোনো আয় বাড়েনি। অভাব-অনটনের সংসারে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
মূল্যস্ফীতি এক
ধরনের করের মতো। আপনার প্রতি মাসে আয়ের পুরোটাই সংসার চালাতে খরচ হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ
জিনিসপত্রের দাম বাড়লে এবং সে অনুযায়ী আয় না বাড়লে আপনাকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে
হবে কিংবা খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হবে। মূল্যস্ফীতির
চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়।
দুই-তিন বছর ধরে
অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। অন্তর্বর্তী
সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। জাতীয়
রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) তেল, আলু, পেঁয়াজ, ডিমসহ বেশ কিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক-কর কমিয়ে
দেয়। বাজারে নিত্যপণ্যের আমদানিপ্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করা হয়। এতসব উদ্যোগের পরও
নিয়ন্ত্রণে আসেনি মূল্যস্ফীতি। ফলে কমেনি নিত্যপণ্যের দাম।
এদিকে বাংলাদেশে
বর্তমানে মূল্যস্ফীতির যে হার প্রকাশ করে থাকে পরিসংখ্যান ব্যুরো, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা মনে করেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর অফিসিয়াল হিসাবের চেয়ে বাস্তব
বাজারদর অন্তত আরও ৬-৭ শতাংশ বেশি। দুই বছর আগে শ্রীলঙ্কায় যখন অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে
তখন মূল্যস্ফীতি ৬০ শতাংশে উঠেছিল। সরকারের সঠিক নীতির ফলে দেশটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে
সফল হয়েছে এবং অর্থনীতি নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কৃচ্ছ্রসাধন ও সুসংহত অর্থনৈতিক
ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা সরকার এই সফলতা অর্জন করেছে।
যোগাযোগ করা হলে
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের
সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি
কমানোর অস্ত্র প্রয়োগ করে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের মূল্যস্ফীতির মূল উৎস
চাহিদাজনিত নয়, বরং সরবরাহ ঘাটতি। আমদানি ব্যয়, বিনিময় হারে অস্থিতিশীলতা, বাজার সিন্ডিকেট
এবং দুর্বল বাজার তদারকিÑ এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে।
উদ্যোগ কার্যকর
হয়নি
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে
কয়েক দফা নীতি সুদ হার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু তা কোনো সুফল বয়ে আনেনি। ব্যবসায়ীরা
বলেছেন, নীতি সুদ হার বাড়ানোয় ব্যাংকঋণের সুদ হার বেড়েছে। এতে করে বেড়েছে ব্যবসার খরচ।
ফলে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে
ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিনিয়োগে আগ্রহ কম। ঋণের সুদ আরও বাড়লে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত
হবে।
ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তরা
বলেছেন, বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে ঋণের সুদ হার ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ। এত বেশি উচ্চ সুদে কোনো
ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, খাদ্যপণ্যের
মূল্যবৃদ্ধির জন্য সরবরাহ ব্যবস্থা প্রধানত দায়ী। এই জায়গাতে নিবিড় তদারকি দরকার। কোথায়
কোথায় খরচ বেড়ে যাচ্ছেÑ সেটা যদি চিহ্নিত করা যায় তাহলে এর সমাধান সহজ হবে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক
এক সমীক্ষার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, মোট পণ্যমূল্যের ২২ থেকে ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত পরিবহন
খাতে ব্যয় হয়। এই ব্যয় যৌক্তিকভাবে হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। যেখানে অন্যান্য
দেশে এই খরচ মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ সেখানে আমাদের দেশে খরচ হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি।
সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি করতে হলে এই জায়গাতে বেশি নজর দিতে হবে বলে জানান তিনি। সরবরাহ
ব্যবস্থায় কোথায় কোথায় দাম বাড়ছে তা নির্ধারণে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যৌথ সমীক্ষা
করার পরামর্শ দেন এই ব্যবসায়ী নেতা। প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশ কীভাবে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ
করছে সে পদ্ধতি অনুসরণেরও প্রস্তাব করেন তিনি।