ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১৭:৫৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
সংবিধান সংস্কারের ঐতিহাসিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে গণভোট আয়োজনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। গত ১৯ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগকে চিঠি দিয়ে দ্রুত ‘যথোপযুক্ত আইন’ প্রণয়নের অনুরোধ জানিয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন কয়েক মাস আগে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন।
ওই আদেশের ধারা-৬এ গণভোট আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সহায়ক আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে এই চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে যথাযথ আইন প্রণয়নের জন্য ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ’ করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে; যা এখন গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতির প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক ধাপ। চলতি সপ্তাহে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আইনটি চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে। এরপর অধ্যাদেশ জারি হবে। সরকারের একটি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব তানিয়া আফরোজ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবসমূহ অনুমোদনে গণভোট প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছেন। উক্ত আদেশের ধারা-৬এ গণভোট অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে যথোপযুক্ত আইন প্রণয়নের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনকে কার্যকর প্রস্তুতির সুযোগ দিতে গণভোটের উপযোগী আইন প্রণয়ন জরুরি। বিষয়টি লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের কার্যপরিধির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে যে গণভোট হবে, সে বিষয়ে তিন-চার দিনের মধ্যে আইন প্রণয়ন করা হবে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে এটি সম্পন্ন করা হবে।
উল্লেখ্য, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে দেশে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু সেই গণভোট বিষয়ে এখনও অধ্যাদেশ জারি হয়নি। এ কারণে গণভোট নিয়ে নিজেদের করণীয় নির্ধারণ করতে পারছে না নির্বাচন কমিশন। সম্প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে গণভোটের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন। সে সময় তিনি বলেন, অধ্যাদেশ হলে তখন এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য তার একটা দায়বদ্ধতা থাকবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে গণভোট খুব কমই হয়েছে। তাই নতুন আইন হতে যাচ্ছে, এতে জনগণের যেমন প্রত্যাশা রয়েছে; তেমনি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণভোট আইন প্রণয়ন করা যেমন জরুরি, তেমনি এই আইন যেন জনগণের কাছে বোধগম্য হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা দরকার। ফলে গণভোট আয়োজনের পথে ‘আইন প্রণয়ন’ ধাপটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠির মাধ্যমে সেই ধাপটি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। তাদের মতে, সামনে সময় সংকট, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যÑ এই তিন বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। তবে সবকিছু সঠিকভাবে সমন্বয় করতে পারলে বাংলাদেশ সংবিধান সংস্কারের পথে এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, গণভোট পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট আইন অপরিহার্য। তাই দ্রুত আইনটি এগিয়ে নিতে নির্দেশনা রয়েছে। ব্যালট পদ্ধতি, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, প্রচারের বিধি, ফলাফল চূড়ান্ত করার নিয়ম সবকিছু আইনি প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হতে হবে। বাংলাদেশে গণভোট বিষয়ে কোনো আইন নেই। তাছাড়া জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত রয়েছে। তাই আইন প্রণয়নের জন্য বিকল্প সাংবিধানিক কাঠামো ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবে সময় সংকটই সবচেয়ে বড় বাধা বলে সূত্র বলছে। কারণ আইন প্রণয়ন, তার বিধিমালা তৈরি, মাঠ প্রশাসনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করাÑ সবই সময়সাপেক্ষ। তাই নতুন আইন হলে নির্বাচন কমিশনের পরিচালন সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ বাজেটও লাগবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণমতের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোট জরুরি। জুলাই জাতীয় সনদে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, নির্বাচনী কাঠামো সংস্কারের মতো বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। এগুলোর বৈধতা পেতে গণভোট গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তারা সতর্ক করেছেন প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।
সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা। গণভোট আয়োজন প্রশাসনিকভাবে খুব জটিল কাজ। এখন আইন ছাড়াও ভোটার তালিকা প্রস্তুতি, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, লজিস্টিক ব্যবস্থাপনাÑ সবকিছু অন্তর্বর্তী সরকারের কাঁধে। সময় কম, তাই কাজটি হবে সরকারের বড় পরীক্ষা।
সরকারের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানাচ্ছে, গণভোট আইনে সম্ভাব্য কিছু বিষয় সংযুক্ত করতে পারে। যেমন ধরন ও পরিধি হিসেবে কোন পরিস্থিতিতে গণভোট বাধ্যতামূলক বা ঐচ্ছিক হবে, সাধারণ তালিকা ব্যবহার নাকি আলাদা তালিকা তা নির্ধারণ। সমান সুযোগ, ব্যয়ের সীমা, ভোটগ্রহণ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত ব্যালট, ইভিএম, বিদেশে ভোটগ্রহণÑ সবই আইনে স্পষ্ট থাকতে পারে। পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের ভূমিকায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষণের পরিধি ও অধিকার থাকবে। ফলাফল চূড়ান্তকরণে উপস্থিতির হার, কোন আদালত বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল দেখবে, তা বিধিবদ্ধ করা।
সূত্র আরও বলছে, আইন প্রণয়ন জরুরি হওয়ায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে লেজিসলেটিভ বিভাগে চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। চিঠি পাঠানোর পরপরই আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ বিভাগ একটি নীতি খসড়া তৈরি করছে। চূড়ান্ত শেষে আইন মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে সমন্বয় করা হবে। চূড়ান্ত খসড়া রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের জন্য বঙ্গভবনে পাঠানো হবে। এরপর নির্বাচন কমিশন প্রাথমিক গণভোট প্রস্তুতি শুরু করতে পারবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সংস্কার বাস্তবায়ন এখন রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। তাই আইন প্রণয়ন দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।