প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ২১:০১ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এবার নির্বাচনি এলাকা ও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় বাহিনীর সদস্যদের কেন্দ্রে রাখার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ ও রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে মোতায়েন করবে ইসি। একইসঙ্গে তফসিল ঘোষণা হলে প্রথম দিন থেকে আচরণবিধি প্রতিপালনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ভূমিকা পালনের নির্দেশনা দিয়েছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) নির্বাচন কমিশন ভবনে সকাল থেকে তিন ঘন্টাব্যাপী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তি ও প্রতিনিধিদের নিয়ে করা বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন, চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ভিডিপি, কোস্টগার্ড, র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থা/বিভাগের প্রধান ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠক শেষে ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন পরিকল্পনা, সমন্বয়, দিকনির্দশনামূলক সভার’ সার্বিক বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ। নির্বাচনে তিনধাপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থায়ী (স্ট্যাটিক) মোতায়েন, মোবাইল টিম ও কেন্দ্রীয় রিজার্ভ থাকবে।
ইসি সচিব বলেন, স্থায়ী (স্ট্যাটিক) মোতায়েন—যেখানে কেন্দ্রভিত্তিক কিছু নিরাপত্তাকর্মী থাকবেন। এর সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট থাকবে স্থায়ী বা অস্থায়ী উভয়ই। মোবাইল চেকপোস্ট—মানে এক জায়গায় করে দুই কিলোমিটার দূরে গিয়ে আবার করা। এটিও স্থায়ী ধরনের, মোবাইল ইউনিট—তারা ঘুরে ঘুরে নজরদারি করবে। তবে একটি মোবাইল ইউনিট কতগুলো কেন্দ্র দেখবে তা এখনো সংশ্লিষ্ট বাহিনী ঠিক করেনি বলে জানিয়েছেন ইসি সচিব।
তিনি বলেন, তাদের বিবেচনায় ভৌগোলিক অবস্থান, সড়ক সংযোগ ইত্যাদির ওপর নির্ভর করবে। কেন্দ্রীয় রিজার্ভ-এটি প্রধান রিজার্ভ শক্তি হিসেবে প্রস্তুত থাকবে। মোতায়েন পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনটি অংশ—স্থায়ী, মোবাইল এবং কেন্দ্রীয় রিজার্ভ—আগেই নির্ধারিত থাকবে। এখন পর্যন্ত আমাদের নির্দেশনামালা দিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনী তাদের মতো করে তা সাজাবে। এর সঙ্গে প্রচলিত বিশেষ আঘাতকারী বাহিনীও (স্ট্রাইকিং ফোর্স) থাকবে, যাদের দ্রুত চলাচলের ক্ষমতা ও প্রতিরোধমূলক উপস্থিতি নিশ্চিত করার সক্ষমতা রয়েছে।
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মূল ভূমিকায় থাকলেও তদারকির দায়িত্বে থাকবে ইসি এমনটা জানিয়ে আখতার আহমেদ বলেন, সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে ‘লিড মিনিস্ট্রি’ হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দায়িত্ব পালন করবে। তারা ‘গাইডলাইনস, প্রিন্সিপালস’ যেগুলো আছে কীভাবে কী কাজ করবেন, না করবেন সে সম্পর্কে তারা অন্যান্য বারের মতো দিকনির্দেশনা দেবে। নির্বাচন কমিশনে আমরা সার্বিক তদারকি ও সমন্বয়টা দেখব। তিনি বলেন, ইসির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ‘মনিটরিং সেল ও সাইবার সিকিউরিটি সেল’ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও অপতথ্য-গুজব-মিথ্যা রোধে নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে সব বাহিনী ও সংস্থার প্রতিনিধিদের উচ্চ পর্যায়ের কেন্দ্রীয় ‘মনিটরিং সেল’ থাকবে।
তিনি আরও বলেন, এখানে আমরা একটা ‘মনিটরিং সেল’ করব। আর সেই সঙ্গে মনিটরিং সেলগুলোর সঙ্গে আবার সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর একটা সংশ্লিষ্টতা, সমন্বয় থাকবে। এখন ‘সেলের সাইজ’ কত হবে, কতজনের প্রতিনিধি হবে এটা সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্টভাবে এখনো বলা হয়নি প্রতিনিধিদের। সংশ্লিষ্ট জায়গা থেকে যারা যে সংখ্যাটা আসবে, আমরা সেভাবে এটা সমন্বয় করে নেব।
আখতার আহমেদ বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়া, গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎপরতা বাড়ানোর জন্য বলা হয়েছে।
চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নজরদারিতে রাখার এবং আইনের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচনি ‘ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি’, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে থাকবেন। এর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রয়েছে।
বৈঠকে পোস্টাল ভোটিংয়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারসহ সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
এছাড়া বৈঠকে রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠানোর ব্যাপারে রাস্তার নিরাপত্তা এবং এটা সম্পূর্ণভাবে নজরদারিতে রাখা, রিটার্নিং অফিসাররা কেন্দ্রের কাছে যখন পৌঁছাবেন, তার জিম্মায় যখন থাকবে, সেখানে নিরাপত্তাটা নিশ্চিত করা এবং ভোট গণনার সময় যেন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাটা দেখা হয়- এই চারটা জিনিসের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
আখতার আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীর আচরণবিধির প্রতিপালনের ব্যাপারে সবাইকে বলেছি, প্রথম দিন থেকেই আচরণ বিধির সুষ্ঠু প্রয়োগ করতে হব। নির্বাচন কমিশনের অবস্থানটা অত্যন্ত স্পষ্ট, প্রথম দিন থেকে আচরণবিধি প্রতিপালন যেন যথাযথভাবে হয় এবং সে কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যেন সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেন। তারা সবাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তারা প্রথম দিন থেকেই মাঠে কাজ করবেন এবং কার্যকর ভূমিকা তারা পালন করবেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খন্দকার মো. মাহাবুবুর রহমান, ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী, আনসার-ভিডিপির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আব্দুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ, ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম, বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, র্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান, এসবি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি গোলাম রসুল, সিআইডির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ছিবগাত উল্ল্যাহ।
ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা রাখতে চায় ইসি:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা রাখতে চায় ইসি। এক্ষেত্রে সিসি ক্যামেরার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপরেই ছেড়ে দিতে চায় সংস্থাটি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগ্রহের কারণে তাদের মাধ্যমেই বিষয়টি বাস্তবায়নের পক্ষে ভোট আয়োজনকারী সংস্থাটি।
বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থার সঙ্গে আইনশঙ্খলা বৈঠকের কার্যপত্র থেকে বিষয়টি জানা গেছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার উপ-সচিব মোহাম্মদ মনির হোসেনের সই করা কার্যপত্রে এই কথা বলা হয়েছে।