মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৫ এএম
আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৮ এএম
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা হত্যায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম রায় ঘোষণা করা হয়েছে গত ১৭ নভেম্বর। গণহত্যার দায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন ট্রাইব্যুনাল-১। তবে দুজনেই ভারতে পলাতক থাকায় তাদের রায় কার্যকর করা নিয়ে অনিশ্চয়তা, সন্দেহ ও সংশয় তৈরি হয়েছে শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা ও কামালকে কীভাবে দেশে আনা হবে, কীভাবে রায় কার্যকর করা হবেÑ এসব বিষয় সুরাহা করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতিও নেই।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ’২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। তাকে ফিরিয়ে আনতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের সঙ্গে চিঠি আদান-প্রদান শুরু হয়। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন গত ২৩ নভেম্বর গণমাধ্যমকে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালের প্রত্যর্পণ চেয়ে ২১ নভেস্বর দিল্লিকে পুনরায় চিঠি দিয়েছে ঢাকা। দিল্লির বাংলাদেশ মিশন থেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সরকার আরও একবার চিঠি দিয়েছে। তবে সেসব চিঠির বিপরীতে ভারত সরকারের কোনো সাড়া নেই।
মামলা ও রায়
গত বছরের ২৭ নভেম্বর ঢাকার পূর্বাচলের নতুন শহর প্রকল্পে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির পৃথক তিন মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাত বছর করে মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড দেয় ঢাকার পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ আদালত। শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ পৃথক তিন মামলায় আসামির সংখ্যা ৪৭। তবে ব্যক্তি হিসাবে এ সংখ্যা ২৩। আসামিদের মধ্যে একমাত্র মোহাম্মদ খুরশীদ আলম গ্রেপ্তার আছেন।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা ৫৮৩টি মামলার মধ্যে ৩২৪টি হত্যা মামলা, সাতটি দুদকের করা মামলা। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২৭টি মামলা আছে। সবকটিতে হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা যায়, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একটি মামলার রায় হওয়া ছাড়াও গুম-সংক্রান্ত একটি মামলায় চার্জশিট হয়েছে। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সেগুলোতে পর্যায়ক্রমে চার্জশিট দেওয়া হবে।
ভারতের সঙ্গে বন্দি বিনিময় চুক্তি
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ওয়েবসাইটে দুই দেশের মধ্যে হওয়া চুক্তির তথ্য আছে। চুক্তির একটি অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে। ২০১৩ সালের চুক্তিতে অনুচ্ছেদ আছে ১২টি। এর মধ্যে ১ ও ২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিচারিক কর্তৃপক্ষের দ্বারা বিচারাধীন, অভিযুক্ত, দোষী সাব্যস্ত বা দণ্ড কার্যকরের জন্য যাদের খোঁজ চলছে, সেই ব্যক্তিদের রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পাওয়া গেলে প্রত্যর্পণ করতে হবে। তবে অপরাধটি হতে হবে রাষ্ট্রের আইনে ন্যূনতম এক বছরের কারাদণ্ডযোগ্য। চুক্তির প্রয়োগ কোন ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হবে তা উল্লেখ আছে অনুচ্ছেদ ৬-এ। সেখানে বলা হয়েছে, যদি কোনো অপরাধের ধরন রাজনৈতিক বলে বিবেচিত হয়, তাহলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ গ্রহণ নাও হতে পারে। তবে হত্যা, হত্যার প্ররোচনা, অপহরণ, বে-আইনিভাবে জিম্মি করাসহ ১৩ ধরনের অপরাধ রাজনৈতিক হিসেবে বিবেচিত হবে না। প্রত্যর্পণ না করার ভিত্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে অনুচ্ছেদ ৮-এ। যাকে ফেরত চাওয়া হবে তিনি যদি অপরাধের মাত্রা, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় কিংবা অভিযোগটি ন্যায়বিচারের স্বার্থে আনা হয়নিÑ এসব বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেন তাহলে আশ্রয় দেওয়া রাষ্ট্র প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য নয়।
ভারতের মনোভাব
কংগ্রেস দলের সংসদ সদস্য ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিক শশী থারুর ভারতীয় একটি সংবাদসংস্থাকে সম্প্রতি দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যতদিন না শেখ হাসিনার আইনি দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করা হচ্ছে, ততদিন তিনি নিরাপত্তা পাওয়ার যোগ্য। তিনি আরও বলেন, প্রত্যর্পণ সম্পর্কিত বিষয়গুলো জটিল আইনি বিধান। এ কারণে বিষয়টি আমি সরকারের ওপরই ছেড়ে দেব, যাতে তারা যথাযথ বিবেচনা করে।
ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জিন্দাল গ্লোবাল ‘ল স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক অভিনব মেহরোত্রা ও অমিত উপাধ্যায় দ্য ডিপ্লোমেটে এক নিবন্ধে লিখেছেন, আইনি জটিলতার চেয়েও প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে মৃত্যুদণ্ড। শুধু ভারত নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন– এমন ব্যক্তির প্রত্যর্পণ নিরুৎসাহিত করা হয়। অতীতে ভারত মানবিক কারণ দেখিয়ে অনুরূপ পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকটি দেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা আরও লেখেন, প্রত্যর্পণের অনুরোধ কীভাবে পর্যালোচনা করা হবে, তা নির্ভর করবে ভারত যদি অতিরিক্ত নথিপত্র বা কোনো নিশ্চয়তা চায়, তবে প্রক্রিয়া আরও বিলম্বিত হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ভারত চাইলে এই দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব। তবে বাস্তবতা হলো এই দণ্ড কার্যকর করা বা শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো না। এ ছাড়া একজন রাজনৈতিক নেতাকে আশ্রয় দেওয়ার পর ফিরিয়ে দেওয়ার নজির নেই এবং বন্দি বিনিময় চুক্তির মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কাউকে ফেরত দেওয়ার সুযোগ নেই।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে উত্তেজনার প্রভাব
গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দু যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা এবং লাশ পোড়ানোর ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার আহ্বান জানায় ভারত সরকার। এ ঘটনার পর ভারতে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশন ঘিরে বিক্ষোভ করে হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠন। ২০ ডিসেম্বর রাতে দিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন ও হাইকমিশনারের বাসার সামনে বিক্ষোভ, হুমকি দেওয়া, শিলিগুড়িতে বাংলাদেশ ভিসা সেন্টারে ভাঙচুরও করে হিন্দুত্ববাদীরা।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে দিল্লি থেকে ডেকে আনা বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর সঙ্গে আলোচনা করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান ও পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। তারা ভারতের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে হাইকমিশনারের কাছ থেকে বিস্তারিত শোনেন।
দু’বার ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারির উদ্যোগ
গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে পৃথক মামলায় গত ১৭ অক্টোবর প্রসিকিউশনের আবেদনে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। এরপর হাসিনাকে গ্রেপ্তারে রেড নোটিস জারির জন্য গত ১০ নভেম্বর পুলিশের মহাপরিদর্শকের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে চিঠি পাঠায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন অফিস।
এর আগেও হাসিনাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরে নথিপত্রসহ চিঠি পাঠায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়। তারপর ১০ এপ্রিল ‘রেড নোটিস’ জারির জন্য ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করা হয়। পলাতক ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করতে ইন্টারপোলের কাছে পৃথক তিনটি ধাপে আবেদন করে পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এ বিষয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, শেখ হাসিনাসহ সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এটা নির্ভর করছে ভারত-বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপর।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জাতিসংঘ যেহেতু মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে না, এটা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত আনার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আপাতত হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক, রাজনৈতিক কিংবা প্রশাসনিক কোনো পরিবেশই অনুকূলে নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অবস্থার পরিবর্তন হলে হাসিনাসহ মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের প্রত্যর্পণ গতি পেতে পারে। এ কারণে নির্বাচনের আগে রায় কার্যকরের বিষয়টি মোটামুটি অনিশ্চিত বলা চলে।