২৯ ডিসির ১০ জনই বিতর্কিত
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৫ ১১:১৭ এএম
আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:১৮ পিএম
ভোলার জেলা প্রশাসক আজাদ জাহান। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। একাধিক ভিডিও ফুটেজে এই কর্মকর্তাকে দেখা গেছে পঞ্চগড়ের সাবেক জেলা প্রশাসক জহুরুল ইসলামের সঙ্গে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিতে। অভিযোগ রয়েছে, সুবিধাভোগী কর্মকর্তা আজাদ জাহান দুর্নীতির টাকায় তার নিজের জেলা ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুতে প্রায় ৩০০ একর জমির ওপর গড়ে তুলেছেন মৎস্যঘের। অথচ তাকে ভোলা জেলার পর পুনরায় গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলায় নির্বাচনকালীন জেলা প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে!
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মিজ আফসানা বিলকিস। সামাজিক মাধ্যমে একাধিক পোস্টে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তার দলবাজির প্রমাণ জ্বলজ্বল করছে। একাধিক তথ্যচিত্রে দেখা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি আওয়ামী লীগের এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকীসহ হাসিনা পরিবারের সদস্যদের ছবি সামাজিক মাধ্যমের আইডি থেকে শেয়ার করেছেন। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শায়লা ফারজানার ছবিও তিনি শেয়ার করেছেন। তাকে পদায়ন করা হয়েছে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক হিসেবে।
একইভাবে নড়াইলের জেলা প্রশাসক থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জাহানকে। উপসচিব পদে পদোন্নতির পর তার নেতৃত্বে শেখ মুজিবুর রহমানের কবরে ফুল দিতে গিয়েছিলেন কয়েকজন আওয়ামী লীগপন্থী কর্মকর্তা। এই কর্মকর্তা নড়াইলে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নানা আর্থিক অনিয়ম এবং কয়েকজনকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা করায় খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন।
শুধু আজাদ জাহান, আফসানা বিলকিস কিংবা শারমিন আক্তার জাহান নয়, অনুসন্ধান বলছে, নির্বাচনকালীন মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব পেয়েছেন বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী অন্তত ১০ কর্মকর্তা। পাশাপাশি, মাঠ প্রশাসনে অভিজ্ঞতা না থাকার পরও ইকনোমিক ক্যাডারের অন্তত তিন কর্মকর্তাকে জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক জেলা প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ না উঠলেও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নতুন করে যাদের জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই সুবিধাভোগী ও আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে চিহ্নিত। তারা বলছেন, এতে একদিকে যেমন নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি সুবিধাভোগী হওয়ার পরও তার এ পদায়নে প্রশাসনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ গত শনিবার সরকার ১৫টি জেলায় এবং গত রবিবার ১৪টি জেলায় নতুন করে জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেয়। বদলি ও রদবদলের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
প্রসঙ্গত, প্রশাসনকে কার্যকর করার লক্ষ্যে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার সচেষ্ট রয়েছে। কিন্তু জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিতর্ক কিছুতেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পিছু ছাড়ছে না। এই মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মোখলেসুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিসি পদায়নে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে জনপ্রশাসন সচিব ও তার অনুগামী কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। নিয়োগবঞ্চিত কর্মকর্তাদের অনেকে একপর্যায়ে জনপ্রশাসন সচিবকে ঘেরাও করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক মিজ নাজমুন আরা সুলতানা নিয়োগ পেয়েছেন মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক হিসেবে। বঙ্গবন্ধু এবং ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ম্যুরালের সামনে একাধিক ছবি তুলে পোস্ট করতে দেখা গেছে তাকে। অভিযোগ রয়েছে, খাগড়াছড়ির ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে ফেনীর জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলামকে। সাইফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের শাসনামলে অর্থ বিভাগ, বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, একই জেলার সিনিয়র সহকারী কমিশনারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে কাজ করেছেন। সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তা ফেনীর জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দিয়েই এক আওয়ামী লীগ নেতার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হন। তার এই পদায়ন নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক।
এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. সাইফুর রহমানকে ময়মনসিংহ জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হচ্ছে। তিনি ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা। মাঠ প্রশাসনে তার উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা না থাকলেও তাকে জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মিজ নাজমুন আরা সুলতানাও ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা। মাঠ প্রশাসনে উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা না থাকার পরও মানিকগঞ্জ জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে তাকে পদায়ন করা হয়েছে। অথচ জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার বাধ্যবাধকতা রয়েছে; অন্যদিকে যোগ্য, দক্ষ ও বিচক্ষণ কর্মকর্তা হওয়ারও প্রয়োজন রয়েছে।
বাগেরহাটে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আহমেদ কামরুল হাসানকে পদায়ন করা হয়েছে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক হিসেবে। এই কর্মকর্তাও আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম সুবিধাভোগী কর্মকর্তা। ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কর্মরত ছিলেন তিনি। মাঠ প্রশাসনে কাজের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি দুই জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান।
সাবেক জনপ্রশাসনসচিব মোখলেস উর রহমানের সময়ের করা ডিসি ফিটলিস্ট থেকে বিসিএস ২৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার সিংহকে পদায়ন করা হয়েছে বরগুনার ডিসি হিসেবে। তিনি আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৮ সালে উপসচিব পদে পদোন্নতি পান। ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের সময় তিনি আশুগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে সহকারী রিটার্নিং অফিসার (এআরও) ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা চলমান। এছাড়া বিসিএস ২৮তম ব্যাচের ইকোনমিক ক্যাডার (বর্তমানে প্রশাসন) কর্মকর্তা গোলাম মো. বাতেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ২০১০ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সহকারী প্রধান পদে যোগ দেন। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ইকোনমিক ক্যাডার বিলুপ্ত হয়ে প্রশাসন ক্যাডার হলেও তিনি ওই পদে ছিলেন ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সহকারী কমিশনারসহ (ভূমি) মাঠ প্রশাসনে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে; তবুও তাকে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
মেহেরপুরের ডিসি হিসেবে পদায়ন পাওয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মিজ লুত্ফুন নাহার ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে এআরও ছিলেন। নির্বাচনের আগে ঢালাওভাবে আওয়ামী সুবিধাভোগীদের এই নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে চলছে বিতর্ক।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
এ প্রসঙ্গে প্রশাসন বিশ্লেষক ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দিলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়। নির্বাচনকালীন সময়ে মাঠ প্রশাসনের নিয়োগের প্রতিটি পদক্ষেপই নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত। নির্বাচনকালীন সময়ে জেলা প্রশাসকরা মাঠ প্রশাসনের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। তাঁদের নিরপেক্ষ ও পেশাদার আচরণের ওপরই নির্ভর করে নির্বাচনী পরিবেশের স্বচ্ছতা ও শান্তি। তাই তার নিয়োগে যদি রাজনৈতিক আনুগত্য বা পক্ষপাতের প্রশ্ন ওঠে, তা হলে জনগণের আস্থা নষ্ট হবে এবং প্রশাসন বিভক্ত হয়ে পড়বে। এর প্রভাব পড়বে নির্বাচনের সার্বিক গ্রহণযোগ্যতার ওপরও।’
তিনি বলেন, ‘জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে এখনই এ ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করা উচিত। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই মাঠ প্রশাসনে যারা দীর্ঘদিন কাজ করেছেন এবং দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন, তাঁদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। না হলে প্রশাসনের ভেতর ক্ষোভ ও বিভাজন আরও গভীর হবে, যা রাষ্ট্রীয় সেবার মান ক্ষুণ্ণ করবে।’
আরেক জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রশাসনিক কাঠামোর নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। বাংলাদেশের নির্বাচনী বাস্তবতায় জেলা প্রশাসক হচ্ছেন মাঠের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি শুধু নির্বাচনী সামগ্রী, আইনশৃঙ্খলা, প্রিসাইডিং অফিসার নিয়োগ নয়; প্রতিটি স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল কেন্দ্র। তাই এই ২৯ জন জেলা প্রশাসকের মধ্যে যদি এক-তৃতীয়াংশও পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সরকারের সুবিধাভোগী হয়ে থাকে, তাহলে জনগণ সেই প্রশাসনকে নিরপেক্ষ ভাববে না। এটি ভোটের দিনের কার্যক্রমে যেমন প্রভাব ফেলবে, তেমনি নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও সন্দেহ তৈরি করবে।’ তার মতে, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যদি সত্যিই স্বচ্ছ নির্বাচন চায়, তবে তার উচিত হবে এই নিয়োগগুলো পুনর্বিবেচনা করে মাঠ প্রশাসনের জন্য একটি নিরপেক্ষ ও যাচাইকৃত কর্মকর্তাদের প্যানেল তৈরি করা।