× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জাল টাকার নীলনকশা

তানভীর হাসান

প্রকাশ : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৫৩ এএম

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:০২ এএম

জাল টাকার নীলনকশা

দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের নীলনকশা নিয়ে মাঠে নেমেছে সীমান্তবর্তী একটি দেশ। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের বাজারে সুপরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সেখানে বানানো জাল টাকা। দেখতে হুবহু আসল নোটের আকৃতির এই জাল টাকা ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। নির্বাচন সামনে রেখে নীলনকশা প্রণয়নকারী দেশটি অন্তত কয়েকশ হাজার কোটি জাল নোট দিয়ে বাজার ছেয়ে ফেলার চক্রান্ত এঁটেছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য মিলেছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে এরই মধ্যে সীমান্তসহ সবখানে কঠোর নজরদারি বাড়িয়েছেন বিজিবিসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘র‌্যাব শুরু থেকেই জাল নোট তৈরির কারখানা এবং চক্রকে শনাক্ত করে আসছে। গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করে, সার্বিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান চালিয়ে জাল নোট তৈরির কারখানায় অভিযান চালানো হয়। এই চক্রটি যেন ভবিষ্যতে মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে, এজন্য আমাদের গোয়েন্দারা ব্যাপকভাবে কাজ করছেন।’ তিনি বলেন, ‘পাশের একটি দেশ থেকে জাল টাকা আসার বিষয়টি এরই মধ্যে র‌্যাবের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে র‌্যাবের নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।’ পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে নগদ টাকা লেনদেনে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন র‌্যাবের এই কর্মকর্তা।

প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও দেশে জাল নোটের আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১৯৭৩ সালের ১ মে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নোট বাতিল করা হয়। ১৯৭৪ সালের ৩০ মার্চ প্রতিবেশী একটি দেশ থেকে মুদ্রিত ১ টাকার মানচিত্র সিরিজের নোটটিও অচল ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া ১৯৭৪ সালে জাতীয় সংসদে জাল মুদ্রা প্রতিরোধে বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ পাস করা হয়।

গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, নির্বাচনের আগেই বড় অঙ্কের জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করছে পাশের একটি দেশ। এ লক্ষ্যে সেখানে তৈরি করা হচ্ছে ২০০, ৫০০ ও ১ হাজার টাকার জাল নোট। যার সঙ্গে দেশের টাঁকশালে ছাপা ও বাজারে প্রচলিত নোটের নিখুঁত মিল রয়েছে। এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাগজ ও ম্যাটেরিয়াল। আবার মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে জাল টাকা তৈরির উপাদান বিদেশ থেকে আমদানি করেও দেশে খুব সতর্কতার সঙ্গে জাল নোট তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট বাসা। যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়ানো যায়।

গত শনিবার রাত ৯টার দিকে শেরপুরের নালিতাবাড়ীর কেন্দুয়াপাড়া আমবাগান বাজার এলাকা থেকে ২১টি ১ হাজার টাকার জাল নোটসহ মেহেদী হাসান নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার মেহেদী হাসান নালিতাবাড়ী উপজেলার মধ্যমকুড়া গ্রামের মোজাম্মেল হকের ছেলে। এ সময় মেহেদীর সঙ্গে থাকা দুই সহযোগী পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যান।

নালিতাবাড়ী থানার ওসি সোহেল রানা জানান, উদ্ধার করা জাল নোটগুলো অবিকল আসল টাকার মতোই। খালি চোখে আসল-নকল পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে এসব জাল নোট পাচার করে স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এ ঘটনার আগে গত ১৩ অক্টোবর শেরপুর সদর উপজেলার গণইমিনাকান্দা গ্রামের শাহিনা বেগম উত্তরা ব্যাংকে ২ লাখ ৬৯ হাজার টাকা জমা দিতে যান। ব্যাংক কর্মকর্তারা টাকা গণনার সময় ৫৩টি ১ হাজার টাকার নোট জাল হিসেবে শনাক্ত করেন। এর আগে ৯ অক্টোবর শেরপুর সোনালী ব্যাংকে নুহু মিয়া নামে এক ব্যক্তি ২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা জমা দিতে গেলে তার টাকাতেও ২৫টি ১ হাজার টাকার জাল নোট ধরা পড়ে। দুজনই জানান, তারা ওই টাকা শেরপুর পোস্ট অফিস থেকে তুলেছিলেন। 

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পোস্ট অফিস থেকে টাকা তোলার পর তা অপর একটি ব্যাংকে জমা দিতে গেলে জাল নোটের বিষয়টি সামনে আসে। ধারণা করা হচ্ছে, কারবারিরা আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও জাল টাকা ছড়িয়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য। এ কারণে তারা নির্বাচনকে বেছে নিয়েছেন। কারণ এ সময় সবখানেই কালো টাকার প্রভাব পড়ে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাল নোট বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে পাশের দেশের চক্রান্তকারীদের। যে পরিকল্পনার সঙ্গে দেশের একটি মহলেরও যোগসূত্র থাকতে পারে। বিষয়টি নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চলছে বলে গোয়েন্দা সংস্থার ওই কর্মকর্তা জানান।

জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ডিসি-মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দারা জাল নোট চক্রের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়িয়েছে। যেকোনো উৎসবের আগে জাল নোট তৈরির চক্রের সদস্যরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় চক্রের সদস্যরা কিছুটা হলেও দমন হচ্ছেন।’

র‌্যাবের তথ্যমতে, গত বছরের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ২০টি অভিযান পরিচালনা করে ১৭ কোটি ৪৭ লাখ ৭৩ হাজার ৬৩৫ টাকা, ১৭ হাজার ৪০০ ডলার, ২০ হাজার ইউরো, ১৯ হাজার ৯০০ দিরহাম ও ২৯ হাজার ৬০০ সৌদি রিয়াল নোট জাল উদ্ধার করা হয়। এ সময় ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

র‌্যাব জানায়, জাল নোট তৈরি চক্র একসময় শুধু দেশি মুদ্রা জাল করত। এখন তারা দেশে বসে বিদেশি মুদ্রাও জাল করছে। নগরীর আন্দরকিল্লার বিভিন্ন প্রিন্ট কারখানা বা প্রেসে ছাপানো হচ্ছে ইউরো, ডলার, আরব আমিরাতের দিরহাম, সৌদি আরবের রিয়াল ও মিয়ানমারের কিয়াটসহ নানা মুদ্রার জাল নোট। এরপর সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হয় সারা দেশে। কোনো কোনো ই-কমার্স সাইটের মাধ্যমেও এসব জাল নোট ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতি বান্ডিল জাল নোট ছাপাতে খরচ পড়ে মাত্র ৩০ টাকা, যা বিক্রি হয় ১ হাজার টাকায়। এটাও দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি। কারণ সাধারণ নাগরিকদের বিদেশি টাকা সম্পর্কে ধারণা কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতা : দেশে জাল নোটের এমন বিস্তারে বাংলাদেশ ব্যাংকও সতর্কতা জারি করেছে। সম্প্রতি তারা গণমাধ্যমে এক সার্কুলারে জাল টাকা তৈরি, বহন ও লেনদেন দেশের প্রচলিত আইনে গুরুতর অপরাধ বলে জানায়। সেখানে বলা হয়, জাল নোটের প্রচলন রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং জাল নোটের উৎস, প্রবাহ ও ব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। জাল টাকার ঝুঁকি এড়াতে এবং জনগণকে সতর্ক থাকতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চারটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছে; সেগুলো হলোÑ নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য যাচাই, নোট গ্রহণের সময় এর জলছাপ, অসমতল ছাপা, নিরাপত্তা সুতা, রঙ পরিবর্তনশীল কালি ও ক্ষুদ্র লেখা ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। বড় অঙ্কের সব লেনদেন অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে। সন্দেহজনক কোনো নোট পেলে তাৎক্ষণিক নিকটস্থ থানা বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

বিজিবির নজরদারি জোরদার : জাল নোট প্রতিরোধে সীমান্ত এলাকায় অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। একই সাথে সীমান্ত অঞ্চলে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিজিবির সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সীমান্ত দিয়ে যেন কোনোভাবে জাল নোট দেশে প্রবেশ না করতে পারে, সেজন্য অতন্দ্র প্রহরায় দায়িত্ব পালন করছেন বিজিবি সদস্যরা। বিজ্ঞপ্তিতে জাল টাকার সঙ্গে জড়িত কোনো তথ্য থাকলে কাছের বিজিবি ক্যাম্প বা সদর দপ্তরে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিপুল জাল টাকাসহ আটক ২ 

রাজধানীর ওয়ারী থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জাল নোটসহ দুজনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল রবিবার রাতে ডিএমপির উপপুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এ তথ্য জানান। আটকরা হলেনÑ নূরুল হক (৩২) ও সাইদুল আমিন (২৪)।

তালেবুর রহমান জানান, গত শনিবার রাতে ওয়ারী থানার জুড়িয়াটুলি এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে নূরুল হক ও সাইদুল আমিনকে আটক করে ডিবি পুলিশ। এ সময় ৬ লাখ টাকার জাল নোট, ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকার আসল নোট, টাকা গণনার ১টি মেশিন, ২টি স্ট্যাপলিং মেশিন ও ২ প্যাকেট স্ট্যাপলার পিন জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় আটকদের বিরুদ্ধে ওয়ারী থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা