প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৪১ পিএম
প্রাণিদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা যাবে না বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, কোন প্রাণির প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করলে তাদের শাস্তির মুখে পড়তে হবে। প্রাণিরা মানুষের ভালোবাসা যায় নিষ্ঠুরতা নয়।
বুধবার (২৬ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওস্থ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র,জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ ২০২৫ -এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন- পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বার্তা দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্বাগত বক্তব্য রাখেন মন্ত্রণালয়টির সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের।
উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, জাতীয় পর্যায়ে এতো বড় পরিসরে প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ পালন এবারই প্রথম হচ্ছে। এর আগে প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ পালিত হয়েছে তবে জাতীয় পর্যায়ে আয়োজন করা হয়নি। এ বছর প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে “দেশীয় জাত, আধুনিক প্রযুক্তি: প্রাণিসম্পদে হবে উন্নতি”। এর কারণ দুটি। এক. আমাদের প্রাণিসম্পদের বিশেষ করে গরু, ছাগল, মুরগির যেসব দেশীয় জাত রয়েছে তার বৈশিষ্ট্য একেবারে অনন্য। এই ছোট দেশেও এক এক এলাকায় গবাদিপশু ও ছাগল এবং হাঁস-মুরগির ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র্য রয়েছে। পাহাড়, সমতল, চর, বিল এবং হাওড়ে এই বৈচিত্র্য দেখা যায়। আমাদের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারীরা তাদের পরিবারের সদস্যের মতোই যত্ন করে পালন করেন। এদের খাদ্যাভ্যাস স্থানীয় পরিবেশের সাথে খাপ খায়, রোগ বালাই অনেক কম হয়। এর উৎপাদনশীলতা কম হলেও, এদের উৎপাদন খরচও কম। এই জাতগুলো রক্ষা করা জরুরি কারণ এর সাথে গ্রামীণ মানুষের জীবিকাও সরাসরি জড়িত।
দেশি জাত সংরক্ষণে গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে দেশীয় জাতের গবাদিপশুর টিকে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। মিথেন এমিশনের দিক থেকেও এগুলো কম নিঃসরণকারী। দেশীয় জাত রক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কেন্দ্রে গবেষণা হচ্ছে।
দ্বিতীয় কারণ উল্লেখ করে বলেন, আমরা উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্যে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করছি এবং বিদেশ থেকে উচ্চ ফলনশীল গরু/ষাড় এনে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে শংকর জাত তৈরি করা হচ্ছে। পোল্ট্রি শিল্প এখন একটি অন্যতম প্রধান মাংস ও ডিম সরবরাহের উৎস হতে পেরেছে। সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে ডিম ও মাংস খেতে পারছে।
তিনি বলেন, দেশে নিবন্ধিত ৮৫ হাজার ২২৭টি বাণিজ্যিক এবং প্রান্তিক পর্যায়ে প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার পোল্ট্রি খামার তৈরির মাধ্যমে দেশে বিপুল সংখ্যক উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে। দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬ কোটি ৬৮ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। দেশীয় উদ্যোক্তারা এই বিষয়ে ভাল অবদান রাখছেন।
উপদেষ্টা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্যে প্রাণিসম্পদ খাতে সরকার এবং প্রাইভেট সেক্টরের যে ভূমিকা আছে তা আজ সবার সামনে দৃশ্যমান।একদিকে দেশীয় জাত রক্ষায় কাজ হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে। আজকে আমরা ৫টি ক্যটেগরিতে ১৫ জনকে ব্রঞ্জ, রৌপ্য ও স্বররণ্য পদক দিয়েছি। আগামিতে আরো ক্যাটেগরি বাড়বে। এতে বোঝা যায়, দেশে প্রাণিসম্পদ খাতে কত ভাবে কাজ হচ্ছে।
দেশীয় জাত সম্পর্কে একটু বলতে চাই। এক একটি এলাকায় বিশেষ ধরণের গরু পাওয়া যায়। আপনারা ভিডিওতে দেখেছেন চট্টগ্রামের রেড চিটাগাং, মুন্সিগঞ্জের মীরকাদিম, নর্থ বেংগল গ্রে, পাবনার পাতি গরু। ছাগলের জাতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ জাত হচ্ছে ব্লাক বেংগল, ব্রাউন বেংগল, বৈরাগী, যমুনা পারি, হোয়াইট বেংগল ইত্যাদি। ভেড়া্র মধ্যে আছে উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চল ও যমুনা অববাহিকা অঞ্চলের আলাদা জাতের ভেড়া। তাছাড়া আছে গাড়ল ভেড়া। মুরগির মধ্যে গলাছিলা, হিলি, আসিল ছাড়াও নানা জাতের মুরগি সারা দেশে ছড়িয়ে আছে ।
