× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভোটের আগে বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে বিতর্ক

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৪ এএম

ভোটের আগে বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে বিতর্ক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ‘বিশেষ বরাদ্দ’ অনুমোদনকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সদ্য পদত্যাগকারী স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার অনুমোদন দেওয়া এসব বরাদ্দকে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দায়িত্বে থাকার সময় তিনি তার পক্ষপাতপুষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের নির্বাচনী এলাকায় প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে বড় অঙ্কের এই ‘বিশেষ বরাদ্দ’ অনুমোদন করেছেন। এই বিশেষ বরাদ্দ এমনকি নির্বাচন ঘিরে গড়ে ওঠা মোর্চার অন্যতম শরিক দলের প্রার্থীদের এলাকায়ও অনুমোদন করা হয়েছে। যেমনÑ নির্বাচনী মোর্চাভুক্ত অন্যতম দল জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদকের নির্বাচনী এলাকা খুলনায় একাধিক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিষয়টি নতুন দায়িত্ব পাওয়া উপদেষ্টা আদিলুর রহমানের নজরে এলে এ বরাদ্দ অনুমোদন নিয়মবহির্ভূত হলে স্থগিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ সময় মন্ত্রণালয়ে অনিয়ম-দুর্নীতিতে সক্রিয় সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে শুদ্ধি অভিযানও শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সাবেক উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পর্যায়ক্রমে গুরুত্বহীন দপ্তর অধিদপ্তরে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনপূর্ব এসব বরাদ্দের একটি বড় অংশ নগদ অর্থভিত্তিক প্রকল্পÑ যা নির্বাচনের আগে মাঠপর্যায়ে গেলে ভোটের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু আসনকে টার্গেট করে ধারাবাহিকভাবে বরাদ্দ অনুমোদনের বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। 

পদত্যাগের আগেই ‘আগাম অনুমোদন’ : তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের আগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া শুধু চলতি অর্থবছরের নয়, বরং ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে তৃতীয় কিস্তি হিসেবে ছাড় হওয়ার কথা থাকলেও সেইসব একাধিক বিশেষ বরাদ্দ প্রস্তাবেও সই করে গেছেন! এভাবে প্রস্তাব অনুমোদনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বরাদ্দের পথ আগাম উন্মুক্ত করে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন তফসিল ঘোষণার পর প্রচারাভিযান চলার সময় এসব প্রকল্পের জিও জারি হলে তা সরাসরি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল হবে। কারণ এসব উন্নয়ন প্রকল্প একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের এলাকায় বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন হলে নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ কার্যত বজায় থাকবে না।

৬৪ জেলা, ৪৯৫ উপজেলা ও ৩২৮ ইউপিতে টার্গেটেড বরাদ্দ : স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সারা দেশে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে টার্গেট করে বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। মোট বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রকল্পভেদে প্রতিটি বরাদ্দের পরিমাণ ২০ লাখ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত। মসজিদ, মন্দির, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, ছোট রাস্তা মেরামতের লক্ষ্যে দেওয়া এসব বরাদ্দের একটি বড় অংশ নগদ অর্থনির্ভর। এটি এখন স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মীদের হাতে গেলে নির্বাচন প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) উচিত বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে এভাবে নগদ অর্থভিত্তিক বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হলে তা কখনোই নিরপেক্ষ প্রশাসনের পরিচায়ক হতে পারে না। এটি সরাসরি ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, সদ্য পদত্যাগী উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ারও এ অনুমোদনের বিষয়ে দ্বিমত ছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ সিন্ডিকেট যারা উপদেষ্টাকে পরামর্শ দিয়ে পরিচালিত করতেন তারা এ বিষয়ে তাকে ভুল পরামর্শ দিয়েছেন।

জামায়াত নেতার আসনে নজিরবিহীন বরাদ্দ : সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে খুলনা জেলার একটি আসনে বিশেষ বরাদ্দ অনুমোদন নিয়ে। খুলনাতে দেওয়া প্রায় ৩১০টি বরাদ্দ প্রস্তাবের মধ্যে সর্বাধিক প্রকল্প এই সংসদীয় আসনে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে নির্বাচনে প্রার্থী একজন জামায়াতে ইসলামী নেতা তার প্রচারাভিযানে লাভবান হতে পারেন। এই প্রার্থীর নির্বাচনী আসন খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত খুলনা-৫ আসন (ফুলতলা-ডুমুরিয়া)। এ আসনে অর্ধশতাধিক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছেÑ আন্দুলিয়া বায়তুন নূর জামে মসজিদ সংস্কার, বরুনা বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ উন্নয়ন, বরুনা দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদ সংস্কার, দামোদর শীতলাতলা সার্বজনীন পূজা মন্দির সংস্কার, কালিকাপুর সার্বজনীন গোবিন্দ মন্দির উন্নয়ন, কাপালি ডাঙ্গা সার্বজনীন পূজা মন্দির সংস্কার ইত্যাদি। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আলি আসগর লবি প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। এই প্রার্থীর অভিযোগ, তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী গোলাম পরওয়ারের নির্বাচনী সুবিধা নিশ্চিত করতেই এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্প ছাড়ে কোনো অনুমতি না দিতে তিনি সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বলে জানা গেছে।

পুরনো বলয় সক্রিয় ছিল মন্ত্রণালয়ে : অভিযোগ রয়েছে, উপদেষ্টা পদত্যাগ করলেও তার ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা মন্ত্রণালয়ে বহাল ‍ও সক্রিয় ছিলেন। যাদের মধ্যে অন্যতম মন্ত্রণালয়ের সচিব, উপদেষ্টার পিএস, একজন উপসচিবসহ কয়েকজন কর্মকর্তা। বিষয়টি ‘টক অব দ্য সচিবালয়’ হওয়ায় নতুন উপদেষ্টারও নজরে আসে। এর কয়েক দিন পর মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টার পিএস (সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যাপক সুবিধাভোগী) ও একজন উপসচিবসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়। তবে সাবেক উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ সচিব এখনও বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। এই সচিব নিজ এলাকায় কবরস্থান উন্নয়নের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে আলোচিত। তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত। 

নতুন উপদেষ্টার সিদ্ধান্তে বিশেষ প্রকল্প স্থগিত হচ্ছে : গৃহায়ন ও শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এ মন্ত্রণালয়ে নতুন দায়িত্ব নেওয়ার পর আলোচিত সব প্রকল্পের বরাদ্দ আপাতত স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি এসব উন্নয়ন প্রকল্প কীভাবে অনুমোদিত হলো, তা নিয়ে চুলচেরা চলছে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এ ক্ষেত্রে ইসিকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। 

এ প্রসঙ্গে সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের আগে এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক বরাদ্দ স্পষ্টভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন। নির্বাচন কমিশনকে এখনই শক্ত অবস্থান নিতে হবে। শুধু বরাদ্দ স্থগিত করলেই হবে না। কারা এই প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন, তা চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সারা দেশে নির্দিষ্ট আসনভিত্তিক বিশেষ বরাদ্দ অনুমোদনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা সংসদ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।’ 

তার মতে, সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে উদ্দেশ্যমূলক কোনো বরাদ্দের জিও যেন জারি না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট কর্মকর্তাদের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন। কারণ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা