ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:১৯ এএম
আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:২১ এএম
ই-পাসপোর্ট সেবাকে নাগরিকবান্ধব, আধুনিক ও বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত করতে সরকার একের পর এক নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নাগরিক সেবা প্লাটফর্ম ব্যবহার, বিদেশি মিশনে সেবা জোরদার, আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান নিয়োগ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে বায়োমেট্রিক যাচাই সব মিলিয়ে আগের তুলনায় আরও সমন্বিত ও দ্রুতগতির সেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তে উঠে এসেছে ভবিষ্যতের আধুনিক পাসপোর্ট ব্যবস্থার একটি স্পষ্ট নকশা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সভার নথিপত্র
সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্প এরই মধ্যে ১ কোটি ৭৪ লাখের বেশি পাসপোর্ট উৎপাদন ও
১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি পাসপোর্ট প্রিন্ট করেছে। বিদেশের ৬৭টি বাংলাদেশি মিশনে ই-পাসপোর্ট
সেবা চালু হওয়ায় ১৪৮ দেশের প্রবাসীরা এ সুযোগ পাচ্ছেন। তবে জনবল সংকটের কারণে বিভিন্ন
মিশনে জনবল সংকটে বৈদেশিক মিশনে ৪১ হাজার ৯০৩ আবেদন ঝুলে থাকায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নাগরিক সেবা প্লাটফর্ম ব্যবহার করে ই-পাসপোর্টের অনলাইন আবেদন
গ্রহণের কাজ উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে চালু করা হবে। প্রাথমিকভাবে ই-পাসপোর্টের বর্তমান
অনলাইন নিবন্ধন পোর্টাল ব্যবহারের মাধ্যমে এই সেবা পরিচালিত হবে। ডিজিটাল সেন্টারের
উদ্যোক্তাদের মধ্য থেকে নির্বাচিত একটি অংশকে এজেন্সিশিপ দেওয়া হবে। তাদের মাধ্যমে
আবেদন ফরম পূরণ, অনলাইন পেমেন্টসহ নিবন্ধন সম্পর্কিত বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন হবে। এজেন্সিশিপ
পাওয়ার পর তাদের তথ্য নাগরিক সেবা প্লাটফর্ম থেকে ই-পাসপোর্ট সিস্টেমে পাঠানো হবে এবং
স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘এজেন্ট’ হিসেবে নিবন্ধিত হবে। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরও সভায়
জানিয়েছে, তারাও চাইলে ই-পাসপোর্ট অনলাইন পোর্টাল ব্যবহারের মাধ্যমে এজেন্সিশিপ দিতে
পারবে। এই সংক্রান্ত নথি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে উপস্থাপন করা হবে।
সভায় জানানো হয়,
সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় উন্নয়নের অংশ হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের তিন আন্তর্জাতিক
বিমানবন্দরে ৩৮টি ই-গেট চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় ২৬টি, চট্টগ্রামে ৬টি, সিলেটে
৬টি, বেনাপোলে ৪টি, বাংলাবান্ধায় ২টি এবং ই-পাসপোর্ট কমপ্লেক্স ট্রেনিং সেন্টারে ১টি।
এ ছাড়া দেশের ২১টি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে অফলাইন স্বয়ংক্রিয় বর্ডার কন্ট্রোল কার্যক্রম
চলছে।
প্রকল্পের আওতায়
রাজধানীতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি ডেটা সেন্টার এবং যশোরে একটি ডিজাস্টার রিকভারি
সেন্টার ২০২১ সাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে। একই বছর উত্তরা, আগারগাঁও ও যশোরে তিনটি
পার্সোনালাইজেশন ইউনিট চালু হয়, যা এখন প্রতিদিন হাজার হাজার পাসপোর্ট প্রক্রিয়াকরণ
করছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১ কোটি ৭৪ লাখ ৩২ হাজার
৬৫৫টি পাসপোর্ট উৎপাদন এবং ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪৪ হাজার ২২৫টি পাসপোর্ট প্রিন্ট করা হয়েছে।
বিদেশি মিশনে পাঠানো হয়েছে ১৪ লাখ ৩০ হাজার ৮৪৭টি পাসপোর্ট।
ই-পাসপোর্ট সেবা
বিদেশি মিশনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও জনবল সংকট বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২২ জুন ২০২৫ পর্যন্ত ১০ লাখ ৯৭ হাজার ৬৩টি পাসপোর্ট বিতরণ হলেও অনিষ্পন্ন আবেদন রয়েছে
৪১ হাজার ৯৩৩টি। বিশেষ করে কাতার, জেদ্দা, কুয়েত ও সিঙ্গাপুর মিশনে অতিরিক্ত চাপ পড়েছে।
এসব মিশনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট আগামী ২ থেকে ৫ মাস পর্যন্ত বুকড। ক্ষমতা বাড়াতে
মোট ৫০ শতাংশ অ্যাপয়েন্টমেন্ট বৃদ্ধি করা হলেও জনবল সংকটের কারণে তা যথাযথভাবে কাজে
লাগানো যাচ্ছে না।
এদিকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের
বাধ্যবাধকতা বাতিল হওয়ার পর পাসপোর্ট এনরোলমেন্টে নিরাপত্তার স্তর বাড়াতে এনআইডির
ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ছবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এজন্য জার্মানির
ভেরিডস জিএমবিএইচ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ ক্লিয়ারেন্স
বাতিল হওয়ায় দেশের ৭২টি এসবি ও ডিএসবি স্টেশনে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হতো, সেগুলো
ফেরত আনা হচ্ছে। মোট হার্ডওয়্যার ৫৬ হাজার ৭৩৪টি; এর মধ্যে অকার্যকর যন্ত্রপাতি ধ্বংস
বা নিলামে বিক্রির বিষয়টি স্টিয়ারিং কমিটির অনুমোদনের জন্য তোলা হয়েছে।
সভার নথিসূত্র
থেকে জানা জায়, ই-পাসপোর্টের কাঁচামাল আমদানি গত কয়েক মাসে সম্পন্ন হয়েছে। মোট ১
কোটি ৮০ লাখ বুকলেট আমদানি নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ লাখ বুকলেট দেশে এসে পৌঁছেছে।
দেশের ৭১টি আঞ্চলিক
পাসপোর্ট অফিসে ই-পাসপোর্ট সেবা চালু রয়েছে। বিদেশের ৮০টি বাংলাদেশি মিশনের মধ্যে
৬৭টিতে এ সেবা চালু হয়েছে। এর ফলে ১৪৮টি দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখন দেশ থেকে যেমন,
বিদেশ থেকেও সহজে ই-পাসপোর্ট করতে পারছেন। বাকি ১৩টি মিশনে সেবা চালুর প্রক্রিয়া শেষ
পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
অনলাইন পোর্টালে
এজেন্ট নিয়োগ
ই-পাসপোর্ট অনলাইন
পোর্টালে একটি নতুন কাঠামো যোগ করা হচ্ছে, যেখানে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের নাগরিক সেবা
প্লাটফর্মের আওতায় নির্বাচিত ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তারা ‘এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করবেন।
প্রতিটি এজেন্ট আবেদন গ্রহণ, অনলাইন পেমেন্ট, তথ্য যাচাইসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা
করবেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করছেÑ গ্রামের মানুষ থেকে শুরু করে শহরাঞ্চলের সেবাপ্রার্থীরা
এর ফলে দ্রুত, সহজ ও স্বচ্ছ সেবা পাবেন।
বড় চ্যালেঞ্জ
ডেটা সুরক্ষা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক
কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) কাজী শরীফ উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ই-পাসপোর্ট একটি
জাতীয় নিরাপত্তা অবকাঠামো। এতে বায়োমেট্রিক যাচাই, ই-গেট, ডেটা সেন্টার ও স্বয়ংক্রিয়
বর্ডার কন্ট্রোল একসঙ্গে কাজ করে। সরকার যে পরিমাণ কাঁচামাল আমদানি করেছে এবং বিদেশে
সেবা সম্প্রসারণ করেছে, তা সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি বলেন, ‘প্রবাসীদের
সেবা দ্রুত হওয়া, বিদেশে পাসপোর্ট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আসা এবং স্বয়ংক্রিয় এনআইডি
ভেরিফিকেশন যুক্ত হওয়া পরিচয় জালিয়াতি কমাবে। তবে আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান নিয়োগ
ও ডেটা সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।