প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৪৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সামনের দিনে আরও বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকার বহুতল ভবনগুলো কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুরান ঢাকাসহ পুরো রাজধানীকে ভূমিকম্প বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি পুরনো ভবনগুলোর জন্য এখনই প্রকৌশলগত সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানীর ১৪টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসার মো. সালাহ উদ্দীন-আল-ওয়াদুদ। তার দেওয়া তথ্যমতে, মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় ১টি, আরমানিটোলায় ১টি, সূত্রাপুরের স্বামীবাগে ১টি, বনানীতে ১টি, কলাবাগানে ১টি। এ ছাড়াও বসুন্ধরায় ১টি, নর্দ্দা এলাকায় ১টি, দক্ষিণ বনশ্রীতে ১টি, মোহাম্মদপুরে ১টি, খিলগাঁও এলাকায় ২টি, বাড্ডা এলাকায় ১টি, মগবাজারের মধুবাগে ১টি এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় ১টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদরা জানিয়েছেন, শহরের নতুন ভবনগুলো বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী নির্মাণ হওয়ায় হাইরাইজ ভবনগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তবে পুরনো ও নন-ইঞ্জিনিয়ারড ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা এসব ভবনে স্ট্রাকচারাল অডিট এবং প্রয়োজনীয় রেট্রোফিটিং করার পরামর্শ দিচ্ছেন, যাতে সম্ভাব্য বিপর্যয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বিশেষজ্ঞরা প্রস্তাব দিয়েছেন : রাজধানীর স্কুল, হাসপাতাল, গার্মেন্টস ও শপিংমলে মাস্টার স্ট্রাকচারাল অডিট প্রোগ্রাম চালু করা, অক্যুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়া ইউটিলিটি সংযোগ বন্ধ রাখা, রেট্রোফিটিংয়ে লো-ইন্টারেস্ট লোন ও ট্যাক্স ইনসেনটিভ দেওয়া এবং সিসমিক-সেফ নির্মাণ বিষয়ে ট্রেনিং ও লাইসেন্সিং বাধ্যতামূলক করা।
আর্কিটেক্টরা মালিক ও বাসিন্দাদের পরামর্শ দিয়েছেন এখনই স্ট্রাকচারাল অডিট করাতে, রেট্রোফিটিংয়ে কলাম জ্যাকেটিং ও শিয়ার ওয়াল সংযোজন করতে, অবৈধ পরিবর্তন বন্ধ করতে এবং ইন্টেরিয়রে ভারী উপকরণ নিরাপদ স্থানে রাখার জন্য।
আর্কিটেকচার রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এআরডি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুন নাহার মুন্নী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটি ভবন ভূমিকম্প-সহনশীল হওয়ার জন্য কলাম, বিম ও স্ল্যাবের সঠিক ফ্রেমিং, প্রয়োজনমতো শিয়ার বা কোর ওয়াল, ভালো মানের কংক্রিট ও স্টিল, সিসমিক ও উইন্ড লোড ক্যালকুলেশন এবং শক্ত ফাউন্ডেশনসহ ডিটেইলিং থাকা জরুরি। দুর্বল ভবনের প্রধান কারণ হলো খারাপ কংক্রিট বা কম স্টিল ব্যবহার, গ্রাউন্ড ফ্লোরে কলাম কেটে বড় শোরুম বা ব্যাংক বানানো, সফট স্টোরি বা ওপেন স্পেস বেশি থাকা এবং পাতলা পার্টিশন ওয়াল বা ভারী কাচ ও শোকেস।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘শহরে নির্মিত বড় বড় কিছু ভবন মান ও কোয়ালিটি ঠিক রেখে নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে বহু ভবন রয়েছে, যেগুলোর ডিজাইন ও কংক্রিট-স্টিলের গুণমান পর্যবেক্ষণ করা হয় না। বিশেষ করে সম্প্রসারিত নগর এলাকায় প্রচুর ভবন আছে, যেগুলোর মাটি ভালো নয়। অনেক জায়গায় লুজ সয়েলের ওপর বা ভরাট জলাধারের ওপর ভবন তৈরি করা হয়েছে, যা তাদের আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। অনুমান অনুযায়ী, রাজধানীর প্রায় ৭০ ভাগ ভবন লুজ সয়েলের ওপর নির্মাণ হচ্ছে। সরু রাস্তার পাশে উচ্চতাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।’
‘গেল পাঁচ বছরে এত শক্তিশালীভাবে ভূমিকম্প অনুভূত হয়নি মন্তব্য করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, এটি বারবার সতর্কবার্তা দিচ্ছে। আমাদের প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। পুরনো বিল্ডিংগুলোকে মজবুত করার মতো প্রকৌশলগত সমাধানের দিকে এখনই যেতে হবে। রাজউকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রচুর বিল্ডিং হয়ে গেছে যেগুলোর ৯০ শতাংশেরই কোনো অনুমোদন নেই। এগুলোর কী হবে, যদি এ রকম ভূমিকম্প রিপিট করতে থাকে?’
তিনি আরও বলেন, বিল্ডিং কোডগুলো এখনকার নতুন ভবনে মানা হচ্ছে। কিন্তু যেসব পুরনো ভবন ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে এবং যেগুলো অনুমোদনহীন বা ব্যত্যয়পূর্ণ, সেগুলোর কী হবে? এমন ভবনগুলো ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন ভবনগুলো সঠিকভাবে ডিজাইন ও নির্মাণ হওয়ায় তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, তবে বিপুলসংখ্যক পুরনো ও নন-ইঞ্জিনিয়ারড ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এখন সময় এসেছে স্ট্রাকচারাল অডিট, রেট্রোফিটিং এবং কঠোর অক্যুপেন্সি নীতি কার্যকর করার, যাতে ভবিষ্যতে বড় কোনো ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।
ভূমিকম্পের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ঢাকা
ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, আমার মনে হয় ভূমিকম্পের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে ঢাকা। আমাদের এখনকার বিল্ডিংগুলো কোড মেনে চললেও, রাজউকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রচুর বিল্ডিং হয়ে গেছে, যেগুলোর ৯০ শতাংশেরই কোনো অনুমোদন নেই। এগুলোর কী হবে, যদি এরকম ভূমিকম্প রিপিট করতে থাকে? গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে আদিবাসী খাদ্য ও শস্যমেলার উদ্বোধনের পর তিনি এসব কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, আমার মনে হয় গত পাঁচ বছরে যে কয়বার ভূমিকম্প হলো, এই রকম জোরে এত শক্তিশালীভাবে ভূমিকম্পটা আমরা এর আগে কখনও অনুভব করিনি। এটা বারবার আমাদের একটা সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, ভূমিকম্প অন্য একটা জায়গায় অরিজিনেট করে, তার টেলের দিকে আমরা থাকি। সেখানেই যদি আমাদের এই অবস্থা হয়, তাহলে যেখানে অরিজিনেট করে, নিশ্চয়ই সেখানে আরও অনেক শক্তিশালী হয়।
তিনি বলেন, বারবার যে আমাদের সতর্কবাণীটা দেওয়া হচ্ছে, এটাকে তো আমাদের আসলে বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতিটা নেওয়া দরকার। সেটি নিচ্ছি না। যেমন ধরেন, আজকে আমি আপনাদের সঙ্গে যে অনুষ্ঠানে ছিলাম, সেখানে দ্রুততার সঙ্গে নেমে আমি একটা খোলা জায়গায় দাঁড়াতে পেরেছি। কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গাতে তো খোলা জায়গায় দাঁড়ানোর কোনো উপায়ই নেই।