কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:৫০ পিএম
প্রতীকী ছবি।
বর্তমান জীবনের ব্যস্ততা, ব্যর্থ খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক চাপের কারণে বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। আর বাংলাদেশে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক, কারণ আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা অনেক ক্ষেত্রেই এই রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পুষ্টি এবং খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে যুক্ত পরিবর্তন উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ হলো এমন একটি অবস্থার নাম যেখানে রক্তনালিগুলোর ওপর রক্তপ্রবাহের চাপ দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে। এটি প্রাথমিকভাবে কোনো লক্ষণ দেখায় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, কিডনি সমস্যার পাশাপাশি মস্তিষ্কে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হাইপারটেনশন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বিভিন্ন পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপের শিকার। বাংলাদেশেও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
‘হেলথ সায়েন্সে প্রিভ্যালেন্স অ্যান্ড মেজর রিস্ক ফ্যাক্টরস অব নন-কমিউনিকেবল ডিজিজেস : অ্যা মেশিন লার্নিং বেইজড ক্রস-সেকশনাল স্টাডি’ শিরোনামে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে কার্ডিওভাসকুলার রোগ সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা হিসেবে ধরা পড়েছে। অংশগ্রহণকারীর প্রায় ৮৩ শতাংশের মধ্যে এই রোগ পাওয়া গেছে। পুরুষদের মধ্যে হৃদরোগ বেশি হওয়ায় তাদের রক্তচাপও মহিলাদের তুলনায় বেশি। চিনি ও রক্তের শর্করার রোগে লিঙ্গভিত্তিক কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি। তবে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই রোগগুলোও বেড়ে যায়। মধ্যবয়সিদের মধ্যে শ্বাসনালিজনিত রোগ বেশি লক্ষ করা গেছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর মধ্যে অনেকেই স্থূল। একাধিক রোগে ভোগার হারও তুলনামূলকভাবে বেশি; এক ধরনের রোগে ভোগেন ৩১ শতাংশ, দুই ধরনের রোগে ভোগেন ৩০ শতাংশ এবং দুটির বেশি রোগে আক্রান্ত ৩৮ শতাংশ। এ ছাড়া চিনি রোগে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮৬ শতাংশের হৃদরোগ দেখা গেছে। থাইরয়েডের সমস্যায় ভোগা রোগীদের সকলের মধ্যেই হৃদরোগ ধরা পড়েছে।
ঢাকা বিভাগের নির্বাচিত শহর ও গ্রামীণ এলাকায় পরিচালিত স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রাধান্য প্রায় ৩১ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এটি বেশি, প্রায় ৩৬.৯ শতাংশ, আর গ্রামীণ এলাকায় ৩০.৬ শতাংশ। উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে বয়স বৃদ্ধি, স্থূলতা, শারীরিক ক্রিয়াশীলতা কম থাকা এবং শিক্ষাগত অবস্থানের সম্পর্ক লক্ষ করা গেছে। বিশেষভাবে মধ্যবয়সি ও বৃদ্ধদের ঝুঁকি বেশি। জরিপ থেকে জানা যায়, শহুরে জীবনধারাÑ ফাস্টফুড গ্রহণ, কম শারীরিক কার্যকলাপ উচ্চ রক্তচাপের মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইনক্রিজিং ফ্রুট অ্যান্ড ভেজিটেবল কনজাম্পশন টু রিডিউস দ্য রিস্ক অব ননকমিউনিকেবল ডিজিজেস প্রতিবেদনের মতে, খাবারে অতিরিক্ত লবণ এবং ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি উচ্চ রক্তচাপের নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। পর্যাপ্ত ফল ও শাকসবজি না খাওয়ার কারণে ২০১৭ সালে বিশ্বে প্রায় ৩৯ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। পুষ্টিবিদদের মতে, স্বাস্থ্যকর খাবারের অংশ হিসেবে কম চর্বি, চিনি ও লবণযুক্ত খাবারের সাথে ফল ও শাকসবজি খেলে কিছু অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ডায়াবেটরজিস্ট ও ক্লিনিক্যাল ডায়েটেশিয়ান ডা. মৌসুমি আফরিন ইভা বলেন, আমরা প্রায়ই খাদ্যাভ্যাসের প্রভাবকে হালকাভাবে নিই। কিন্তু শুধু খাবার পরিবর্তন করলেও অনেকের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। প্রায় ৬০ শতাংশ রোগীর মধ্যে ডায়েট পরিবর্তনের মাধ্যমে রক্তচাপ কমানো সম্ভব হয়েছে। ডাবের পানি, কলা, মাল্টা, লেবু, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শসা, ক্যাপসিকামÑ এগুলো ফাইবার জাতীয়। এগুলো খেলে উচ্চ রক্তচাপের জন্য ভালো। এ ছাড়াও কলমিশাক, লালশাক খেতে হবে। এ ছাড়া প্রসেসড ও জাঙ্কফুড এড়ানো উচিত।
উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমানোর উপায় সম্পর্কে ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারন্যাশনাল কার্ডিওলজিস্ট, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মহসীন আহমেদ বলেন, অনেকেই ওজন কমানোর ওষুধ সেবন করেন, যার ফলে পা ও শরীর ফুলে যায় এবং কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায়। এসব কারণেই উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে। তবে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না, আর বাকি ১০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে কিডনি, হরমোন বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে এ সমস্যা দেখা দেয়।
তিনি আরও বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে ধূমপান ছেড়ে দিতে হবে, প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটতে হবে, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, মানসিক ও শারীরিক চাপ কমাতে হবে এবং নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব জানান, ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিএফএসএ ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং নিয়ে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ ও অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ারের (সিবিএইচসি) প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. গীতা রানী দেবী বলেন, উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব নিয়ে আমরা কাজ করছি। কমিউনিটি পর্যায় থেকেই কাজটি শুরু করা উচিত এবং সে অনুযায়ী পলিসি অ্যাডভোকেসির মাধ্যমে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেন, উচ্চ রক্তচাপসহ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের প্রকোপ কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিতের পাশাপাশি জীবনাচরণে পরিবর্তন আনতে হবে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি এমন একটি পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে হবে যেন প্রক্রিয়াজাত খাবার কেনার আগে মানুষ বুঝতে পারে কোন খাবারে কতটা লবণ ও অন্যান্য উপকরণ আছে।