× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নিরাপদ খাদ্য আইনের দৌড় জরিমানা পর্যন্ত

মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৫২ পিএম

নিরাপদ খাদ্য আইনের দৌড় জরিমানা পর্যন্ত

রাজধানীসহ সারা দেশেই ভেজাল খাদ্য উৎপাদনের শাস্তির দৌড় বড়জোর জরিমানা পর্যন্ত। আর তাই নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অভিযান মোটামুটি নিয়মিত চললেও শুধু অর্থ জরিমানার কারণে ভেজালকারীদের কাছে বিষয়টিকে মামুলি মনে হচ্ছে। সাধারণ জনগণও মনে করছেন, জরিমানাই এসব অপরাধের একমাত্র শাস্তি। এ কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা প্রয়োগ করা হলেও অপরাধপ্রবণ উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারীদের থামানো যাচ্ছে না। খাদ্যে ভেজালও কমছে না। যদিও নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, ভোক্তা অধিকার আইন-২০০৯ কিংবা বিশেষ ক্ষমতা আইনÑ সবখানেই কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে এবং তা প্রয়োগ করা সম্ভব।

নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই আইনের ৭৫ ধারা অনুযায়ী, এ আইনের আওতায় করা অপরাধের বিচারের জন্য মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর অধীন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিধান রাখা হয়েছে। যাতে জরুরি কোনো পরিস্থিতি দ্রুততার সঙ্গে সামলানো যায়। এটি স্পষ্ট যে এই ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবস্থা সাময়িক। এটি অস্থায়ী, এর এখতিয়ার সীমাবদ্ধ এবং তাও বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য। এতে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে কারাদণ্ড প্রদানের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। কিন্তু ‘প্রশাসনিক জরিমানা’ আরোপের ক্ষমতা দিয়েছে, যার সীমা অনধিক তিন লাখ টাকা পর্যন্ত (ধারা ৭৮)। কেউ জরিমানা পরিশোধ না করলে সেজন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কাউকে কারাদণ্ড বা অন্য কোনো দণ্ড আরোপের ক্ষমতা রাখে না। সে ক্ষেত্রে সরকারি দাবি আদায় আইন-১৯১৩ অনুসারে সরকারি দাবি গণ্যে সেটি আদায়যোগ্য বিবেচিত হয়। দেখা যাচ্ছে, এ আইনের আওতায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা করার পরিবর্তে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ শুধু প্রশাসনিক জরিমানা আদায়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে বেপরোয়া হয়ে উঠছে ভেজাল খাদ্য উৎপাদক ও সরবরাহকারীরা।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বিশেষ আইন প্রণীত হয়েছে ২০১৩ সালে। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এর ২ ধারা অনুযায়ী ‘নিরাপদ খাদ্য’ বলতে প্রত্যাশিত ব্যবহার ও উপযোগিতা অনুযায়ী মানুষের জন্য বিশুদ্ধ ও স্বাস্থ্যসম্মত আহার্য বোঝানো হয়েছে। এ আইনের ধারা ৬৪ অনুযায়ী ‘বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ধারা ৬৫ অনুযায়ী সেই আদালতের বিচারক হবেন একজন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। এই আদালতে খাদ্য-সংক্রান্ত সব অপরাধের বিচার হবে। এটি খাদ্য-সংক্রান্ত সব অপরাধের বিচারের জন্য মূল এবং নিয়মিত বিচারিক আদালত। ধারা ৬৬(২) অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বা তদকর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা বা পরিদর্শক অভিযোগ পেলে অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও অনুসন্ধান শেষে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা করবেন। এটি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মূল আইনি দায়িত্ব। এ ছাড়া ধারা ৬৬(৩) অনুযায়ী যেকোনো সাধারণ নাগরিক নিজেও অভিযোগের কারণ উদ্ভবের ৩০ দিনের মধ্যে সরাসরি বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা করতে পারেন। নিরাপদ খাদ্য আইনে ‘সামারি ট্রায়াল’ বা দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ আইনের আওতায় নিরাপদ খাদ্য আদালত ন্যূনতম ৬ মাস থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ন্যূনতম ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড আরোপ করার ক্ষমতা রাখেন। অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। ৬২ ধারা অনুসারে আদায় করা অর্থদণ্ডের ২৫ শতাংশ অভিযোগকারী ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রাপ্য হবেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলার কারণ উদ্ভবের ৩০ দিনের মধ্যে মামলা করার সময়সীমার বিধান এ আইনের একটি অন্যতম সীমাবদ্ধতা। ভেজাল খাদ্যের ক্ষতিকর দিক বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক পরেও দেখা দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে, যা এ আইনে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ধারা ৭৩(৩) অনুযায়ী, ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যদ্রব্যের নমুনা যাচাই পরীক্ষার ব্যয় বহনের বাধ্যবাধকতা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর আরোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসে কর্মরত বিচারকেরা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ কারণে মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিরাপদ খাদ্য আইনের কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য জানাচ্ছে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ প্রয়োগ করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে ১৫০টি, মামলা করা হয়েছে ১৫৩টি। পাশাপাশি ১৫০ ব্যক্তিকে দণ্ডিত করা হয়েছে। বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা করা হয়েছে ৭২টি। তবে এসব মামলার বেশিরভাগই নিষ্পত্তি করা হয়নি। এখনও পেন্ডিং মামলা রয়েছে ১৮৭টি।

এ প্রসঙ্গে বিএফএসএ’র সাবেক এক সদস্য না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘চাল, ডাল, আলু, শাকসবজি, মাছ, মাংস, ডিম, মুরগি, সবকিছুর মধ্যে মারাত্মক পরিমাণে ভারী ধাতু পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বিএফএসএ সে বিষয়ে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিতে পারছে না।’ তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে খাদ্য নিরাপত্তার মতো কর্তৃপক্ষ সাধারণত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিএফএসএ কাজ করছে। এই কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা থাকলেও মোবাইল কোর্ট ছাড়া সিলগালা, জব্দ করা বা জরিমানা আদায় করার ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় না।’

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএসএফএ চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) জাকারিয়া জানান, এতে তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। বরং এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গেলে কনসেনট্রেশন (মনোযোগ) কমে যাবে। কারণ তাদের সংস্থা অনেক বেশি।

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালের ২২ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিএফএসএ’র আইন সংশোধনের বিষয়ে একটি সভা করে। সেই সভায় কিছু সংযোজন পরিমার্জনের নির্দেশ দেওয়ার পর খাদ্য মন্ত্রণালয় তা আর বাস্তবায়ন করেনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আইন সংশোধন না হলে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী বা ব্যবসায়ীদের ওপর বিএফএসএ প্রকৃতপক্ষে মনিটরিং জোরদার করতে পারবে না। এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিএফএসএ’র নির্দেশনাগুলো গুরুত্ব সহকারে নেয় না।

এ প্রসঙ্গে বিএসএফএ চেয়ারম্যান জাকারিয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘শুধু জরিমানা করে কি ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব?’ তিনি বলেন, ‘সামগ্রিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে সময় লাগবে। আমরা খাদ্য উৎপাদনে জড়িত ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের ম্যাজিস্ট্রেটদের গ্রেপ্তার করার সুযোগ আছে, তবে গ্রেপ্তার করা হয় না। ব্যব্সায়ীদের মান পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হয়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা জরিমানা করার পরেও তাদের ফলোআপ এবং মনিটরিং দুটোই করি।’ তিনি জনবল এবং বাজেট সংকটের কথাও উল্লেখ করেন।

শুধু জরিমানা আরোপ করেই কি খাদ্যে ভেজাল থামানো যাবে?Ñ এমন প্রশ্ন করা হলে খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জরিমানাও এক প্রকার শাস্তি। মোবাইল কোর্টের বিচারকরা প্রভিশন মেনেই শাস্তি দিচ্ছে।’ তবে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা সমাধান করার কথাও জানান তিনি।

নিরাপদ খাদ্য আদালতের মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতা ও জনবল সংকটের কারণে শতাধিক মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ার বাস্তবতা এর সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। কারণ কোটি টাকার ব্যবসায়ীদের জন্য সামান্য অঙ্কের প্রশাসনিক জরিমানা ভেজাল বিক্রেতা ও উৎপাদনকারীদের জন্য তেমন ভয়ের কারণ নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলসহ কঠোর শাস্তিভোগ না করলে অসাধু ব্যবসায়ীদের মানসিকতা পরিবর্তন হবে না। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে অধিকতর কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা