ভূমিকম্প
ফারুক আহমাদ আরিফ ও রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৪১ এএম
আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৫৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
৩০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প হয়েছে গতকাল শুক্রবার। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর মাধবদীতে সংঘটিত ভূমিকম্পটির রিখটার স্কেলে মাত্রা ৫ দশমিক ৭। এ ভূমিকম্পে ঝাঁকুনিকে এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। আগামীতে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিগত ১০০ বছরে বাংলাদেশে বড় ধরনের তথা ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়নি। ফলে আগামীতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে দেশে। সেটি মোকাবিলায় এখনই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
তারা বলছেন, ভূমিকম্প সাধারণত তিন ধাপে ঘটে : ফোরশক, মেইনশক ও আফটারশক। শক্তিশালী ভূমিকম্পের আগে আজকের কম্পনকে ফোরশক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বড় ধরনের কম্পনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই ভূতত্ত্ববিদরা সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।
ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবির জানান, গতকালের ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী। তার ভাষায়, হিরোশিমা–নাগাসাকির একটি বোমা যে শক্তি রিলিজ করÑ আজকের ভূমিকম্প তার কাছাকাছি শক্তি মুক্ত করেছে।
এ প্রসঙ্গে আরেক ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার জানিয়েছেন, আমাদের দেশ তো ভূমিকম্পপ্রবণ। সামনে আরও বড় ভূমিকম্প হতে পারে। ভূমিকম্প এত বড় ঝাঁকুনি ও শক্তিশালী হওয়ার কারণ হলো দেশের পূর্ব প্রান্তটা হচ্ছে মিয়ানমার প্লেট, পশ্চিমটা হচ্ছে ইন্ডিয়ান প্লেট; এই সংযোগস্থলে ভূমিকম্প হয়েছে। ভূমিকম্পটিতে যে তীব্র, যে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে, তা তার অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের পটভূমিতে এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এই ভূমিকম্প বাংলাদেশের জন্য সজাগ হওয়ার বার্তা বলে মনে করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এমন ভূমিকম্প হওয়ারই কথা। রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হলে সবকিছু ভেঙে পড়ার আশঙ্কা আছে। এখন রাজধানীর ভবনগুলো পরীক্ষা করতে হবে। কারণ অনেকেই বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করে না।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের সাবেক ডিন ও ডিপার্টমেন্ট অব ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলেন্সের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ তথা এ অঞ্চলের ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামে ভূমিকম্পের তথ্য মেলে ১৫৪৮ সাল থেকে। তবে সেই ভূমিকম্পের মাত্রা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণের কোনো তথ্য নেই। গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ঢাকার অদূরে নরসিংদীর মাধবদীতে সংঘটিত ভূমিকম্পটি রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫.৭ ও মার্কিন ভূতত্ত্ব কেন্দ্রের তথ্যে ৫.৫। এটি হয়েছে ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে, আর স্থায়িত্ব ছিল ২৬ সেকেন্ড। মাধবদীর ভূমিকম্পটি বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্প হবে সেটির মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। কেননা আবহাওয়া অধিদপ্তর ৫.৭ মাত্রার কথা জানালেও আমার কাছে মনে হচ্ছে এটির মাত্রা আরও বেশি হবে। কারণ আমাদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তাতে তাই মনে হয়। নারায়ণগঞ্জের আশপাশে কয়েক বছরে আরও ছোট ছোট কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ বা এ ভূখণ্ডে বড় ভূমিকম্পের মধ্যে আছে ১৭৬২ সালের ২ এপ্রিল টেকনাফে ৮.৫ মাত্রার। এটি ‘গ্রেট আরাকান আর্থকোয়েক’ নামে পরিচিত। এর ফলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ফেনী, এমনকি কুমিল্লা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এরপর ১৮৯৭ সালে আসামে সংঘটিত ভূমিকম্প ছিল ৮ দশমিক ৭ মাত্রার। ১৯১৮ সালে সিলেটের বালিসিরা উপত্যকায় ৭ দশমিক ৬ মাত্রায় এবং ১৯৩০ সালে আসামের ধুবড়িতে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। সাধারণত কোনো অঞ্চলে যে মাত্রার ভূমিকম্প হয় ১০০-১৫০ বছরের মধ্যে আবারও সেই ধরনের ভূমিকম্প হয়ে থাকে। সে হিসাবে আমাদের দেশে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কেননা এ অঞ্চলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার ১০০ বছর পেরিয়ে গেছে।
সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, আগামীতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে সেটা সামাল দেওয়া আমাদের জন্য কঠিন। এ নিয়ে দেশে অনেক গবেষণা হয়েছে। রাজউক (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) বর্তমানে যে বিল্ডিং কোড দিয়েছে তা অবশ্যই মানতে হবে। নতুন ভবনের জন্য ৭ বা সাড়ে ৭ প্যারামিটার ইনটেনসিটির বিল্ডিং করতে হবে।
এর আগে চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর দেশের অভ্যন্তরে সর্বশেষ ভূমিকম্প হয়। সেদিন দুপুর ১২টা ১৯ মিনিটে অনুভূত ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলা। ঢাকা থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ছিল ১৮৫ কিলোমিটার।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে মোট ১৯টি ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গত ১৪ মাসে (২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত) ১১টি ভূমিকম্প ঘটে। এ ছাড়া ২০২৪ সালে মোট ১২টি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়। আর ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ভূমিকম্প হয়েছে ৭টি।