× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আদানির নোটিসে নতুন অস্বস্তি বিদ্যুৎ খাতে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:১৫ পিএম

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:২০ পিএম

আদানির নোটিসে নতুন অস্বস্তি বিদ্যুৎ খাতে

বিদ্যুৎ খাতে সরকারের দীর্ঘদিনের ‘নীরব নিশ্চয়তা’র ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে আদানি পাওয়ার লিমিটেডের সাম্প্রতিক অভিযোগ। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বিরুদ্ধে সম্প্রতি লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) নবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগ এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় জারি করেছে নোটিস। ফলে বিষয়টি এখন শুধু একটি আর্থিক আনুষ্ঠানিকতার ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এর ফলে দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, চুক্তি পালনের সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর আদানি পাওয়ার লিমিটেড (তৎকালীন এপি জেএল) ও বিপিডিবির মধ্যে স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) ধারা ১৩.২(১) অনুযায়ী, বিপিডিবিকে নির্দিষ্ট সময় পরপর একটি বৈধ ও পর্যাপ্ত অঙ্কের এলসি নবায়ন করে রাখতে হবে। এই এলসি মূলত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা হিসেবে ব্যবহৃত ও বিবেচিত হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) স্পষ্ট শর্ত লঙ্ঘনের পরও কেন বিপিডিবি কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে নাÑ বিদ্যুৎ খাতের নীতিনির্ধারক মহল এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। 

আদানি পাওয়ার তাদের সর্বশেষ চিঠিতে উল্লেখ করেছে, ‘বারবার তাগাদা ও আনুষ্ঠানিক নোটিস দেওয়ার পরও বিপিডিবি এখনও এলসি নবায়ন করেনি, যা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং একটি চলমান ‘ইভেন্ট অব ডিফল্ট’। এলসি নবায়ন না হওয়া শুধু চুক্তি লঙ্ঘন নয়, এটি তাদের আর্থিক ঋণদাতাদের আস্থা নষ্ট করছে এবং পিপিএ ও ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্ট বাস্তবায়নে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।’

পিডিবির চিঠি সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী বিপিডিবির দায়িত্ব ছিল নিরবচ্ছিন্নভাবে একটি বৈধ ও পর্যাপ্ত অঙ্কের এলসি বজায় রাখা। এটি কোনো ঐচ্ছিক সুবিধা নয়, বরং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা। কিন্তু আদানি পাওয়ারের দাবি, গত ১৮ জুলাই থেকে ৫ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রায় পাঁচ মাস ধরে সাত দফা চিঠি পাঠিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। চুক্তির ধারা ১৩.২(১) অনুযায়ী এলসি নবায়ন না হলে তা সরাসরি ধারা ৪.৩(গ) অনুযায়ী ‘ইভেন্ট অব ডিফল্ট’ হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থাৎ আইনগতভাবে বিপিডিবি ইতোমধ্যেই চুক্তি ভঙ্গের অবস্থায় রয়েছে। চলতি বছর গত ১৩ নভেম্বর আদানি পাওয়ার বিপিডিবিকে আনুষ্ঠানিক ব্যর্থতার নোটিস দেয়। বিষয়টি শুধু বিপিডিবিকেই নয়, চুক্তির ধারা ৪.৬ অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারকেও লিখিতভাবে অবহিত করা হয়।

প্রশ্ন উঠছে, সরকার জানার পরও কেন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এলসি নবায়ন না হওয়ার অর্থ, সরকার কার্যত ঝুঁকি নিচ্ছে। এটি কোনো ছোট প্রশাসনিক ভুল নয়। এই এলসি জটিলতা বিপিডিবির গভীর আর্থিক সংকটের ইঙ্গিত বহন করে। ক্রমবর্ধমান ক্যাপাসিটি চার্জ, ডলার সংকট ও ভর্তুকি-নির্ভরতাÑ সব মিলিয়ে বিপিডিবির আর্থিক ভারসাম্য নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এলসি নবায়নের মতো মৌলিক দায়িত্ব পালনে যদি বিপিডিবি ব্যর্থ হয়, তবে বড় অঙ্কের আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো কতটা নিরাপদ?


ঋণদাতাদের উদ্বেগ, বিনিয়োগ ঝুঁকির অ্যালার্ম : আদানি পাওয়ার জানিয়েছে, তাদের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় ঋণদাতারা বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিদ্যুৎ খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে এলসি হচ্ছে সবচেয়ে মৌলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা। সেটি অনিশ্চিত হলে প্রকল্পের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে চুক্তি স্থগিত বা আইনি বিরোধে গড়ানোর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। 

চুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এলসি ইস্যু দীর্ঘায়িত হলে আদানি পাওয়ারের সামনে কয়েকটি বিকল্প খুলে যায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ চুক্তির অধীনে প্রতিকার দাবি, বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত বা স্থগিত ও আন্তর্জাতিক সালিশি। যার প্রতিটিই বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। আদানি পাওয়ারের দাবি অনুযায়ী, বিপিডিবির দপ্তরে সাম্প্রতিক বৈঠকেও বিষয়টির জরুরি গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। কিন্তু বৈঠকের পরও কোনো লিখিত নিশ্চয়তা বা সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। এপিএল স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, অবিলম্বে এলসি নবায়ন করে লিখিতভাবে নিশ্চিত না করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা যদি নিজ চুক্তির মৌলিক আর্থিক শর্ত মানতে ব্যর্থ হয়, তবে সেটি পুরো খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। এলসি নবায়ন না হওয়া মানে ভবিষ্যতে কেউ আর সরকারি গ্যারান্টিকে গুরুত্ব দেবে না।’ 

তিনি বলেন, ‘এলসি নবায়নে বিলম্ব ও করপোরেট প্রশাসনিক জটিলতা একসঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে একটি অস্বস্তিকর বার্তা দিচ্ছে। সরকার, বিপিডিবি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্রুত সমন্বয় না হলে আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়ন ঝুঁকিতে পড়বে। ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ আমদানি ও বিনিয়োগ ব্যাহত হবে। আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সময় গড়ালে সংকট সমাধান নয়, বরং বাড়বে।’ 

সূত্র বলছে, এই সংকটের মধ্যেই বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি (প্রা.) লিমিটেড স্বল্প নোটিসে এজিএম আয়োজনের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের লিখিত সম্মতি চাইছে। আইন অনুযায়ী সম্ভব হলেও প্রশ্ন উঠছে, গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে করপোরেট সিদ্ধান্তগুলো কি যথাযথ স্বচ্ছতায় নেওয়া হচ্ছে? এলসি নবায়ন এখন শুধু একটি ব্যাংকিং প্রক্রিয়া নয়। এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে আস্থা, দায়বদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা