ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর
মারুফ কামাল খান
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৩৩ এএম
আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৪:০৩ পিএম
‘আমি ফরাসি রাজমুকুটকে মাটিতে পড়ে ধুলোয় লুটাতে দেখে তলোয়ারের ডগা দিয়ে তা তুলে মাথায় পরেছি।’ এটি ফ্রান্সের ধ্রুপদি মহাবীর ও সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উক্তি। চরম এক নৈরাজ্যকর অবস্থায় ফরাসি সাম্রাজ্যের শাসনভার তাকে তুলে নিতে হয়েছিল নিজের কাঁধে। সে অবস্থার কথাই তিনি তুলে ধরেছেন এই বিখ্যাত মন্তব্যের মধ্য দিয়ে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় মহানায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানের উত্থানকেও ঠিক সেই অবস্থার সঙ্গেই তুলনা করা যায়। রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধ সরকারবিহীন চরম এক নৈরাজ্যিক পরিস্থিতিতে তাকে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়েছিল। তিনি কারও কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেননি। রাতের অন্ধকারে, ষড়যন্ত্রের কানাগলি পথে এসে তিনি রাজছত্র অপহরণ করেননি। নভেম্বরের এক পুণ্যপ্রত্যুষে প্রকাশ্য রাজপথে বিপুল উচ্ছ্বসিত সৈনিক-জনতার মিলিত পুষ্পবর্ষণের মধ্য দিয়ে ঘটে রাষ্ট্রক্ষমতায় তার অভিষেক। তিনি তরবারির ডগায় নিজ হাতে রাজমুকুটও তুলে নেননি। বরং চক্রান্তের চক্রব্যূহ তাকে বন্দি করেছিল। জীবন-মরণের সেই সন্ধিক্ষণে দেশরক্ষার সাধারণ সৈনিকেরা মুক্তির দূত হয়ে এসে তাদের সিপাহসালারকে মুক্ত করে আনন্দবন্যায় ভেসে রাজপথে নিয়ে আসে। তাদের সাথে যোগ দেয় সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। সৈনিক-জনতার মিলিত প্রতিরোধ যে-দেশের স্বাধীনতার সূত্র, সেই দেশে আবারও সে-সূত্রের অনন্যসাধারণ প্রয়োগে সেনানায়ক জিয়াউর রহমান হয়ে ওঠেন জনগণমন অধিনায়ক। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বরে ঘটে সেই যুগান্তকারী ঘটনা।
আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সাম্প্রতিক এ ঘটনা প্রায় সকলের জানা। তবু এই গল্প বারবার বলতে হয় এই কারণে যে, জিয়াউর রহমান, তার রাষ্ট্র পরিচালনা, তার প্রবর্তিত রাজনীতি এবং তার প্রতিষ্ঠিত দলকে অবৈধ বলার একটা মিথ্যাচারী অভ্যাস কারও কারও মধ্যে গড়ে উঠেছে। তারা বারবার বিএনপির জন্ম অবৈধ বলে ‘বার্থ সার্টিফিকেট’ দিয়ে চলেছেন। এই ভয়ংকর মিথ্যা ও বিকৃত ব্যাখ্যার পৌনঃপুনিক প্রচার চলেছে গত দেড় দশক জুড়ে রাষ্ট্রক্ষমতার মদতে।
কেন এবং কীভাবে অবৈধ?
এই দল নাকি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে গড়া হয়েছিল। কথায় কথা আসবেই। বাংলাদেশ নামের এই গণপ্রজাতন্ত্রে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সকল ইহজাগতিক ক্ষমতা আসলে জনগণের। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সম্মতি নিয়ে তাদের অনুমোদিত পন্থায় রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার অর্জন করে। জনগণের সেই ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাদের অনুমোদন ছাড়াই ১৯৭৫ সালে গণতন্ত্র হত্যা করে, সব দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল শাসন কায়েম করাটাই ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ। মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ও তখনকার সংসদের মেয়াদ বিনাভোটে আরও তিন বছরের জন্য বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল। শেখ সাহেবকে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট ছাড়াই অধিষ্ঠিত করে ঘোষণা করা হয়েছিল : ‘যেন তিনি নির্বাচিত।’
‘যেন তিনি নির্বাচিত’ বললেই কি কেউ নির্বাচিত হয়ে যায়? অবশ্য পরবর্তীকালে তার কন্যার নেতৃত্বে ‘যেন তারা নির্বাচিত’ বলে ঘোষিতরাই অনৈতিকভাবে সরকার গঠন করে অনেক দিন রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। এসব অবৈধ কাজের মাধ্যমে গঠিত বাকশাল সরকার পুরোপুরিই অবৈধ হয়ে গিয়েছিল। কেননা এসব কাণ্ড ঘটাবার জন্য জনগণের কোনো ম্যান্ডেট নেওয়া হয়নি। সেই বাকশালের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে সেনাবাহিনীর একাংশের সমর্থনে সরকার উৎখাত হয়, বাকশালের প্রভাবশালী নেতা খন্দকার মোশতাক ক্ষমতায় বসেন। তিনি একমাত্র দল বাকশালও বিলুপ্ত করে দেন। তবে এই পরিবর্তিত অবস্থাতেও প্রজাতন্ত্রের সংবিধান বহাল রাখায় মোশতাক সরকারের সাংবিধানিক বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
মোশতাককে হটিয়ে খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা দখল করেন। খালেদ খুবই বিস্ময়করভাবে তখনকার চিফ জাস্টিস সায়েমকে চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও প্রেসিডেন্ট বানান। চিফ জাস্টিসকে চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর বানাবার মতন ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এমন কিম্ভূতকিমাকার সরকারকে বৈধ বলার কোনো সুযোগ আছে কি? বিদ্রোহী খালেদ সেনাপ্রধান ও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে অপসারণ ও বন্দি করেন। নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করেন। সংবিধান স্থগিত করে, সংসদ বিলুপ্ত করে সারা দেশে পূর্ণ সামরিক শাসন বলবৎ করা হয়।
এই নৈরাজ্যকর অবস্থায় সৈনিকেরা সেনাছাউনি ছেড়ে বেরিয়ে এসে জনতার সমর্থনে বিপ্লব ঘটায়। তারা বন্দি জিয়াকে মুক্ত করে তার হাতে দেশ পরিচালনার ভার দেন। ৭ নভেম্বর প্রত্যুষে সিপাহি-জনতার পুষ্পবর্ষণের মধ্যে প্রকাশ্য রাজপথে রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার অভিষেক হয়। তবে সশস্ত্র বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে সবকিছু গোছানোর স্বার্থে জিয়া পুরো দায়িত্ব নেওয়ার আগে কিছুদিন সায়েমকেই তার স্বপদে রেখে দিয়েছিলেন।
জিয়াউর রহমান ক্যু করে ক্ষমতা দখল করেননি। তিনি বন্দি ছিলেন, সিপাহি-জনতা তাকে মুক্ত করে দেশ চালাবার দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি যখন দায়িত্ব নেন, দেশে তখন সংবিধান স্থগিত। কোনো দল নেই, রাজনীতি নিষিদ্ধ। সামরিক শাসনে দেশ চলছিল। জিয়াউর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে কোনো বৈধ সরকারও ছিল না। কেবল ছিল নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা, রক্তপাত। সামরিক বাহিনীতে দলাদলি, অনৈক্য, হানাহানি। জিয়া দায়িত্ব নিয়ে বললেন, এভাবে দেশ চলে না, চলতে পারে না। তিনি সবকিছুর আগে কঠিন পদক্ষেপে দেশরক্ষা বাহিনীতে শৃঙ্খলা, চেইন অব কমান্ড ও সংহতি ফিরিয়ে এনে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সংহত করলেন। তিনি বললেন, সামরিক শাসন কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না। দেশে সাংবিধানিক শাসন, রাজনীতি, গণতন্ত্র ফেরাতে হবে। বাকশাল করে জনগণের যেসব অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, ফিরিয়ে দিতে হবে সেসব অধিকার। তিনি বাকশালের বন্ধ করা সব সংবাদপত্র খুলে দিলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দিলেন। সকলকেই রাজনীতি করার অধিকার দিলেন। কোনো দল ছিল না। জিয়া সব দল গঠন করালেন। তিনি নিজে কোনো ফ্যানাটিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না। তবু ডান ও বাম নির্বিশেষে সকল মতামতের ভিত্তিতে দল গঠনের অধিকার অবারিত করে দিয়েছিলেন তিনি। গুপ্ত তৎপরতায় লিপ্ত বামপন্থী ও ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোকেও তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির প্রকাশ্য ধারায় নিয়ে আসেন। বাকশালের ভস্মস্তূপ থেকে আওয়ামী লীগেরও পুনর্জন্ম দেন। জিয়াউর রহমান দেশে জাতীয় নির্বাচন দেন। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ প্রায় সব রাজনৌতিক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। গণতন্ত্র ও জনগণের সব হৃত অধিকার ফিরিয়ে দেন জিয়া।
ভারতে আশ্রয় নিয়ে যারা আমাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত ছিলÑ সেই পলাতক বাকশালীদের দেশে ফিরে স্বাভাবিক জীবন বেছে নেওয়ার নিশ্চয়তা দিলেন জিয়াউর রহমান। ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনাকেও দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের সুযোগ দিলেন। এর সবকিছুই হলো জিয়ার উদারতা ও করুণায়। আর এর সুযোগে যারা এই দেশে আবারও রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পায়, সেই নিমকহারামেরাই পরবর্তীতে প্রচারণা চালিয়েছে, জিয়া অবৈধ শাসক ছিলেন, তার হাতে গড়া বিএনপিও অবৈধ।
জিয়া শুধু বিএনপিই গড়েননি, বাকশালের ভস্মস্তূপ থেকে আওয়ামী লীগেরও তিনি পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন। সেই বিবেচনায় মুজিবোত্তর আওয়ামী লীগের জনকও তিনি। জনক অবৈধ হলে কেবল বিএনপি কেন, আওয়ামী লীগের জন্মও যে অবৈধ হয়ে যায়!
আসলে সৈনিক-জনতার মেলবন্ধনে রচিত ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক পরিবর্তন বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন সম্পন্ন করে। একই সঙ্গে নব পরিচয়ে স্বতন্ত্র মর্যাদায় উত্থিত হয় বাংলাদেশি জাতিসত্তা এবং অধীনতামূলক মিত্রতার নিগড় ভেঙে জাতিরাষ্ট্র অর্জন করে পরিপূর্ণ সার্বভৌমত্ব।