সংখ্যার দিক থেকেও আমরা পিছিয়ে নেই। সচিব সাহেবের বক্তব্যে আপনারা শুনেছেন। এক কথায় গ্রামীণ পরিবারের সংখ্যার সাথে গবাদি পশু হাঁস মুরগির সংখ্যাও কাছাকাছি মিলে যাচ্ছে। গ্রামীণ মানুষ যে তাদের নিজের পরিবারের সদস্য মনে করে এতে আবাক হবার কিছু নেই। এগুলো শুধু প্রাণিসম্পদ নয়, বরং লক্ষ লক্ষ পরিবারের জীবিকা, আর্থিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রতীক। আবার এই গবাদি পশুর কারণেই শহরের মানুষ মাংস, ডিম, দুধ খেতে পারছেন। তাদের পুষ্টির যোগান হচ্ছে।
মহিষ পালন সম্পর্কে তিনি বলেন, উপকূলীয় চরাঞ্চল এবং উত্তর বঙ্গে মহিষ পালন সম্পর্কে কম বেশি সবাই জানেন। মহিষের ব্যবহার এক সময়ে পরিবহনের জন্যে (মোষের গাড়ী) হলেও এর মাংস এবং দুধ থেকে তৈরি দই বিশেষভাবে সমাদৃত। চট্টগ্রাম, ফেনি, নোয়াখালি, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, পটুয়াখালি ও বরগুনার উপকূলীয় চরের বাথানে আরনি মহিশ পালন করা হয়। বাংলাদেশে মহিষের সংখ্যা ১৫ লাখ। তারা প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া উরি এবং এলি ঘাসের ওপরই নির্ভর করে বেঁচে থাকে। তাদের জন্য ঘর লাগে না, খোলা মাঠেই থাকে। মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি দই সবার খুব প্রিয় খাদ্য। দেশজ দুধ উৎপাদনে মহিষের অবদান ৪ শতাংশ। ভোলার মহিষের দই জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। উপকূলীয় এলাকা ছাড়াও নদীর মহিষ পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পাওয়া যায়। সিলেট বিভাগে জলাভূমির মহিষ পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে বেশি মহিষ (৫৪%) উপকূলীয় অঞ্চলে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওড়ের মহিষের সংখ্যাও কম নয়। উপকূলীয় অঞ্চলে জেগে উঠা নিত্য নতুন চর ও সরকারি খাস জমি খামারিদের মাঝে চারণভূমি হিসেবে ব্যবহারের জন্য সমবায়ভিত্তিক বন্দোবস্ত প্রদান করার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকগণের সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে, যেন এসকল অঞ্চলের সাধারণ জনগোষ্ঠি মহিষ পালনে আরো উৎসাহী হয়। বাথান ছাড়া মহিষ পালন কঠিন। গরুর মতো ঘরে রেখে মহিষ পালন নিয়েও গবেষণা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন এবং উন্নয়নের সাথে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন খুবই ঘনিষ্টভাবে জড়িত। উন্নয়ন কর্মকান্ডে নারীদের জন্যে যেকোন অর্থকরি কাজ বেছে নিতে হলে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালন ছাড়া উপায় নেই। এগুলো পালন করে নারীরা নিজেদের এবং তাদের পরিবারের আয়-উন্নতি করেন, ছাগল পালন থেকে শুরু করে গরু পালন করে ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া করান, পরিবারের চিকিৎসার খরচ মেটান এমন কি ঋণ পরিশোধেও ভূমিকা রাখতে পারেন। নারীর নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে গবাদিপশুকেই দেখা হয়।
বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা একটি বড় সমস্যা। স্কুল ফিডিং কর্মসুচিতে দুধ দেয়া শিশুদের বেড়ে ওঠার বয়সে প্রয়োজনীয় পুষ্টি যোগানে বড় ভুমিকা রাখতে পারে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সারা দেশে ৭০ হাজার শিক্ষার্থীদের মাঝে দুধ বিতরণ করছে।
তিনি বলেন, দুধ উৎপাদন ও আমদানি বাংলাদেশে দুধ উৎপাদন খামারী পর্যায়ে কৃষকের বাড়ি বাড়িতে হচ্ছে, অন্যদিকে আমাদের বেসরকারি পর্যায়ের ডেয়ারি ফার্মগুলো দুধ উৎপাদন করছে। বাজারে দুধের চাহিদা (১৬২.৩৩ লাখ মে টন) থাকলেও উৎপাদন হচ্ছে ১৫৫.৩৮ মে টন। উল্লেখ্য এই উৎপাদনের ৭৫-৮০% উৎপাদন করে মাঝারি ও প্রান্তিক খামারীরা করছেন, বাকীটা আসে বাণিজ্যিক খামারের মাধ্যমে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে একদিকে দুধ উৎপাদনে ঘাটতির কারণে গুড়া দুধ আমদানি করা হচ্ছে অন্যদিকে দুধ সংগ্রহের জন্য চিলিং সেন্টারের অভাবে এবং সংঘবদ্ধ্বভাবে দুধ বিক্রির সুবিধা না থাকায় গ্রামীণ নারীরা অতি অল্প দামে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। উদবৃত্ত দুধ ফেলে দিতে হচ্ছে। মিল্ক ভিটা সমবায়ের মাধ্যমে দুধ সংগ্রহ করে সিরাজগঞ্জে হাজার হাজার খামারীর নিশ্চিত দুধ বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। সারা দেশে এই ধারণের আরো অনেক সমবায় গড়ে তুলতে হবে। মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয় দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পুর্ণ হয়ে আমদানি নির্ভরতা কমাবার চেষ্টা করছে। দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
গবাদিপশুর মূল খাদ্য হচ্ছে ঘাস। দেশে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খাদ্য ঘাটতি মেটানোর জন্য সারা দেশে খামারীদের উন্নতজাতের ঘাস, অপ্রচলিত ফডার শস্য ও ভূট্টা চাষে উদ্বুদ্ধ করা এবং ঘাসের কাটিং বা বীজ সরবরাহ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সরকারী বিভিন্ন খাস জমি, জনপথ, বাঁধ, রাস্তার ধার ও চরাঞ্চলে ঘাস চাষ করার জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন। উপরন্তু জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে ঘাসের প্লট তৈরি করে খামারীদেরকে ঘাস চাষে উৎসাহিত করতে হবে।
জি আই পণ্য ব্ল্যাক বেঙ্গল
বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগলের মাংসের পুষ্টিমান ও চামড়ার গুণগত মান বিবেচনায় বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত। যার ফলে বিদেশে এই ছাগলের মাংস ও চামড়া রপ্তানির চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও, বাংলাদেশে প্রতিবছর গবাদিপশু থেকে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন বর্গফুট চামড়া উৎপাদিত হয়। যার শতকরা ৬০ভাগ অভ্যন্তরীন চাহিদা পূরণ করে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকার চামড়া রপ্তানি করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, চামড়া সংরক্ষণ ও উন্নয়নে খামারী পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, সঠিক উপায়ে চামড়া ছাড়ানো এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
রোগের চিকিৎসা ও ভ্যাক্সিন
প্রাণিস্বাস্থ্যের উন্নয়নে একটি বড় বাধা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের রোগ-বালাই। এসকল রোগ প্রতিরোধে প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান হতে প্রতিবছর ১৭টি রোগের প্রায় ৩৪ কোটি ডোজ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির টিকা উৎপাদন ও বিতরণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি উদ্ভূত গবাদিপশুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ (LSD) রোগ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে প্রায় ১৭ লক্ষ মাত্রা টিকা মাঠ পর্যায়ে প্রদানের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া, গবাদিপশুর অন্যতম ক্ষুরা রোগ (FMD) মুক্ত অঞ্চল (Zoning) তৈরীর লক্ষ্যে দেশের ৪ টি জেলায় (সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মানিকগঞ্জ ও ভোলা) টিকাদান কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সারাদেশ থেকে ছাগলের মারাত্মক সংক্রামক রোগ পিপিআর (PPR) নির্মূলে প্রায় ৬ কোটি ডোজ টিকা সাম্প্রতিক সময়ে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করা হয়েছে।
প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়, প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তর ও প্রাণি সম্পদ গবেষণা কেন্দ্রে রয়েছে বিপুল সংখ্যক মাঠ পর্যায়ের ভেটেনারি সার্জন এবং ল্যাবরেটরীতে কাজ করছেন একদল দক্ষ ও মেধাবী বিজ্ঞানী। আপনারা জেনে খুশি হবেন যে মাঠ পর্যায়ে ভেটেনারি চিকিৎসক ও সেবা প্রদানকারীদের জন্য ভেটেনারি ও এনিমেল হাসবেন্ডারি এক্ত্র করে কম্পাইন্ড কোর্সের প্রস্তাব জনপ্রশাসন থেকে অনুমোদিত হয়েছে। এই দাবি মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের বহুদিনের।
প্রাণিকল্যাণ সম্পর্কে তিনি বলেন,
প্রাণিসম্পদকে শুধু মানুষের খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করলেই হবে না। তারা মানুষের মতোই প্রাণি, তাদের প্রতি মায়া মমতা এবং দায়িত্ব পালন করতে হবে। কোন প্রকার নিষ্ঠুর আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। প্রাণি কল্যাণ আইন ২০১৯ অনুযায়ি “প্রত্যেক প্রাণির মালিক বা তত্ত্বাবধানকারীর দায়িত্ব হইবে যৌক্তিক কারণ ব্যতীত, উক্ত প্রাণির প্রতি কল্যাণকর ও মানবিক আচরণ করা এবং নিষ্ঠুর আচরণ করা হইতে নিজে বিরত থাকা”... অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ সংঘটন করিলে বা সংঘটনে সহযোগিতা করিলে উহা এই আইনের অধীন অপরাধ হিসাবে গণ্য হইবে।
যারা প্রাণিকল্যাণ নিয়ে কাজ করেন তাদের আমি বিশেষভাবে সম্মান করি। কারণ তাঁরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন “আপনার আমার মতো এই পশু পাখিরও প্রাণ আছে। তাদের ক্ষুধা আছে, অসুখ বিসুখ আছে। তারা মানুষের ভালবাসা চায়, নিষ্ঠুর আচরণ নয়” ।
