× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

খালেদা জিয়ার জানাজা

কেউ কি দেখেছে এমন জনতরঙ্গ

কবির হোসেন

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:১৭ পিএম

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:২৫ পিএম

কেউ কি দেখেছে এমন জনতরঙ্গ

ঘন কুয়াশা উপেক্ষা করে আগের দিন রাত থেকেই দলে দলে মানুষ আসছিল বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাদের সবার গন্তব্য রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। সেখানেই জানাজা হবে তাদের প্রিয় নেত্রীর। অশ্রুসিক্ত নয়নে সেই জানাজায় শামিল হতে আসছিল তারা সবাই। আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার শেষ যাত্রায় মানুষের ঢল নামবে এ তো খুবই স্বাভাবিক; কিন্তু গতকাল বুধবার মানুষের এমন অভূতপূর্ব ঢল নেমেছিল যে, শুধু মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ কিংবা সংসদের দক্ষিণ প্লাজা নয় আশপাশের অনেক এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছিল জনসমুদ্র। এমন জনতরঙ্গ আর কখনোই দেখা যায়নি আগে। কিছু সময়ের জন্য থমকে গিয়েছিল পুরো মহানগরী।

আক্ষরিক অর্থেই এক অভূতপূর্ব জনতরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল রাজধানীর সুপ্রশস্ত মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে। তারা এসেছিলো স্রোতের মতো, সেই কাকডাকা ভোরেÑ পৌষের কনকনে হিম উপেক্ষা করে। কত সে মানুষের সংখ্যা? গুনবার সাধ্য কার। তবুও, লাখ লাখ নাকি কোটিপ্রায়! কিই-বা আসে যায় তাতে! কেননা গতকাল যে পুরো বাংলাদেশই একবিন্দুতে মিলিত হয়েছিল জীবনভর সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া তাদের এই আপসহীন অভিভাবকটিকে তার শেষযাত্রায় হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা জানাতে।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের জনসমুদ্রে কান্নার ঢেউ তুলে অনন্ত যাত্রায় পাড়ি জমিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল জানাজার পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার স্বামী, সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। ১৯৮১ সালে শহীদ জিয়াউর রহমানের জানাজাও হয়েছিল এই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেই।

খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ আগের রাত থেকেই জানাজাস্থলে আসতে শুরু করেন। সকালে তা পরিণত হয় জনস্রোতে। জানাজার কয়েক ঘণ্টা আগেই লাখো মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ। তারপর এই জনস্রোত ছাড়িয়ে যায় আশপাশের কয়েক কিলোমিটার জুড়ে। দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, উড়ালসড়কের ফার্মগেট লুপ থেকে শুরু করে মহাখালী, মিরপুর, মগবাজার সবখানেই ছিল শুধু মানুষ আর মানুষ। মানিক মিয়া সড়কে জায়গা না থাকায় আসাদগেট, ধানমন্ডি ২৭, ধানমন্ডি ৩২ এমনকি মোহাম্মদপুর বাসটার্মিনাল পর্যন্ত জনস্রোত ছড়িয়ে পড়ে।

জানাজায় অংশ নিতে আসা কারও হাতে ছিল দেশ ও দলের পতাকা, কারও হাতে ছিল কালো পতাকা। এ সময় জানাজাস্থলের প্রবেশমুখগুলোতে দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। যানবাহন না থাকায় দীর্ঘ পথ হেঁটে জানাজায় অংশ নিতে আসে মানুষজন।

 

কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তা

জানাজা ও দাফন-পূর্ব আনুষ্ঠানিকতার কারণে জানাজাস্থল ও এর আশপাশের এলাকায় দেখা গেছে কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তাবলয়। শৃঙ্খলা রক্ষায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও র‍্যাবের পাশাপাশি মোতায়েন ছিল আনসার বাহিনীর দেড় হাজার সদস্য। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রতিটি প্রবেশমুখে তল্লাশির পাশাপাশি বিশেষ চেকপোস্ট দেখা গেছে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে জিয়া উদ্যানেও ছিল কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। জানাজাস্থলে মোতায়েন ছিল বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পাশাপাশি পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াট টিমও মোতায়েন ছিল। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা সংলগ্ন মাঠ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় ডিএমপি ৩৪২ জন ও এপিবিএন ৩৬৩ জন পুলিশ সদস্য এবং ১টি সোয়াট টিম মোতায়েন ছিল। পুলিশের পাশাপাশি ছিল ৪০০ জন বিজিবি সদস্য, পোশাক পরিহিত ৮১০ জন র‍্যাব সদস্য, ৬০০ আনসার সদস্য, ৬০০ জন ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্য ও ২৪ জন কোস্ট গার্ড সদস্য। কয়েক প্লাটুন সেনাবাহিনীর সদস্যও মোতায়েন ছিল।

প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়ার জানাজা-দাফন ঘিরে বিশৃঙ্খলা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১০ হাজারেরও বেশি সদস্য মোতায়েন রাখার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। জানাজায় অংশ নিতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে উপস্থিত ছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। জানাজা শেষে তিন বাহিনীর প্রধান মরহুমার কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন এবং কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করেন।

 

মুসলিম বিশ্বেও স্মরণকালের বৃহৎ এই জানাজা

বিজ্ঞ পর্যবেক্ষকরা বলছেন, স্মরণকালে এত বড় জানাজা চোখে পড়েনি। তাদের মতে, শুধু বাংলাদেশ নয়, মুসলিম বিশ্বেও স্মরণকালের বৃহৎ এই জানাজা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা মশারফ হোসাইন বলেন, ‘আমার নেত্রীর শেষ বিদায়ে অংশ নিতে আমরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসেছি। তার জীবনটাই ছিল লড়াইয়ের। মৃত্যুর মুখেও আমাদের নেত্রী আপস করেননি। আমরা গর্ব করে বলতে পারব, আমরা খালেদা জিয়ার কর্মী। আজকে আমরা তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।’ 

গাজীপুর থেকে জানাজায় অংশ নিতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে এসেছিলেন সিরাজ মিয়া। তিনি বলেন, ‘বেগম জিয়া মানুষের মনে রয়েছেন। চিরদিন তিনি আপসহীন নেত্রী হিসেবে মানুষের অন্তরে থাকবেন। এমন একটি ঐতিহাসিক জানাজায় অংশ নিতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি।’ তার মতে, শুধু বাংলাদেশ নয়, মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের বৃহৎ এই জানাজা।

 

সমাহিত হলেন স্বামীর কবরের পাশে

গতকাল সকাল সোয়া ৯টার দিকে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় মোড়ানো একটি গাড়িতে করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মরদেহ এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসায় আনা হয়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে আসার পর থেকে সেখানেই অবস্থান করছেন। সেখানে পরিবারের সদস্য, স্বজন ও দলীয় নেতাকর্মীরা শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান খালেদা জিয়াকে। এরপর বেলা সোয়া ১১টায় তার মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স গুলশান থেকে রওনা দেয়। বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার মরদেহ পৌঁছার পর বেলা ৩টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, প্রধান বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধান, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় নাগরিক পার্টির নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আবদুল্লাহ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মামুনুল হক, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান ও গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিদেশি কূটনীতিকরাসহ বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।

জানাজার আগে তারেক রহমান তার মায়ের জন্য দোয়া চান এবং মায়ের পক্ষে সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। জানাজা শেষে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়া উদ্যানে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও স্বামী জিয়াউর রহমানের সমাধির কাছে নেওয়া হয়। মরদেহবাহী কফিন কাঁধে নিয়ে কবরে যান সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা। এরপর আনুষ্ঠানিকতা মেনে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বেগম খালেদা জিয়াকে তার স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়। বড় ছেলে তারেক রহমান তার দাফন প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। সেখানে খানিকটা দূরে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমান সিঁথিসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও সেখানে দাঁড়িয়ে দাফন প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন।

৭৯ বছর বয়সি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি লন্ডনে চিকিৎসা নিয়ে কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফেরেন তিনি। গত নভেম্বর মাসে আবারও অসুস্থ হয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ৩৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত মঙ্গলবার ভোরে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে সারা দেশ। গতকাল বুধবার থেকে কাল শুক্রবার পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ ছাড়া গতকালও সারা দেশে ছিল সাধারণ ছুটি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা