মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:১৪ পিএম
আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:২২ পিএম
ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। ছবি: সংগৃহীত
তরুণ আইনজীবীদের মধ্যে বিচক্ষণ হিসেবে পরিচিত ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। বাবা সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী ব্যারিস্টার আখতার ইমাম ও মা খ্যাতিমান অভিনেত্রী প্রিসিলা পারভীন। লন্ডনের লিংকনের অধীনে সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যারিস্টারি শেষ করে রাশনা ইমাম আইনে বিসিএল ডিগ্রি অর্জন করেন অক্সেফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে। কাজ করেছেন বিশ্বখ্যাত ল’ ফার্ম ব্রেকার অ্যান্ড মেকাঞ্জির লন্ডন অফিসে।
২০০৩ সালে দেশে ফিরে আসেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে হংকংভিত্তিক এশিয়া বিজনেস ল’ জার্নাল কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের ৫০ সেরা আইনজীবীর তালিকায় রয়েছেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি রাজনীতিবিদ ববি হাজ্জাজের স্ত্রী। চলতি বছর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। ব্যারিস্টার রাশনা ইমামের সঙ্গে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আমাদের বিচারব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদক মাসুদুল হাসান
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : গত ১৫ মাসে বিচার বিভাগের কতটা সংস্কার হয়েছে বলে মনে করেন?
রাশনা ইমাম : গত ১৬ বছরে বিচার বিভাগের দলীয়করণ হয়েছে। এতে যে ক্ষতি হয়েছে তা তো রাতারাতি পূরণ করা যাবে না। সময় দিতে হবে। তবে দেখার বিষয়, গত এক বছরে আমরা সঠিক পথে রয়েছি কি না? এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি, গণঅভ্যুত্থানের পর সংস্কারের যে পথ নির্ধারিত, তাতে আমরা সঠিক পথেই রয়েছি।
গত সরকারের সময়ে দলীয় বিবেচনায় বিচারক নিয়োগ দেওয়ায় ক্ষুণ্ন হয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। বর্তমানে সে ব্যাপারে একটা বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। যদিও অধ্যাদেশে নিয়েও সমালোচনা আছে, কিছু সমস্যাও রয়ে গেছে। তবে সেটা সংশোধনের মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তটা জরুরি ছিল। এ ছাড়া সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল রিভাইভ করা হয়েছে, যেটা ১৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করে, সংসদকে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। আমরা সেটা ফিরে পেলাম। এখন বিচারকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল রি-অ্যাকটিভেটেড হয়েছে। এটাও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতে সঠিক নির্দেশনা।
আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ সুপ্রিম কোর্ট/বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয়। কারণ প্রশাসনিক কাজে যদি মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয় তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কঠিন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সত্যিকার অর্থে নিশ্চিত করতে হলে এটা খুবই জরুরি। আশার কথা, এটাও বাস্তবায়ন হয়েছে। এ কারণেই মনে হয় আমরা সঠিক পথে আছি।
প্রবা: গত ১৫ মাসে আদালত অঙ্গনে মব নিয়ে কী বলবেন?
রা ই : অভ্যুত্থানের পর থেকে নির্বাহী বিভাগ যে বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেনিÑ বিষয়টি তেমন নয়। মবের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের পরোক্ষ দায় রয়েছে। মবের পরই ছুটিতে পাঠানো হলো ১২ বিচারপতিকে। এই উদাহরণ বিচার বিভাগের জন্য সুখকর নয়। এটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতারও পরিপন্থী। যদিও এই বিচারপতিদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও রাজনীতিকরণের অভিযোগ ছিল। কিন্তু সবকিছুর জন্যই একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। বিচারক অপসারণের একটা প্রক্রিয়া আছে। তদন্ত, সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের ও সিদ্ধান্তের জন্য এ ক্ষেত্রে অপেক্ষা করা উচিত ছিল।
প্রবা : সাম্প্রতিক সময়ে আদালত প্রাঙ্গণে আসামি ও আইনজীবী উভয়েরই নিরাপত্তা সংকট দেখা গেছে। সাংবাদিকের ওপরও আক্রমণ হয়েছে। এ বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখেন?
রা ই : আমরা যদি আমাদের আদালত অঙ্গনে আসামি, আইনজীবী ও বিচার সংশিষ্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারি, তা শুধু দুঃখজনকই নয় এটা বিচার বিভাগ এবং সরকারেরও ব্যর্থতা। প্রথম থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে দৃঢ় নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিল। কিন্তু সেটা অনুপস্থিত থাকার কারণেই অনেকের ওপর বাজেভাবে শারীরিক আক্রমণ হয়েছে। অথচ এগুলো সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যেত।
প্রবা : মামলায় গণ-আসামি করার বিষয়টিতে কোনো পরিবর্তন কি লক্ষ করেন?
রা ই : এখানে পুলিশের নেতিবাচক ভূমিকাই বেশি। আমরা যা শুনেছিÑ দেখছি তাতে এটা স্পষ্ট এখানে এক ধরনের বাণিজ্য হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী, যাদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল না, তাদেরও প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বীরা টাকা খরচ করে মামলায় নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে। এসব নাম দেওয়া হয়েছে হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলায়। এভাবে ঢালাও মিথ্যা মামলা দায়েরের মাধ্যমে পুরোপুরি সিস্টেম অব এবিউজ করা হয়েছে। এখানে ব্যর্থতা রয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ের। আইন উপদেষ্টা গণমাধ্যমে একটা বিবৃতিতে বলেছিলেন, আদালতের একটি বেঞ্চ ঢালাওভাবে জামিন দিচ্ছে। কিন্তু যখন মিথ্যা মামলায় ঢালাওভাবে জামিন আবেদনগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে তখন এ ধরনের কোনো বক্তব্য আমরা ওনার (আইন উপদেষ্টা) থেকে পাইনি। সুতরাং উনি যখন সিলেক্টিভলি এ ধরনের বক্তব্য দেন তখন এটাও বিচার বিভাগের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে। যে বেশি বেইল (জামিন) দেবেন না , এটা সরকার চাচ্ছে না।
প্রবা : তার মানে মন্ত্রণালয় আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে?
রা ই : নিম্ন আদালতগুলোতে জামিন না দেওয়ার এটা প্রবণাতা দেখা যাচ্ছে। সরকার থেকে যখন এমন বিবৃতি আসে তখন উচ্চ আদালতেও তার প্রভাব কিছুটা তো পড়বেই। এ ক্ষেত্রে গত ১৫ মাস উচ্চ আদালতকে নিয়ন্ত্রণের কিছুটা চেষ্টাও হয়েছে। তবে সরকারের সৎ উদ্দেশ্যে না থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতের জন্য অধ্যাদেশগুলো জারি সম্ভব হতো না।
প্রবা : অতীতে মামলাজট নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। বর্তমানে এই বিষয়ে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করেন?
রা ই : মামলা জটের মতো একটা জটিল বিষয়ের সমাধান এত দ্রুত সম্ভব না। প্রধান বিচারপতি অনেকগুলো সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছেন, আশা করা যায়Ñ এগুলোর ফলাফল হয়তো কয়েক বছর পর পাব। যেমন বাণিজ্যিক আদালত স্থাপনে তিনি বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছেন। পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার ডিজিটাইজেশনের জন্যও কাজ করছেন, যা মামলাজট কমাতে সহায়ক হবে। কিন্ত এত দ্রুত এসব উদ্যোগের ফল পাওয়া যাবে না। কার্যকরী পরিবর্তনের জন্য ১৫ মাস খুবই কম সময়। সংস্কার বাস্তবায়নে সময় লাগাটা স্বাভাবিক।
প্রবা : বিচার বিভাগ সংস্কার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটিকে কীভাবে দেখছেন?
রা ই : আগামীতে নির্বাচিত যে সরকার আসবে বর্তমানের সংস্কার কার্যক্রমগুলো বাস্তবায়ন তাদের ওপর নির্ভর করবে। তাদের সদিচ্ছার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করবে সেগুলো কতটা টেকসই হবে। সংস্কারের পদক্ষেপ ইতোমধ্যে নিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমান প্রধান বিচারপতি অত্যন্ত সংস্কারমুখী। তার দায়িত্বের এই স্বল্প সময়েই তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। বড় বড় সংস্কারের উদ্যোগ, সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠাÑ এসবই তার আন্তরিক ও জোরালো ভূমিকার ফল। আমি আশাবাদী এই সংস্কারপ্রক্রিয়া আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। নির্বাচিত সরকার এসে সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।