× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শরিফ ওসমান হাদির জন্য এলিজি এবং জাতীয় সংকটকালে সময়ের দাবি

মারুফ কামাল খান

প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:২৩ পিএম

শরিফ ওসমান হাদির জন্য এলিজি এবং জাতীয় সংকটকালে সময়ের দাবি

সম্পাদকের ডেস্ক :

বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ১৯ ও ২০ ডিসেম্বর ভারত সফর করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি নীলম সঞ্জিব রেড্ডি ও প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই তাকে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে অভ্যর্থনা জানানো থেকে শুরু করে যতদূর সম্ভব মর্যাদা দেন। তবে চাণক্য সেনের প্রাচীন দিক-নির্দেশনা মোতাবেক নির্ণীত ভারতের কূটনীতি কখনও একরৈখিক নয়। তাই ওই সফরকালে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঝানু রাজনীতিবিদ জগজীবন রাম একটু আলাদা ভঙ্গিতে হাজির হন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে।

প্রেসিডেন্ট জিয়াকে বাবুজি জিজ্ঞাসা করেন ভারত ও বাংলাদেশের আয়তন, জনসংখ্যা এবং সমরশক্তি সম্পর্কে সঠিক তথ্য তিনি জানেন কি না। জিয়াউর রহমান ইতিবাচক জবাব দিয়ে বলেন, হ্যাঁ, আমার জানা আছে। তখন জগজীবন রাম ছুড়ে দেন খুব উৎকট একটা প্রশ্ন। তিনি বলেন, তা হলে পুরো বাংলাদেশটা দখল করে নিতে ভারতীয় ফৌজের কতটা সময় লাগবে?

এ প্রশ্নে সোজা হয়ে বসেন জিয়াউর রহমান। সুপরিচিত কালো রোদ-চশমায় আড়াল করা তীক্ষ্ণ চোখে সোজাসুজি প্রতিপক্ষের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন : Before that, our boys will destroy six of your major cities. (তার আগেই আমাদের ছেলেরা তোমাদের ছয়টি প্রধান নগরীতে কেয়ামত করে ফেলবে)। চমকে উঠলেন বাবুজি। এমন জবাব ছিল তার কল্পনারও বাইরে। এই আগ্নেয় বার্তা নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারক মহলে বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ল। পড়শি একটি ক্ষুদ্র দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রথম যার কণ্ঠে ইথারে ছড়িয়েছিল, যিনি অমিত বিক্রমে পরিচালনা করেছেন রণাঙ্গনের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অধিনায়কদের মধ্যে একমাত্র যার ছবি স্মারক হিসেবে রক্ষিত আছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তর ফোর্ট উইলিয়ামে দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারিত তার উক্তি যে নিছক বাগাড়ম্বর নয় তা অনুধাবন করতে বেগ পেতে হয়নি ভারত-কর্তাদের। এতে বদলে যায় পুরো প্রেক্ষাপট।

১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনে বাংলাদেশে রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে একদলীয় বাকশাল সরকার উৎখাতের পর সেই সরকারের সমর্থক নেতাকর্মীদের একটা অংশ ভারতে পালিয়ে যায়। তাদের অনেকে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ চালাচ্ছিলেন। ভারত সরকার তাদেরকে আশ্রয়, অন্ন-বস্ত্র এবং অস্ত্র-গোলাবারুদের জোগান দিয়ে আসছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এই ‘পরোক্ষ যুদ্ধ’ বন্ধের আহ্বান জানান। দেশাই বাবু তাতে রাজি হন। তিনি এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দেন যে ভারতের মাটি থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আক্রমণ পরিচালনার সুযোগ আর তার সরকার দেবে না।

এর আগে ১৯৭৬ সালের একটা ঘটনার কথা বলি। তৎকালে নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামী তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে তৎপর ছিল। তারা ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিন দিনব্যাপী এক সিরাত সন্মেলনের আয়োজন করে। সন্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন বিমানবাহিনী প্রধান এম. জি তাওয়াব। সন্মেলনে অধ্যাপক গোলাম আজমের লিখিত বক্তৃতা পড়ে শোনানো হয়। দাবি ওঠে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা বদলের। স্লোগান দেওয়া হয় : ‘তাওয়াব ভাই Ñ চাঁদতারা পতাকা চাই’। তখন পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটা কনফেডারেশন গড়ার প্রস্তাবের প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের একটা ক্যাম্পেইনও চলছিল জোরেশোরে। জিয়াউর রহমানকে তখন ভারতীয় আধিপত্য মোকাবিলার সঙ্গে যুগপৎভাবে পাকিস্তানীকরণের প্রচেষ্টাকেও রুখে দিতে হয়েছিল।

আমার কাছে মনে হচ্ছে, ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ যে জটিল সংকটে পড়েছিল এবং জিয়াউর রহমান বলিষ্ঠ ও গতিশীল নেতৃত্ব দিয়ে যে সংকট থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল এবং স্বাধীন মর্যাদায় সমুন্নত করেছিলেন সেই সংকটকাল আবার ফিরে এসেছে। বাংলাদেশের ভূমিপুত্র, জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার সোচ্চার কণ্ঠ শরিফ ওসমান বিন হাদির ওপর আততায়ীর মারণ ছোবল এবং তার শহিদী মৃত্যু সংবাদ প্রচার-পরবর্তী অন্তর্ঘাতমূলক সন্ত্রাস ও অন্তর্ঘাত সেই আলামত স্পষ্ট করেছে।

আমরা সকলেই ইতোমধ্যে জেনে গেছি যে, ওসমান হাদিকে হত্যার উস্কানি ও পরিকল্পনা ভারতাশ্রিত হাসিনা ও তার সাঙাতদের কাছ থেকে এসেছে। তাদের নিয়োজিত সন্ত্রাসী চক্রই সেটা বাস্তবায়ন করেছে এবং তারপর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে গেছে ভারতে। অর্থাৎ ভারত আবারও বাংলাদেশের জাতিদ্রোহী হিংস্র ঘাতক সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাদের ‘প্রোপাগান্ডা ওয়ার’ ও হুমকি-ধমকি অনবরত চলছেই। সীমান্তে বাংলাদেশের নাগরিকদের রক্ত অবিরাম ঝরাতে কসুর করছে না তাদের সীমান্ত-প্রহরীরা। এমন একসময়ে শুক্রবার রাতে সিঙ্গাপুর থেকে বজ্রাঘাতের মতো এলো ওসমান হাদির মৃত্যু সংবাদ। এ ভয়ানক দুঃসংবাদে রোরুদ্যমান বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক প্রতিটি মানুষের হৃদয় হয়ে ওঠে রক্তক্ষরণে সিক্ত। জাতির বীর সন্তানের শহিদী মৃত্যুর অব্যক্ত বেদনা বিশ্বাসঘাতক ছাড়া দলমতনির্বিশেষে সকলকে এক কাতারে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে। একজন সাধারণ তরুণ তার সাহস, নির্ভীক চিত্ততা, মরণকে পায়ে দলার দৃঢ়তা, অটল দেশপ্রেম ও আত্মদানের মধ্য দিয়ে এক অনন্য অসাধারণ জাতীয় মহাবীরের পঙ্‌ক্তিতে উঠে যায়। তার নাম ও স্মৃতি হয়ে ওঠে জাতীয় প্রেরণাসঞ্চারী কেন্দ্র। তাকে হারিয়ে ফেলার শোককে শক্তিতে পরিণত করে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার এক অনির্বচনীয় সুযোগ সৃষ্টি হয়। দুর্ভাগ্য আমাদের। ওই রাতেই অমিত সম্ভাবনা ও সুযোগের ওপর নেমে আসে কালো থাবা। অন্তর্ঘাতমূলক সন্ত্রাস-সহিংসতা জাতি হিসেবে আমাদেরকে বিশ্বমঞ্চে কৈফিয়তের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিপ্লবের নাম করেই বিস্তৃত হয় প্রতিবিপ্লবী নাশকতা। শুক্রবারের রাতের সন্ত্রাস-কবলিত বাংলাদেশকে সেই দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতার সাক্ষী হতে হলো। ওসমান হাদির স্মৃতি ও শোক ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠল অন্তর্ঘাতী নানান অপকাণ্ড। এইসব নাশকতা যে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে অসম্ভব করে তুলে দেশকে এক নৈরাজ্যিক পথে ঠেলে দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশকে আবার কক্ষচ্যুত করে ভারত কিংবা পাকিস্তানি বলয়ে টেনে নেওয়ার অশুভ চক্রান্ত শুরু হয়েছে। আজ জিয়াউর রহমান নেই। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান জাতীয়তাবাদী দলÑ বিএনপি আছে। শহীদ জিয়ার কালজয়ী আদর্শের পতাকা বইবার দায়িত্বভার তাদের ওপর অর্পিত হয়েছে। সেই জাতীয়তাবাদী আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে তার নিজস্ব ভিত্তিভূমির ওপর অটল রাখার দায়িত্ব বিএনপিকেই পালন করতে হবে। কোনো দিকে না হেলে তাদেরকে মধ্যপথ ধরে এগিয়ে যেতে হবে। ভারত, পাকিস্তান কিংবা অপর কোনো দেশের কক্ষে নয়, বাংলাদেশকে নিজস্ব কক্ষেই আবর্তিত হতে হবে। এই রাজনীতির নেতৃত্ব দিতে হবে বিএনপিকে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য গড়ার মাধ্যমে। ভোটের ক্যানভাসে নয়, সঠিক রাজনীতির নেতৃত্ব গ্রহণের মাধ্যমেই বিএনপিকে জয়ী হতে হবে। এর জন্য জনসম্পৃক্ত উপযুক্ত ও সময়োচিত কর্মসূচির মাধ্যমে অনতিবিলম্বে মাঠ-ময়দানে বিএনপির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মাঠ ছেড়ে দিলে সংখ্যালঘু শক্তিও যে দুর্দমনীয় হয়ে উঠতে পারে তার নজির ভূরি ভূরি রয়েছে। তরুণদের বিভ্রান্ত করে কোনো অপশক্তি যাতে বিপথগামী করতে না পারে তার জন্য ছাত্র ও যুবদলকে আরও সক্রিয় হতে হবে। প্রচার, প্রচারণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্য বয়ান তৈরিতে বিএনপিকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিতে হবে এবং সেটাই সময়ের দাবি।▫️

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা