× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শীতের প্রকোপ

দেশজুড়ে শিশুদের নিউমোনিয়া বেড়েছে

কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১০ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

জ্বরের উত্তাপে শরীর পুড়ছে তিন বছরের শিশু হাসিবুরের। সঙ্গে কাশি ও শ্বাসকষ্ট। গত তিন দিন ধরে স্বাভাবিক খাবারও খেতে পারছে না। বৃহস্পতিবার সকালে তাকে নিয়ে আসা হয় ঢাকা শিশু হাসপাতালে। মা নাসরিন আক্তার সন্তানের কপালে হাত রেখে বলেন, ‘শীতের ‍শুরু থেকেই ছেলেটা বারবার অসুস্থ হচ্ছে। ওষুধে সাময়িক ভালো হয়, আবার জ্বর আসে।’ শুধু হাসিবুর নয়, শীতের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শিশুদের ভিড় বেড়েছে। শিশুরা নিউমোনিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, সর্দিকাশি, ডায়রিয়া ও জ্বর নিয়ে ভর্তি হচ্ছে।

সরেজমিনে আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ঢাকা শিশু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিনই চিকিৎসা নিতে আসছে শত শত শিশু। শয্যা সংকটের কারণে অনেক অভিভাবককেই হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় শিশুদের নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। মেঝেতে কার্পেট বিছিয়ে সন্তান কোলে বসে আছেন মুন্সীগঞ্জের শাহনাজ বেগম। পাশে বসে থাকা শিশুর বাবা রফিকুল ইসলাম ছলছল চোখে বলেন, ‘শীতের শুরুতেই ছেলেটার ঠান্ডা লাগে। শুরু হয় কাশি। স্থানীয় ডাক্তারের চিকিৎসায় কোনো উন্নতি হয়নি। এর মধ্যে শ্বাসকষ্ট বেড়েছে। তাই ঢাকায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছি। চিকিৎসক দেখে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু শয্যা খালি নেই, তাই মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে।’

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ১৮-২২ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ২৬১ শিশু চিকিৎসা নেয়, ভর্তি হয় ৬৩ জন। একই সময়ে ডায়রিয়ায় ১৫৭, সর্দিকাশিতে ৮১৬ ও নিউমোনিয়াজনিত হাঁপানিতে ১২১ শিশু চিকিৎসা পায়। ২৩ ডিসেম্বর এক দিনেই বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয় ১,২৩৪ শিশু। ২৪ ঘণ্টায় সর্দিকাশি, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, স্ক্যাবিস ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে শতাধিক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

শিশু ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. ইশরাত জাহান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, শীতের শুরু থেকেই ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে, নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিসে আক্রান্ত শিশুরাই বেশি আসছে। বর্তমানে শিশু ওয়ার্ডে মোট ৬৯ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ (২৩ জন) শিশু শীতকালীন রোটাভাইরাসজনিত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। ২০ শতাংশ শিশু হেপাটাইটিস, ডায়াবেটিস মেলিটাস, এবডোমিনাল পেইন, ইউটিআই, নেফ্রাইটিস, অপুষ্টি, জন্ডিস, রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন ও ডেঙ্গুতে ভুগছে। বাকি ৬০ শতাংশ শিশু নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিসজনিত রোগে ভুগছে।

ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স জান্নাতুল ফেরদৌস ও শিফা জানান, প্রতিদিনই রোগীর চাপ বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫ জন শিশু ওয়ার্ডে আসছে। শয্যার সংকটে জেনারেল বেড ছাড়াও অতিরিক্ত চাপ সামলাতে ১০ বেডের স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিটে ১৫ থেকে ১৮ জন শিশু রাখতে হচ্ছে।

শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের অন্যান্য জেলার হাসপাতালগুলোতেও প্রতিদিনই শিশুদের ভিড় বাড়ছে। সুনামগঞ্জ শহরের বড়পাড়ার দুই মাস বয়সি আলিফ হাসান, গত দশ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তার বাবা অমিত হাসান জানান, ‘আলিফের শ্বাসকষ্ট কমাতে নিয়মিত নেবুলাইজার করা হচ্ছে।’ একই শহরের হাসন নগরের ৮ মাস বয়সি জাকারিয়াও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। গত এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে ভর্তি জাকারিয়ার বাবা জহুর মিয়া বলেন, ‘ছেলের ঠান্ডা লাগায় নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা দিছে।’

সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের তথ্যমতে, ২০ থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মোট ৯৫১ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়। প্রতিদিন গড়ে শতাধিক শিশু ভর্তি হয়েছে। ২৬ নভেম্বর এক দিনেই ১৫৫ শিশু ভর্তি ছিল, যা শিশু ওয়ার্ডের ৫০ শয্যার ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ। সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ঠান্ডার কারণে হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে। রোগীদের সেবা দিতে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।’

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. একেএম মশিউল মুনীর জানান, ‘হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে মোট ৪১টি শয্যা থাকলেও বর্তমানে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৩০০ শিশু ভর্তি রয়েছে। চরম সংকটের মধ্যেও সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।’ এ সময়ে শিশু ও প্রবীণদের উষ্ণ রাখা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সতর্কতা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের শিশু রেসপিরেটরি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাবিলা আকন্দ জানান, ‘নিউমোনিয়ার প্রধান লক্ষণ কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট, খেতে না পারা ও বমি। নির্দিষ্ট বয়সভেদে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি স্বাভাবিকের বেশি হলে তা ঝুঁকির লক্ষণ এবং দেরি না করে শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ছয় মাসের কম বয়সি শিশুর জন্য শুধু বুকের দুধ অত্যন্ত জরুরি, এতে রোগঝুঁকি কমে। সময়মতো সব টিকা ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নিলে নিউমোনিয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমানো সম্ভব।’

এ বিষয়ে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘শীতকালে বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যায়, যা শিশুদের অ্যাজমা বাড়িয়ে দেয়। এ সময় বাতাসে ভাসমান ধুলাবালিও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টি করে। যেসব শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা হঠাৎ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। শীতে শিশুদের মধ্যে অ্যাজমা ছাড়াও ব্রঙ্কিওলাইটিস একটি খুবই সাধারণ রেসপিরেটরি সমস্যা, যা অনেক সময় নিউমোনিয়া হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া নাক দিয়ে পানি পড়া, রাইনোভাইরাল ইনফেকশন বেশি দেখা যায়। এসব কারণে শীতকালে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক বেড়ে যায়।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা