প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ ২২:৪৩ পিএম
ভারতে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে নিরাপত্তাহীনতার প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লি, আগরতলা ও শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে তার প্রতিবাদে ভারতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর
উগ্র বিক্ষোভ, হামলা, ভাঙচুর এবং দিল্লিতে বাংলাদেশের হাই কমিশনারকে প্রাণনাশের হুমকির
পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজকে বলেছেন,
দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশন এবং ত্রিপুরার আগরতলায় সহকারী হাই কমিশনের সামনে এ সংক্রান্ত
নোটিস টানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
দিল্লিতে বাংলাদেশ ভবনের সামনে হট্টগোল ও হুমকির অভিযোগ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আর উত্তেজনার মধ্যে সাময়িকভাবে ভিসা কার্যক্রম বন্ধের এ খবর এলো।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যার প্রতিবাদে ক্ষোভ বিক্ষোভের মধ্যে গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকায় দুটি পত্রিকা অফিস এবং ছায়ানট ভবনে হামলা হয়। সেই রাতে চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাই কমিশন কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে একদল মানুষ বিক্ষোভ দেখায়, সেসময় মিশনে ঢিলও ছোড়া হয়।
এরপর চট্টগ্রামে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রের (আইভ্যাক) কার্যক্রম রবিবার থেকে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হয়।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ভালুকার একটি কারখানার শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে (২৮) পিটিয়ে হত্যার পর তার লাশ গাছের ডালের সঙ্গে বেঁধে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর ২০ ডিসেম্বর রাতে দিল্লিতে ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’ নামের এক সংগঠনের ২০-২৫ জন সদস্য বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে বিক্ষোভ করে। তারা সেখানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয় এবং বাংলাদেশের হাই কমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হুমকি দেওয়ার খবর জানা যায়।
দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টার মো. ফয়সাল মাহমুদকে উদ্ধৃত করে রবিবার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, “বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে কিছু কথাবার্তা (তারা) বলছে- হিন্দুদের নিরাপত্তা দিতে হবে; হাই কমিশনারকে ধর। পরে তারা মেইন গেটের সামনে এসে কিছুক্ষণ চিৎকার করে। ওরা চিৎকার করে চলে গেছে- এতটুকুই আমি জানি।”
সেই খবরের প্রতিক্রিয়ায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাণধীর জয়সওয়াল রবিবার
এক বিবৃতিতে বলেন, “বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা আমরা দেখেছি।
সত্যটা হচ্ছে, ২০ ডিসেম্বর ২০-২৫ জন যুবক নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের সামনে
জড়ো হয়ে ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়েছে এবং বাংলাদেশে
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার আহ্বান জানিয়েছে। নিরাপত্তা বেষ্টনী লঙ্ঘন কিংবা নিরাপত্তা
পরিস্থিতি তৈরির মত কোনো প্রচেষ্টা সেখানে ছিল না।”
“কয়েক মিনিট পরই ওই দলটিকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যরা। এই ঘটনার ভিডিও প্রমাণ প্রকাশিত হয়েছে” বলেন জয়সওয়াল।
তিনি দাবি করেন, ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী বিদেশ মিশন বা কার্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত
করতে ভারত অঙ্গীকারাবদ্ধ।
বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির ওপর ভারত ‘নজর রাখছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগে রাখছেন আমাদের কর্মকর্তারা। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে আমাদের জোরালো উদ্বেগ জানানো হয়েছে। আমরাও দীপু দাসের বর্বর হত্যার ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানাচ্ছি।”
ভারতের ওই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন রবিবার সাংবাদিকদের বলেন, দিল্লিতে কূটনৈতিক এলাকার ভিতরে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের সামনে ‘হিন্দু চরমপন্থী সংগঠনের বিক্ষোভকারীদের আসার সুযোগ করে করে দেওয়া’ হয়েছে।
তিনি বলেন, “ভারতীয় প্রেসনোটে যে কথা বলা হয়েছে, এটা আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করি এজন্য যে, বিষয়টি যত সহজভাবে উত্থাপন করা হয়েছে, আসলে অত সহজ না।
“আমাদের মিশন, বাংলাদেশের মিশন কূটনৈতিক এলাকার গভীরে অবস্থিত। এমন না যে এটা বাইরে কোনো জায়গায় অথবা কূটনৈতিক এলাকার শুরুতে, তা কিন্তু না। তারা বলছে ২০-২৫ জনের একটা দল, হতে পারে। হয়ত একটু কম বেশি হতেও পারে সংখ্যাটা। কিন্তু সেটা কথা না।”
“একটা হিন্দু চরমপন্থী সংগঠনের ২৫ বা ৩০ জনের একটা দল এতদূর পর্যন্ত আসতে পারবে কেন, একটা স্যানিটাইজড এলাকার মধ্যে? তার মানে তাদেরকে আসতে দেওয়া হয়েছে তাইলে। যেভাবে হোক তারা এসেছে, আসতে পারার কথা না কিন্তু নরমালি” বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, “সেখানে তারা দাঁড়িয়ে যে শুধু ওই হিন্দু নাগরিকের হত্যার প্রতিবাদে স্লোগান দিয়ে চলে গেছে, তা না। তারা আরো অনেক কিছু বলেছে, সেটা আমরা জানি। এবং আমাদের পত্রপত্রিকায় যে রিপোর্টটা আসছে, সেটাকে যে তারা বলতেছে যে ‘মিসলেডিং’, এটাও সত্য না।
“আমাদের পত্রপত্রিকায় মোটামুটি সঠিক রিপোর্টই এসেছে, যেটুকু আমরা তথ্য পেয়েছি। আমার কাছে প্রমাণ নেই যে তাকে (হাই কমিশনার) হত্যার হুমকি দিয়েছে, কিন্তু আমরা এটাও শুনেছি যে, তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সেটা কেউ একজন কথা বলল, সেটার মধ্যে হতে পারে।”
কূটনৈতিক এলাকার এত ভেতরে বিক্ষোভকারীরা কীভাবে যেতে পারল, সেই প্রশ্ন তুলে তৌহিদ হোসেন
বলেন, “সাধারণত কোনো প্রটেস্ট গ্রুপ যখন যায়, সেটা আগে থেকে ইনফর্ম করা হয় এবং পুলিশ
তাদেরকে একটু দূরে এক জায়গাতে আটকে দেয়। কখনও যদি কোনো কাগজপত্র দেওয়ার থাকে, দুইজন
এসে দিয়ে যায়। এটা হলো নর্ম। সবখানে এটা হয়, আমাদের দেশেও হয়।”
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার নিশ্চিতের যে আহ্বান ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সে বিষয়ে তৌহিদ হোসেন বলেন, “একজন বাংলাদেশি নাগরিক নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এটার সাথে মাইনরিটিজের নিরাপত্তাকে একসাথে করে ফেলার কোনো মানে হয় না। তিনি বাংলাদেশের নাগরিক, যাকে হত্যা করা হয়েছে এবং অবিলম্বে বাংলাদেশ এ ব্যাপারে অ্যাকশন নিয়েছে। ইতোমধ্যে আপনারা জানেন যে, বেশ কিছু অ্যারেস্ট করা হয়েছে।
“তো, এ ধরনের ঘটনা যে শুধু বাংলাদেশে ঘটে তা নয়, এই অঞ্চলের সব দেশেই ঘটে। এবং প্রত্যেক দেশের দায়িত্ব হচ্ছে, সেক্ষেত্রে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া, বাংলাদেশ নিচ্ছে। অন্যদেরও উচিত সে রকম ব্যবস্থা নেওয়া। কাজেই এটা গ্রহণযোগ্য না, যেভাবে এটাকে উপস্থাপন করা হয়েছে।”
বাংলাদেশ হাই কমিশন এলাকায় নিরাপত্তার নিয়মকানুন সঠিকভঅবে ‘পালিত হয়নি’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা মনে করি যে, নরমালি সিকিউরিটির যে নিয়ম কানুন আছে, সেটা এখানে ঠিকমত পালিত হয়নি। তারা বলছে যে, আমাদের সব মিশনের নিরাপত্তা দেখছে, আমরা সেটা নোট করেছি।”
কর্মরত কূটনীতিবিদদের নিরাপত্তার খাতিরে বাংলাদেশ মিশনকে সংকুচিত করার কথা সরকার ভাববে কি না, সেই প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, “যদি তেমন পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তাহলে আমরা সেটা করব। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা যেটা দেখছি, আমরা এখনো ভরসা রাখছি, ভারত যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবে।”
