আরমান হেকিম
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৫১ এএম
ফাইল ফটো
আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ প্রায় তিনগুণ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ইসি জানাচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি, প্রবাসী ভোট কার্যক্রম এবং নাগরিকদের পরিচয়পত্র প্রদানে সেবার মান উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ অপরিহার্য।
ইসির তথ্য অনুযায়ী সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে এই বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) ১ সংশোধিত প্রকল্প’, যা নাগরিকদের পরিচয়পত্র প্রদানে সেবার মান উন্নয়নের সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। অন্যটি নতুন প্রকল্প ‘দেশের বাইরে ভোটদান সিস্টেম উন্নয়ন এবং বাস্তবায়ন’, যার মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিরাপদভাবে ভোট দিতে পারবে।
ইসি সূত্র জানায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জন্য ২২৯ কোটি ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নির্বাচনী এই বছরে সংশোধিত বাজেটে ৪৪০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৬৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চায় ইসি। এমন একটি প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে দিয়েছে ইসি সচিবালয়।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনীয় বছরের জন্য এই বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে কাজগুলো সুন্দরভাবে করা সম্ভব হবে।’
সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের উপসচিব এম মাজহারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা গত ১৮ নভেম্বর গ্রহণ করেছে।
ইসির তথ্যমতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ইসির জন্য দুটি প্রকল্প এবং থোক বরাদ্দ বাবদ মোট ২২৯ কোটি ৫ লাখ টাকা রেখেছে। এর মধ্যে ২১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) ১ সংশোধিত প্রকল্পের জন্য। ২০২০ সালে ডিসেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটি একনেক অনুমোদিত। মেয়াদ শেষ হবে চলতি ৩০ নভেম্বর।
মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া এই প্রকল্পটির মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি সংশোধিত বাজেটে এই প্রকল্পের ব্যয় ৪০০ কোটি টাকাসহ বৃদ্ধি প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি বছর প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ২১০ কোটি টাকা। ফলে ৪০০ কোটিসহ প্রকল্পটির ব্যয় বাড়িয়ে ৬১০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
চলতি বাজেটে থাকা আরেকটি প্রকল্প হচ্ছে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আইসিটি ব্যবহারে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্প। এই প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রেখেছে ৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। এ ছাড়াও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অননুমোদিত প্রকল্পের জন্য থোক বরাদ্দ হিসাবে ১০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর চার মাস পার হলে, দুই প্রকল্প এবং থোক বরাদ্দ থেকে এক পয়সাও খরচ করেনি নির্বাচন কমিশন।
এ অবস্থায় সংশোধিত বাজেটে আসছে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসি ‘দেশের বাইরে ভোটদান সিস্টেম উন্নয়ন এবং বাস্তবায়ন প্রকল্পের’ জন্য ৩৯ কোটি ৭০ লাখ ৫৮ হাজার টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। ইসিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অনুমোদন করেছে ৩৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে ২২৯ কোটি ৫ লাখ টাকার বরাদ্দ থেকে সংশোধিত বাজেটে ৬৫৮ কোটি ৭৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ ৪৩৯ কোটি ৭০ লাখ ৫৮ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সচিব ড. কাইয়ুম আরা বেগম বলেন, ‘প্রস্তাবটি বিবেচনা করা হবে। কারণ এটা নির্বাচনী বছর, সুতরাং সেভাবে ব্যয় হবে।’
৪০০ কোটি টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব
ইসি ২১০ কোটি টাকার ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং একসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) ১ সংশোধিত ’ প্রকল্পের ব্যয় ৬১০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্পের আবর্তক ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৮৯ কোটি ৪১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, যা এখন রয়েছে ৯০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। আর মূলধন ব্যয় ৭৭ কোটি ৩২ লাখ ৬৬ হাজার থেকে ১২০ কেটি ৫৮ লাখ ৫১ হাজার টাকা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১২০ কোটি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ৬১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ব্যয়ের খাতের মধ্যে প্রকল্পের মূল বেতন ধরা হয়েছে, শিক্ষা, বাড়ি ও চিকিৎসা ভাতা, মোবাইল বিল, আবাসিক টেলিফোন নগদায়ন ভাতা, টিফিন ভাতা, পোশাক ভাতা, প্রতিরক্ষা সার্ভিস ভাতা, ব্যাটম্যান ভাতা, ক্ষতিপূরণ ভাতা, উৎসব ভাতা, অধিকাল ভাতা, শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা, অ্যাম্পায়ন ভাতা, সম্মানী, বাংলা নববর্ষ ভাতা, অন্যান্য ভাতা, বিশেষ সুবিধা, আপ্যায়ন ব্যয়, পরিবহন সেবা: যানবাহন ব্যবহার, সেমিনার, বিদ্যুৎ, উপযোগ সেবা চার্জ, ইন্টারনেট, ডাক-কুরিয়ার, টেলিফোন, প্রচার ও বিজ্ঞাপন, অডিও ভিডিও নির্মাণ, অফিস ভবন ভাড়া, আউটসোর্সিং, নিবন্ধন ফি, পরিবহন ব্যয়, ব্যাংক চার্জ, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, প্রশিক্ষণ, পেট্রোল অয়েল ও লুব্রিকেন্ট, গ্যাস ও জ্বালানি, ভ্রমণ ব্যয়, কম্পিউটার সামগ্রী, মুদ্রণ ও বাঁধাই, স্ট্যাম্প ও শীল, অন্যান্য মনিহারি, কনসালট্যান্সি, মোটরযান মেরামত ও সংরক্ষণ, আসবাবপত্র, কম্পিউটার, অফিস সরঞ্জামাদি, অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরাঞ্জামাদি, অন্যান্য ভবন ও স্থাপনা, বৈদ্যুতিক স্থাপনা মেরামত ও সংরক্ষণ এবং মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ টাকা ব্যয় হবে।
অপরদিকে দেশের বাইরে ভোটদান সিস্টেম উন্নয়ন এবং বাস্তবায়ন প্রকল্পের জন্য ৩৯ কোটি ৭০ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। সরকার অনুমোদন করেছে ৩৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটগ্রহণ সেবা দেওয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরীক্ষামূলকভাবে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্যে প্রবাসী ভোট কার্যক্রম শুরু করা হবে। প্রথম ধাপে দূতাবাসভিত্তিক বুথে ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। ভোটাররা আগেই অনলাইনে নিবন্ধন করবেন, এরপর নির্ধারিত দিনে পাসপোর্ট ও এনআইডি যাচাই করে ভোট দিতে পারবেন।