বিবিসির নেওয়া সাক্ষাৎকার
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ২২:৪৬ পিএম
ফাইল ছবি।
তিনি যেন এখন ভাজা মাছ উল্টে খেতেও জানেন না। গত বছর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গণহত্যাসহ বিভিন্নভাবে দমন-পীড়নের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ একেবারেই অস্বীকার করেছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমনকি কুখ্যাত গুপ্ত কারাগার আয়নাঘরের নামও নাকি তিনি আগে শোনেননি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তার স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের সময় শতাধিক হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন তিনি, তাও তিনি অস্বীকার করেছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান মামলার রায় ১৭ নভেম্বর ঘোষণার কথা। তার আগে বিবিসির গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স সংবাদদাতা আনবারাসান ইথিরাজনকে ইমেইলের মাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই দাবি করেন। সাক্ষাৎকারটি শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) প্রকাশিত হয়েছে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ও বিবিসি বাংলায়।
এর আগে হাসিনার সাক্ষাৎকার বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এএফপি ও ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেন্ডেন্ট একই দিন গত ২৯ অক্টোবর প্রকাশ করে, যা নিয়ে এমনও সন্দেহ ও সমালোচনা হয় যে, সেটি কোনো এজেন্সি থেকেই সংবাদমাধ্যমকে সরবরাহ করা হতে পারে। এরপর গত ৭ নভেম্বর দিল্লি থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা দ্য উইকে শেখ হাসিনার নিবন্ধ ছাপা হয়, যাতে অনেক অপতথ্যের উপাদান রয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। ভারতের গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির ডেপুটি হাইকমিশনার পবন বাদেহকে আনুষ্ঠানিকভাবে গত ১২ নভেম্বর তলব করে উদ্বেগও জানিয়েছে বাংলাদেশ। এরপরই বিবিসিতে এলো এই সাক্ষাৎকার।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেওয়ার পর বিবিসির নেওয়া প্রথম এই সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেন, তার অনুপস্থিতিতে যে বিচার চলছে, তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রিত ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের’ সাজানো এক ‘প্রহসন’। দোষী সাব্যস্ত হলে তার জন্য মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। আর হাসিনার দাবি, এই বিচার শুরু থেকেই পূর্বনির্ধারিত দোষী সাব্যস্ত রায়ের দিকে এগোচ্ছিল।
সোমবারের (১৭ নভেম্বর) রায়কে সামনে রেখে রাজধানী ঢাকার ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ রায় বাংলাদেশের জন্য যেমন তাৎপর্যপূর্ণ তেমনি হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছাত্রনেতৃত্বের আন্দোলনে নিহতদের স্বজনদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
জাতিসংঘের মানবাধিকার তদন্তকারীরা বলেছেন, ক্ষমতা ধরে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় হাসিনা ও তার সরকারের পরিকল্পিত ও প্রাণঘাতী সহিংসতায় ১ হজার ৪০০ জন পর্যন্ত মানুষ নিহত হয়।
ভারত থেকে দেশে ফিরে বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, দেশত্যাগের আগের কয়েক সপ্তাহে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এসব অভিযোগ ‘সুস্পষ্টভাবে’ অস্বীকার করছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি অস্বীকার করছি না যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল, কিংবা অপ্রয়োজনে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গুলি চালানোর কোনো নির্দেশ আমি কখনও দিইনি।’
এ বছরের শুরুতে টেলিফোন আলাপের ফাঁস হওয়া একটি অডিও যাচাই করে বিবিসি আই, যেখানে শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। আদালতে সেই অডিওটি বাজানো হয়েছে।
এ বছরের জুলাইয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল এবং সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ হাসিনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়। রাষ্ট্রপক্ষ পলাতক থাকা কামালের মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে। অন্যদিকে আবদুল্লাহ আল-মামুন জুলাইয়ে তার ভূমিকার জন্য দোষ স্বীকার করলেও তাকে এখনও সাজা দেওয়া হয়নি।
বিচার প্রসঙ্গে হাসিনা বলেন, তিনি নিজের দিক তুলে ধরার সুযোগ পাননি বা নিজের আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ‘চূড়ান্তভাবে নিশ্চিহ্ন’ করতে তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে।
সোমবার তার পক্ষে থাকা আইনজীবীরা এক বিবৃতিতে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচার ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ জানিয়ে তারা জাতিসংঘে জরুরি আপিল দাখিল করেছেন। আগামী ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের ওপর আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
বিবিসির পক্ষ থেকে হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে সংঘটিত আরও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়েও জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, যা বিশেষ ট্রাইব্যুনালের আরেক মামলায় বিচারাধীন রয়েছে। সেই মামলাতেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হাসিনা।
হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে বাংলাদেশে আয়নাঘর নামের বেশ কয়েকটি গোপন কারাগারের খোঁজ পাওয়া যায় যেখানে বহু বছর ধরে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বন্দিদের আটকে রাখা হয়েছিল। তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
অপহৃত বা এসব কারাগারে আটক থাকা হাসিনার আরও বহু সমালোচক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অবৈধভাবে হত্যা করারও অভিযোগ রয়েছে। এর দায় কার ওপর বর্তায় জিজ্ঞেস করা হলে হাসিনা জানান তিনি এসব সম্পর্কে ‘জানতেন না’।
তার পতনের দিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে আয়নাঘরের কথা তিনি শোনেননি বলেও দাবি করেন। নেতৃত্বে থাকাকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের জন্য তার দায়ী থাকার বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি।
হাসিনা বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করছি। তবে কোনো কর্মকর্তার অপব্যবহারের প্রমাণ যদি থাকে, তবে তা যেন নিরপেক্ষ ও রাজনীতিমুক্ত প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়।’ তিনি আর তার সাবেক সরকারের আরও জ্যেষ্ঠ সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে পৃথক আদালতে বিচার চলছে, যা তারা অস্বীকার করছেন।