প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ ১৫:০২ পিএম
আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ ১৭:১৭ পিএম
বিজয় দিবস উদযাপনে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : ফোকাস বাংলা
বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধায় দেশের কিছু বাম দলের সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি প্রশ্ন তুলেছেনÑবামেরা কীভাবে তাদের নীতি-আদর্শ থেকে সরে এসে ১০ ট্রাক অস্ত্র, গ্রেনেড হামলা, টাকা পাচার মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সঙ্গে জোট বাঁধেন।
রবিবার (১৮ ডিসেম্বর) বিজয় দিবস উদযাপনে রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাম দলগুলোর সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া বাম দল ও সংগঠনগুলোর নেতাদের ইঙ্গিত করে এমন প্রশ্ন তোলেন সরকারপ্রধান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘পঁচাত্তরের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা কখনই চায়নি এই বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে নিজেদের মর্যাদা নিয়ে চলুক। তাদের লক্ষ্যটাই ছিল বিশ্বে বাংলাদেশ একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পাক। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়টা যেন ব্যর্থ হয়।’
তিনি বলেন, ‘আর সেজন্যই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে যাতে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। ধারাবাহিকতায় বারবার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে বাধা দেওয়া হয়েছে। কখনও ভোট কারচুপি করে, কখনও চক্রান্ত করে।’
তিনি বলেন, লাখো শহীদ রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল এ দেশের মানুষের জন্য। আর সেটা নস্যাৎ করেছে কিছু কুলাঙ্গার।
এ সময় তিনি কিছু বাম দলের নেতাদের সমালোচনা করে বলেন, ‘বামেরা এখন ৯০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। অর্থাৎ জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে আমাদের বাম, অতি বাম, স্বল্প বাম, তীব্র বাম, কঠিন বাম সব যেন এক হয়েছে, এক প্ল্যাটফরমে। ওই যে বলেছিল না, বিচিত্র এই দেশ। সেলুকাস! সে কথাই মনে হয়, কোথায় তাদের আদর্শ, কোথায় নীতি আর কোথায় কী?’
তিনি বলেন, ‘আর কী কারণে যারা হত্যাকারী, ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাকারবারিতে সাজাপ্রাপ্ত আসামি, গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে তার সাজাপ্রাপ্ত আসামি, টাকা পাচার করার সাজাপ্রাপ্ত আসামি, তাদের নেতৃত্বে এত বড় বড় তাত্ত্বিক, বড় বড় কথা বলে, এত কিছু বলে তারা এক হয়ে যায় কীভাবে? যায় কীভাবে সেটাই আমার প্রশ্ন।’
তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা এদেশের মানুষের উপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছিল, তাদের দোসর সেই রাজাকার আলবদর লজ্জা যে তাদের ক্ষমতায় বসিয়েছিল সেই জিয়াউর রহমান, তার দলের সাথে হাত মিলিয়ে আওয়ামী লীগকে হঠাতে হবে?’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অপরাধটা কী? আওয়ামী লীগ তো ক্ষমতায় বসে নিজে খাচ্ছে না, জনগণকে খাওয়াচ্ছে, গরীব মানুষকে ঘর দিচ্ছে, রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, শিক্ষার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। সংবিধানে বর্ণিত প্রতিটি মৌলিক চাহিদা আমরা পূরণ করে যাচ্ছি। প্রথমবার সরকারে এসে বলেছিলাম এদেশে কোনো কুঁড়েঘর থাকবে না, একটা টিনের চালা হলেও দিব, দিয়েছি।
‘দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক পরিবর্তন আনতে পেরেছি। সেখানে আমাদের দেশের নারী-পুরুষ সমানভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শামিল হচ্ছে, দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম অর্থনৈতিক উন্নয়নে করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়েছে তার ধাক্কাটা আমাদের দেশে এসে লেগেছে। প্রতিটি পণ্যের মূল্য আজ বৃদ্ধি পেয়েছে। করোনাকালীন সময়ে প্রত্যেক মানুষকে আমরা প্রণোদনা দিয়েছি, এখনো দিয়ে যাচ্ছি। সাত কোটির উপরে মানুষ এই সুবিধা ভোগ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের যেন পরম নির্ভরশীল হয়ে থাকতে না হয় এজন্য আমি উৎপাদন বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছি, সাশ্রয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছি। আজকে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশও করেছি আবার প্রত্যেক ঘরে বিদ্যুৎও দিয়েছি। যখন সারা বিশ্বের তেলের মূল্য গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে গেল খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কেউ সাশ্রয়ী হতে হয়েছে। কিছুদিন আমাদের দেশেও লোডশেডিং দিয়ে আমরা সাশ্রয়ী হওয়ার চেষ্টা করেছি। আল্লাহর রহমতে এখন আর অসুবিধা নাই।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে খরচ, তার থেকে আমরা কম মূল্যে বিদ্যুৎ দিচ্ছি। কাজে যে খরচ হয় সে খরচটা কিন্তু দিতেই হবে। আমাদের যেটুকু গ্যাস আছে সেটা তো আমরা ব্যবহার করছি, এরপরেও আমাদেরকে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। এজন্য আমাদের ব্যবসায়ী সমাজসহ প্রত্যেককেই আর একটু সাশ্রয়ী হতে হবে। এ জন্য যে, টাকা দিয়ে বিদেশ থেকে কিনছি এবং এর পরিবহন যে খরচ সেটা কিন্তু আপনাদের দিতে হবে, তা না হলে গ্যাস-বিদ্যুৎ দিতে পারবো না। আমরা তো এতদিন ভর্তুকি দিয়ে দিয়েছি, এতদিন টাকা ছিল দিচ্ছিলাম। এখন আমাদের সেভাবেই সাশ্রয় হতে হবে। সারা বিশ্বব্যাপী মন্দা, সেটাকে মাথায় রাখতে হবে।’
এ সময় প্রধানমন্ত্রী দেশের ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণির মানুষকেই সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিজয় আমরা এনেছি, সে বিজয় পতাকা সমুন্নত রেখে চলতে হবে। আর যেন ওই খুনি যুদ্ধাপরাধী যাদের আমরা বিচার করেছি এরা যেন আবার এসে দেশটাকে ধ্বংস করতে না পারে; সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।’
এ সময় তিনি বিএনপির ১০ ডিসেম্বরের কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বলেন, ‘বিএনপি তারা কেন ১০ ডিসেম্বর আন্দোলন করে? বিজয়ের মাস, বিজয় উৎসব করবে। তা না করে তারা সরকার উৎখাত করতে চায়। এতই সোজা?’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ পারে, আইয়ুব খানকে আমরা উৎখাত করেছি, ইয়াহিয়া খানকে আমরা যুদ্ধে পরাজিত করে উৎখাত করেছি, জিয়াকে পাই নাই, কিন্তু জিয়া যখনই যেখানে গেছে, সেখানে আন্দোলন করা হয়েছে। এরশাদকে উৎখাত করেছি, খালেদা জিয়া ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোট চুরির জন্য তাকে উৎখাত করা হয়েছে। আবার ২০০৬ সালে ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার দিয়ে ভোট করতে চেয়েছিল, সেটাও বাতিল হয়েছে। কাজেই আওয়ামী লীগ পারে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিজয়ের পতাকা সমুন্নত রেখে এগিয়ে যাব উন্নয়নের পথে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। গড়ে তুলব ২০৪১ সালে স্মার্ট বাংলাদেশ। আজকে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সে গতি আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের বিজয়ের মাসে বিজয়ের দিনে এটাই প্রতিজ্ঞা হবে, যে বিজয়ের পতাকা সমুন্নত রেখে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলব, উন্নয়নশীল দেশ হয়েছি এখন উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলব।’
আলোচনা সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলী সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রম, সীমিন হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মৃনাল কান্তি দাস, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।
সূচনা বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
সভা পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ ও উপপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।