অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২
নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:৪১ এএম
মাত্র ১৫ দিনে প্রায় ২৪ হাজার গ্রেপ্তার, তালিকাভুক্ত জঙ্গি ও সন্ত্রাসী আটক, বিপুল অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার-২০২২ সালের ডিসেম্বরে পুলিশের বিশেষ অভিযানের এই চালচিত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতার বড় উদাহরণ। কিন্তু ফ্যাসিস্টদের অপতৎপরতা দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাত্র বছর তিনেকের মাথায় চলতি বছরের এই ডিসেম্বরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ তেমন সক্ষমতা দেখাতে পারেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযান শুরুর পর থেকেই এর প্রভাব ও কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এমনকি র্যাব-পুলিশের ঊর্ধ্বতন
একাধিক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলছেন, অপারেশন ডেভিল হান্ট-২ নিয়ে সংকটে পড়েছেন
তারা। তাদের পর্যবেক্ষণমতে, ফ্যাসিস্টপন্থীদের যে ভোটব্যাংক রয়েছে, আগামী ফেব্রুয়ারির
নির্বাচনে তা নিজেদের দিকে টানতে ও তাদের পক্ষে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন রাজনৈতিক
দলের নেতারা। এভাবে তারা চলমান অভিযানের অন্তরায় হয়ে উঠেছেন। ফলে র্যাব-পুলিশ মাঠপর্যায়ে
ওইসব নেতার বিভিন্ন বাধার মুখে পড়ছে। এ ধরনের অসহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তারা বলছে,
‘এই অভিযানে আসামি ধরার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতাদের চাপই অভিযানের সাফল্যের মূল বাধা।’
এই বাধা অতিক্রম করে অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে তাদের। তবে সম্প্রতি প্রশ্নের মুখে
পড়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, অপারেশনের মাত্রা বৃদ্ধি
বা জোরদারের জন্য ইতোমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত অর্থাৎ
অভিযানের ১৫তম দিনে এসে সারা দেশে ডেভিল হান্ট ফেজ-২-এ গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির সংখ্যা
দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫২৮ জন। এর মধ্যে মাদক ও পুরনো মামলার আসামির সংখ্যাই বেশি। অথচ
২০২২ সালের এই সময় মাত্র ১৫ দিনের বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছিল প্রায় ২৩ হাজার ৯৬৮
জন। এমনকি ‘অপারেশন ডেভিল হান্টের’ দুই পর্বেও সেই সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব
হয়নি, যা জনমনে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
প্রসঙ্গত, ঢাকার আদালত ফটক থেকে
দুই জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনার পর বড়দিন-থার্টিফার্স্ট নাইটে নিরাপত্তার ইস্যু সামনে
রেখে ২০২২ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে বিশেষ অভিযান চালিয়েছিল
পুলিশ। তখন সারা দেশে ৩৩ হাজার ৪২৯টি অভিযান পরিচালনা করে ২৩ হাজার ৯৬৮ জনকে গ্রেপ্তার
করা হয়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ছিলেন ৭২ জন তালিকাভুক্ত জঙ্গি ও সন্ত্রাসী এবং ১৫ হাজার
৯৬৮ জন বিভিন্ন মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি। পাশাপাশি উদ্ধার করা হয় ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্র,
দুই লাখ ইয়াবা, আট কেজি হেরোইন ও পাঁচ হাজারের বেশি ফেনসিডিল বোতল।
এর ঠিক দুই বছর পর ফ্যাসিস্টদের
দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, বড়দিন-থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন এবং নির্বাচন ঘিরে উদ্ভূত
পরিস্থিতিতে ১৩ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত
১৫ দিনের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, বিশেষ অভিযান বলা হলেও এ থেকে অপরাধী-সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার,
অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ফল সাধারণ অভিযানের চেয়েও দুর্বল। পুলিশ সদর দপ্তরের
তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের দ্বিতীয় দিন ১৪ ডিসেম্বর সারা দেশের ৬৩৯ থানায় গ্রেপ্তার করা
হয় মাত্র ৫৬৭ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিটি থানায় একজনেরও কম গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় তারা।
পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া পরবর্তী দিনগুলোর তথ্য পর্যালোচনা করেও দেখা গেছে, এক হাজারের
নিচেই থাকছে দৈনিক গড় গ্রেপ্তারের সংখ্যা। গতকাল গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৬৬৩ জন বলে জানিয়েছে
পুলিশ সদর দপ্তর। প্রায় প্রতিদিন গ্রেপ্তার হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০-এর কাছাকাছি।
উল্লেখ্য, ডেভিল হান্ট ফেজ-২ শুরু
হয় মূলত ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনার পর থেকে। পরিস্থিতি
নিয়ন্ত্রণে তখন পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর যৌথ অভিযানের ঘোষণা আসে। রাজধানীতে
চেকপোস্ট জোরদারের কথাও বলা হয়। কিন্তু অভিযান শুরুর পরও রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে
মব সৃষ্টি, সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা থামেনি।
মাঠপর্যায়ে অভিযানে যুক্ত একাধিক
দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অতীতের যেকোনো বিশেষ অভিযানে
দৈনিক গড় গ্রেপ্তার পাঁচ হাজারের কাছাকাছি হতো। সেখানে ডেভিল হান্ট অপারেশনের দুই পর্ব
মিলিয়েও গড় গ্রেপ্তার এক হাজারের বেশি হয়নি। তাদের ভাষায়, সারা দেশের ৬৩৯ থানার প্রতিটি
থানা যদি পাঁচজন করেও অপরাধী গ্রেপ্তার করত, তাহলেও প্রতিদিন তিন হাজারের বেশি গ্রেপ্তার
হওয়ার কথা। বাস্তবে তা হয়নি।
এমন প্রেক্ষাপটে গতকাল মঙ্গলবার
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সভায় ফ্যাসিস্ট দমন কিংবা ধরার ক্ষেত্রে অনীহার পেছনে নিরাপত্তা
ঝুঁকি এবং রাজনৈতিক চাপের কথাও উঠে আসে। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব
পলাশ ওই সভায় বলেন, ‘বর্তমানে পুলিশ কোনো পক্ষ থেকেই সহযোগিতা পাচ্ছে না। যাদের গ্রেপ্তার
করা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে দিনের বেলা প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়া রাজনৈতিক নেতারা রাতে
আবার তাদেরই ছেড়ে দেওয়ার জন্যে তদবির করছেন।’ ওই সভায় পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা
নির্বাচন ঘিরে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টিতে বদ্ধপরিকর থাকার কথা জানান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে জিরো টলারেন্স
নীতির কথাও বলা হয়। তবে মাঠের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বড় ধরনের
চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ অভিযানের
মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। কিন্তু বর্তমান অভিযানে গ্রেপ্তার
ব্যক্তিদের বড় অংশই মাদক ও পুরনো মামলার আসামি হওয়ায় ‘ফ্যাসিস্ট’ বা সহিংসতার মূল হোতারা
ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই যাচ্ছে। ফলে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য নিয়ে অভিযান
শুরু হয়েছিল, তা এখনও পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ
ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে অনেক
গ্রেপ্তার হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাহিনীকে বিভিন্ন বাঁধার কারণে
এখনও হিমশিম খেতে হচ্ছে। যে কারণে চলমান অভিযানের মধ্যেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হত্যাচেষ্টা
এবং সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে।’