উপদেষ্টা বলেন, পবিত্র রমজান মাসে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর কাছে স্বল্পমূল্যে প্রানিজ আমিষ সরবরাহ করা হয়। এই কর্মসুচিটি সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ বছর (২০২৫) পবিত্র রমজান মাসে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এবং খামারিদের সহযোগিতায় মোট ৪৯৫টি ভ্রাম্যমাণ বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে দুধ, মাংস ও ডিম পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে এ বছর ৯ লাখ ৬৮ হাজার জন ভোক্তার মাঝে মোট ৩১ কোটি ৭৩ লাখ ১২ হাজার টাকার সমমূল্যের প্রাণিজ পণ্য বিক্রয় করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে উপদেষ্টা বলেন, প্রাণিজাত খাদ্যের অপ্রতুলতা, এন্টি মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স, প্রাণিজ উপজাত ব্যবহার, মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে পরস্পর সংক্রমণযোগ্য রোগসমূহ দমন, ইমার্জিং ও রি-ইমার্জিং রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বর্তমান সময়ে প্রাণিসম্পদ খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তবর্তীকালীন সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
পাশাপাশি, গবাদিপশু পালনে নতুন নতুন প্রযুক্তি প্রান্তিক খামারীদের মাঝে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করবে, যা দেশের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শেষ করা আগে কিছু সমস্যার কথাও তুলে ধরতে চাই
উপদেষ্টা বলেন, গবাদিপশু খামারীদের বাণিজ্যিকহারে বিদ্যুত বিল দিতে হয়। এর ফলে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং প্রাণিজাত পণ্যের দামও সাথে বেড়ে যায়। আমরা গত একবছর ধরে এই বিষয়ে কাজ করছি। কিছু অগ্রগতি হয়েছে। আমরা আশাবাদী সরকার থেকে বিদ্যুতে রেয়াতের অনুমোদন পাওয়া যাবে।
২। কৃষি ও অন্যান্য কাজে কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে গবাদিপশুর খাদ্যের অভাব ঘটে, এবং অনেক সময় কীটনাশক দেয়া মাঠে ঘাস খেয়ে অসুস্থ হয়ে যায়, কখনো মারাও যায়। কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে নীতিমালা থাকা দরকার।
৩। কৃষি জমিতে তামাক চাষের কারণে সেই সব এলাকায় গবাদিপশু ও হাঁস মুরগি পালন করা যায় না। তামাক পাতার বিষাক্ততা গবাদিপশু, পাখীর জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর।
৪। সারা দেশে দুধ সংগ্রহের জন্য চিলিং সেন্টার না করে দুধ আমদানি করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র খামারীদের দুধ বিক্রয়ের জন্য সমবায় পদ্ধতিতে দুধ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা দরকার।
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে এগিয়ে নিতে আমাদের অগ্রাধিকার—নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও রেসিডিউ নিয়ন্ত্রণ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ, জলবায়ু-সহনশীল খামার ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জাত সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, এবং এলডিসি–গ্র্যাজুয়েশন–পরবর্তী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি। প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের দেশীয় জাত পালনের সুবিধা এবং জলবায়ু সহনশীলতা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। দেশীয় জাত পালনে খামারিদের প্রনোদোনা প্রদান করা প্রয়োজন। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় প্রজাতির পরিচিতি কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে এবং উৎপাদিত পণ্য (মাংস, দুধ ও ডিম) বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। দেশীয় প্রজাতির প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ও সংরক্ষণ নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জনবল কাঠামো অধিকতর সংশোধন করা প্রয়োজন। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র খামারীদের সুরক্ষা তহবিল গঠন করা যেতে পারে। গবাদিপশু হাঁস মুরগীর অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পন্ন রোগসমূহ নির্মুল এবং জুনোটিক রোগ এবং এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিজসট্যান্স প্রতিরোধে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী প্রকল্প গ্রহন করা যেতে পারে। সেই সাথে প্রাণিসম্পদ কর্মীদের আন্তরিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।