প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ০০:১৪ এএম
আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৩৯ এএম
জাতীয় স্মৃতিসৌধে
১৬ ডিসেম্বর দিনটি এ দেশের মানুষের স্মৃতিতে, হৃদয়ের গভীরে, গর্বের অনুভবে চিরকাল দীপ্ত হয়ে থাকবে। ১৯৭১ সালের এই দিনে এক বীরত্বগাথার মধ্যদিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে যুক্ত হয়েছিল একটি নতুন নাম—বাংলাদেশ। রক্ত, ত্যাগ আর অদম্য সাহসের বিনিময়ে জন্ম নিয়েছিল একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। আজ (১৬ ডিসেম্বর) সেই মহান বিজয় দিবস।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, নিরস্ত্র এই জনপদের মানুষের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ট্যাংক-কামান আর স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র নিয়ে নিষ্ঠুর গণহত্যার উন্মাদনায় মেতে উঠেছিল। সেই বিভীষিকাময় রাত থেকেই শুরু হয় প্রতিরোধের মহাকাব্য। ঠিক সেই মুহূর্তেই জেগে ওঠে জাতি। স্বাধীনতার তেষ্টায় ডাক আসে মুক্তিযুদ্ধের।
ডাক শুনে দেশের বীর সন্তানেরা ছুটে গিয়েছিলেন যুদ্ধের ময়দানে। জীবনের মায়া তাদের কাছে ছিল তুচ্ছ, মৃত্যুভয় ছিল নিষ্প্রভ। তাদের ছিল না আধুনিক অস্ত্র, ছিল না নিয়মিত যুদ্ধের প্রশিক্ষণ; কিন্তু ছিল অটল বিশ্বাস, ছিল মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, ছিল জ্বলে ওঠা অদম্য সাহস। যার কাছে যা ছিল- লাঠি, বন্দুক, কাঁচা সাহস কিংবা বুকভরা স্বপ্ন—তা নিয়েই তারা দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন শত্রুর মুখোমুখি, মরণপণ লড়াইয়ে।
দীর্ঘ নয় মাস ধরে এ দেশের সব ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার মানুষ একসঙ্গে লড়েছিলেন পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে; একটি অসম যুদ্ধে। সেই সংগ্রামের পথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগে, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানিতে, আর অগণিত ধ্বংসস্তূপে। তবু পরাজয় মানেনি এই জাতি। মুক্তিযোদ্ধারা ছিনিয়ে এনেছিলেন চূড়ান্ত বিজয়, ভেঙে দিয়েছিলেন পরাধীনতার শৃঙ্খল।
ডিসেম্বরের কুয়াশামাখা বাংলার আকাশে সেদিন উদিত হয়েছিল স্বাধীনতার সূর্য। লাল-সবুজের পতাকা উড্ডীন হয়েছিল বিজয়ের বাতাসে। অগণিত কণ্ঠে অনুরণিত হয়েছিল ভালোবাসার চিরন্তন সুর—‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…’। তাই আজকের দিনটি যেমন চিরগৌরব আর আনন্দের, তেমনি স্বজনহারানোর গভীর বেদনায়ও নীল হয়ে আছে।
আজ এই বিজয়ের দিনে জাতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে সেইসব বীর সন্তানদের, যাদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ ভরে উঠবে অগণিত মানুষের শ্রদ্ধার ফুলে; নীরব অঙ্গীকারে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে।
পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার মুহূর্তকে স্মরণ করে বিজয় দিবস উদ্যাপন শুরু হবে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে। বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে সকালে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং এরপর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টার নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।
এছাড়াও, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, সর্বস্তরের মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারকারী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
এ উপলক্ষে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হবে।
ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়ক দ্বীপগুলো ইতোমধ্যেই জাতীয় পতাকাসহ ব্যানার, ফেস্টুন ও রঙিন পতাকা দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে।
মহান বিজয় দিবস দেশব্যাপী জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্যাপনের অংশ হিসেবে সর্বোচ্চসংখ্যক জাতীয় পতাকা নিয়ে প্যারাশুটিং করে বিশ্ব রেকর্ড গড়া হবে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী মঙ্গলবার বেলা ১১টা থেকে শহরের তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে পৃথকভাবে ফ্লাই-পাস্ট প্রদর্শন করবে। সেখানে একটি বিশেষ বিজয় দিবস ব্যান্ড শো আয়োজন করা হবে।
এছাড়া, ‘টিম বাংলাদেশ’-এর ৫৪ জন প্যারাট্রুপার দেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর উপলক্ষে বেলা ১১টা ৪০ মিনিট থেকে পতাকাবাহী স্কাইডাইভ প্রদর্শন করবে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ পতাকা-প্যারাশুটিং প্রদর্শনী হবে, যা একটি নতুন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড স্থাপন করবে।
এছাড়া, দেশের অন্যান্য শহরেও সশস্ত্র বাহিনী দ্বারা একই রকম ফ্লাই-পাস্ট প্রদর্শনী পরিচালিত হবে। এর পাশাপাশি, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার বাহিনী দেশব্যাপী ব্যান্ড শো আয়োজন করবে। সব অনুষ্ঠান জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের সব জেলা ও উপজেলায় তিন দিনব্যাপী বিজয় মেলার আয়োজন করবে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন শিশুদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ওপর আবৃত্তি, প্রবন্ধ রচনা এবং চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং দিবসটি উদ্যাপনের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।
সকাল ৯টায়, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা সমবেত হয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করবে।
এদিন বিকাল ৩টা থেকে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিজয় দিবসের গান পরিবেশিত হবে এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা দেশের ৬৪টি জেলায় একযোগে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান পরিবেশন করবেন।
এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের চিত্রাঙ্কন, রচনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তথ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোও দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে অনুরূপ কর্মসূচি গ্রহণ করবে।
দিবসটি উপলক্ষে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সুবিধাজনক সময়ে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ক্রীড়া অনুষ্ঠান, ফুটবল ম্যাচ, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, কাবাডি ও হাডুডু খেলা আয়োজন করা হবে।
বিকালে রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা জানাবেন। এছাড়া, মহানগর, জেলা ও উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) একটি স্মারক ডাকটিকিট, উদ্বোধনী খাম ও সিলমোহর অবমুক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার এবং বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও রেডিও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস তুলে ধরে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে। সারা দেশের সিনেমাহলগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র এবং দেশের অডিটোরিয়াম এবং উন্মুক্ত স্থানে মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হবে। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত জাদুঘরগুলো প্রবেশ ফি ছাড়াই সারাদিন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, অন্যদিকে দেশের সব বিনোদন কেন্দ্রে শিশুদের জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগ থাকবে।
এছাড়া, চট্টগ্রাম, খুলনা, মোংলা ও পায়রা বন্দর, ঢাকা সদরঘাট, পাগলা এবং বরিশালসহ বিআইডব্লিউটিসি জেটিতে সকাল ৯টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের জাহাজগুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেহী আত্মার চিরশান্তি, আহত প্রবীণদের সুস্থতা এবং দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনা করে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা করা হবে।
এছাড়া, দেশের সব হাসপাতাল, কারাগার, বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা, পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র, ডে-কেয়ার সেন্টার, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র এবং শিশু পরিবার এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের উন্নত খাবার পরিবেশন করা হবে।