প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২২ ১৬:২৭ পিএম
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন নেছা। ছবি: সংগৃহীত
‘আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেলো।’ সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ দেখে চিৎকার করে উঠেছিলেন বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন তিনি।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভয়াল সেই রাতে ঘাতকের দল হত্যা করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বেগম ফজিলাতুন নেছা তাঁর সহধর্মিণী, আনন্দ-বেদনার সঙ্গী। কিন্তু কালক্রমে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে, এদেশের মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর নাম এত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়ে যে তিনি হয়ে ওঠেন বঙ্গমাতা।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন প্রায় ১৩ বছর। বঙ্গমাতা কেবল তাঁদের সংসারকেই আগলে রাখতেন নাÑতিনি ছিলেন কারাগারের বাইরের আন্দোলনকারী ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যকার সেতুবন্ধ।
‘কারাগারের রোজনামচা’য় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘জেল কারাগারে সাক্ষাৎ করতে যারা যায় নাই তারা বুঝতে পারে না সেটা কি বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক।... স্ত্রীর সাথে স্বামীর অনেক কথা থাকে কিন্তু বলার উপায় নেই। আমার মাঝে মাঝে মনে হতো স্ত্রীকে নিষেধ করে দেই। যাতে না আসে।’
১৯৫০ সালের শেষদিক। ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জের আদালতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি মামলার হাজিরা দিতে। মধুমতী নদীর ঘাটে নামার পর বঙ্গবন্ধু জানতে পারেন, আগের রাতেই ফজিলাতুন নেছা তাঁর মা, বাবা, ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঢাকায় রওনা হয়ে গেছেন তাঁকে দেখতে।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : ‘এক জাহাজে আমি এসেছি। আর এক জাহাজে ওরা ঢাকা গিয়েছে। দুই জাহাজের দেখাও হয়েছে একই নদীতে। শুধু দেখা হল না আমাদের। এক বৎসর দেখি না ওদের। মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল।’
কত ঝড়, কত ঝঞ্ঝা। কত নির্যাতন, কত নিপীড়ন। আর দুঃখ-দারিদ্র্য তো আছেই। কিন্তু কোনো কিছুই দূরত্ব রচনা করতে পারেনি তাঁদের দুজনের মধ্যে। আর এ ক্ষেত্রে তাঁদের দুজনকেই ছায়া দিয়েছে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম।
১৯৭২ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকীতে দৈনিক বাংলায় ফজিলাতুন নেছা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘কবিগুরুর আসন বঙ্গবন্ধুর অন্তরের অন্তস্তলে। রাজনৈতিক জীবনের উত্থানপতন দুঃখদৈন্য সর্বমুহূর্তে তাঁকে দেখতাম বিশ^কবির বাণী আবৃত্তি করতে। ‘বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে যেনো না করি আমি ভয়’ অথবা ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ প্রভৃতি অসংখ্য গানের টুকরো তিনি আবৃত্তি করে যেতেন দুঃখ-দৈন্য-হতাশায় ভরা অতীতের সেই দিনগুলোতে।’
প্রতিবারই জেলে যাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু বিশ্বকবির ‘সঞ্চয়িতা’টি হাতে তুলে নিতেন। কারাগারের নিঃসঙ্গতায় বঙ্গবন্ধুর একমাত্র সঙ্গী ছিল সঞ্চয়িতা। বইটির গায়ে পড়েছিল জেল-সেন্সরের অনেকগুলো সিল।
যত্নে রাখলেও বহুব্যবহারে বইটি পুরোনো হয়ে গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে জেলের সিল লাগা বিভিন্ন বইয়ে সমৃদ্ধ লাইব্রেরিটি ধ্বংস করে ফেলে।
বঙ্গমাতা বলেন, ‘কোনো কারণে আমি মনঃক্ষুণ্ন হলে বঙ্গবন্ধু আমাকে কবিগুরুর কবিতা শোনাবার প্রতিশ্রুতি দিতেন। আজও শত কাজের চাপে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও এতটুকু সময় পেলেই সন্তানদের নিয়ে তিনি কাব্য আলোচনা করেনÑআবৃত্তি শোনান পরিবারের লোকদের। রবীন্দ্র শতবার্ষিকীর সময় একবার একজন বিশ^স্ত লোককে দিয়ে আমি রবীন্দ্র রচনাবলির পুরো এক সেট কলকাতা থেকে আনিয়েছিলাম। ওর সামনে যখন উপহার হিসাবে বইগুলো উপস্থিত করলাম খুশির আবেগে তিনি তখন বিহ্বল হয়ে পড়লেন। উজ্জ্বল চোখ দুটো তুলে একবার শুধু তাকালেন। সে চোখে ছিল শিশুর মতো তৃপ্তি আর প্রগাঢ় কৃতজ্ঞতা।’
আর বঙ্গবন্ধুÑতিনি কী চোখে দেখতেন বেগম ফজিলাতুন নেছাকে? এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ‘আমার স্ত্রীর মতো সাহসী মেয়ে খুব কমই দেখা যায়। আমাকে যখন পিন্ডির ফৌজ বা পুলিশ এসে জেলে নিয়ে যায়, নানা অত্যাচার করে, আমি কবে ছাড়া পাবো বা কবে ফিরে আসবো ঠিক থাকে না, তখন সে কখনো ভেঙে পড়েনি। আমার জীবনের দুটি বৃহৎ অবলম্বন। প্রথমটি হলো আত্মবিশ^াস, দ্বিতীয়টি হলো আমার স্ত্রী আকৈশোর গৃহিণী।’
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সেই বিভীষিকার রাতে সপরিবারে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। তাঁকে হত্যার কথা শুনে বেগম ফজিলাতুন নেছা বলেন, ‘মরলে সবাই একসঙ্গেই মরব।’
এ কথা বলেই তিনি দরজা খুলে দেন। সেনাসদস্যরা তাঁকেসহ শেখ আবু নাসের, শেখ রাসেল ও রমাকে নিয়ে যাওয়ার সময় সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ দেখতে পান। কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেলো।’
কিন্তু ঘাতক সেনারা তাঁকে দোতলায় তাঁর কক্ষে নিয়ে যায়। ঘাতকদের গুলিতে সেখানেই শহীদ হন বঙ্গমাতা।