বাংলাদেশ মিশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল কি-না, এমন প্রশ্নে এক সময় দিল্লি মিশনে কাজ করা তৌহিদ হোসেন বলেন, “ব্যাপারটা কিন্তু শুধু যে তারা এখানে এসছে, দুটো স্লোগান দিয়েছে তা না। এর ভেতরে কিন্তু একটা পরিবার বাস করে; হাই কমিশনার এবং তার পরিবার কিন্তু ওখানে বাস করে।
“তারা কিন্তু থ্রেটেনড ফিল করেছে। এবং তারা কিন্তু আতঙ্কিত হয়েছে, কারণ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা
ব্যবস্থা ছিল না। দুইজন গার্ড ছিল, তারা চুপ করে দাঁড়িয়েছিল।”
শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের
ভিসা কেন্দ্র বন্ধ করে দিল হিন্দুত্ববাদী বিক্ষোভকারীরা
বাংলাদেশে হিন্দুদের
ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে সোমবার
হিন্দুত্ববাদী কয়েকটি সংগঠনের সদস্যরা বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্র ভাঙচুর করার পর সেটি
বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ
(বিএইচপি), হিন্দু জাগরণ মঞ্চ ও শিলিগুড়ি মহানগর সংগঠনের সদস্যরা ওই ভাঙচুর চালায়।
দিল্লি ও কলকাতার কূটনৈতিক
সূত্রগুলো প্রথম আলোকে জানিয়েছে, কয়েক বছর ধরে ‘ডিইউডিজিটাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে
শিলিগুড়িতে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো
জানিয়েছে, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচারের ঘটনার প্রতিবাদে শিলিগুড়ির
বাঘা যতীন পার্কে জমায়েত হন বিএইচপি, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, শিলিগুড়ি মহানগর সংগঠনের
প্রায় শ তিনেক সদস্য। এরপর তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বাংলাদেশের ভিসা অফিস ঘেরাও করেন।
বিক্ষোভের সময় বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ, দীপু দাসের হত্যার
বিচার ও দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি জানান।
পরে আন্দোলনকারীদের
পক্ষ থেকে পাঁচজনের একটি প্রতিনিধিদল ভিসা অফিসে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এবং
প্রতিবাদস্বরূপ ভিসা অফিস বন্ধ রাখতে বলে।
এ সময় প্রতিনিধিদলের
এক সদস্য ডিইউডিজিটালের কর্মকর্তাকে ফোন করে বলেন, “আপনাকে একটাই অনুরোধ, এই অফিসের
তালা খুলবে না। আপনার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়ে দিন, এই অফিসের তালা খুলবে না।
বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হবে, আপনি এখানে ব্যবসা করবেন, সেটা হবে না। বাংলাদেশের
ভিসাসংক্রান্ত ব্যানার অথবা বোর্ড আজকের মধ্যে সরিয়ে নিন।”
প্রতিনিধিদলের ওই সদস্য
পরে স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানান, তারা সংগঠনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে জানাবেন।
বাংলাদেশে তাদের হিন্দু ভাইদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে। এখান থেকে যেন কোনো ভারতীয়, কোনো
হিন্দু বাংলাদেশে না যায়, ব্যবসা না করে, সেটা তারা চান।
কলকাতা থেকে একটি কূটনৈতিক
সূত্র জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কথা ভেবে ডিইউডিজিটাল সোমবার দুপুর
৩টার আগেই ভিসা কেন্দ্রটি বন্ধ করে দিয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর পুনরায় ভিসা
কেন্দ্র চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে
শিলিগুড়িতে ওই ভিসা কেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
কলকাতা দপ্তরে কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়েছে কলকাতায় বাংলাদেশের উপ হাই কমিশন।
এদিকে সোমবার দিল্লিতে
বাংলাদেশ হাই কমিশন সব ধরনের কনস্যুলার সেবা ও ভিসা দেওয়া বন্ধ করেছে। পরবর্তী ঘোষণা
না দেওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা
জানিয়েছেন।