প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৫ ১০:১২ এএম
শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে জলবায়ু অর্থায়নের জাতীয় বরাদ্দের অর্থ থেকে অর্ধের্কেরও বেশি লোপাট করা হয়েছে। দুর্নীতি হয়েছে জলবায়ু অর্থায়নে জাতীয় তহবিলের (বিসিসিটি) বরাদ্দের ৫৪ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে এ খাতের ৮৯১টি প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে ২৪৮.৪ মিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ২ হাজার ১১০.৬ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
‘বাংলাদেশে জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে গবেষণাটির প্রকাশ উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। মূল প্রতিবেদন তুলে ধরেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. মাহফুজুল হক। গবেষণায় যুক্ত ছিলেন টিআইবির মো. সহিদুল ইসলাম।
গবেষণায় বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিসিসিটি থেকে মোট ৪৫৮.৫
মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ অনুমোদিত হয়। এর মধ্যে ৫৪ শতাংশ বরাদ্দ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছে বলে
প্রাক্কলন করা হয়েছে। ট্রাস্টি বোর্ড ও কারিগরি কমিটির সদস্যদের যোগসাজশে এবং রাজনৈতিক
বিবেচনায় প্রকল্প অনুমোদনের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। অথচ তহবিল ব্যবস্থাপক হিসেবে বিসিসিটির
কর্মকর্তারা তা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেননি ।
মো. মাহফুজুল হক বলেন, জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রতিবছর
১২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক
তহবিল মিলিয়ে বছরে গড়ে মাত্র ৮৬.২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের মাত্র
০.৭ শতাংশ। তিনি বলেন, জাতীয় তহবিল থেকে বরাদ্দ প্রতিবছর গড়ে ৮.২ শতাংশ হারে হ্রাস
পাচ্ছে, যদিও আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে বরাদ্দ ৪৩.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবুও এ
অর্থ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত।
জাতীয় তহবিলের প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যর্থতার কথাও
উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। ৮৯১টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৪৯টির (৬১.৬%) মেয়াদ বৃদ্ধি করা
হয়েছে। গড়ে প্রকল্পের মেয়াদ ৬৪৮ দিন থেকে বেড়ে ১,৫১৫ দিনে পৌঁছেছেÑ অর্থাৎ ১৩৩.৮ শতাংশ
বৃদ্ধি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৪ বছর মেয়াদের প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লেগেছে ১৪ বছর। একইভাবে
আন্তর্জাতিক তহবিলের প্রকল্পেও বিলম্বের চিত্র পাওয়া গেছে। ৫১টি প্রকল্পের মধ্যে ২১টির
(৪১.২%) মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। গড়ে মেয়াদ ১,৯৫৮ দিন থেকে বেড়ে ২,৯৭৮ দিনে দাঁড়িয়েছেÑ
৫২.১ শতাংশ বৃদ্ধি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে আমাদেরকে যে পরিমাণ অর্থ দেওয়ার কথা তা আমরা পাচ্ছি না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিবছর জলবায়ু ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০-১২ বিলিয়ন ডলার দরকার।
কিন্তু ২০০৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আমরা পেয়েছি মাত্র ১.২ বিলিয়ন ডলার।
তিনি বলেন, দুর্নীতির কারণে জাতীয় তহবিলের ৫৪ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ অর্থের সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলেও তা দুর্নীতির কারণে পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ
ও প্রভাবশালীরা এ অর্থ লুটপাট করেছেন।
গবেষণায় ৯টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলোÑ বিসিসিএসএপি ২০০৯ এবং
জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত জাতীয় পরিকল্পনাসমূহ হালনাগাদ করে যুগোপযোগী করতে হবে এবং
জাতীয় পরিকল্পনাসমূহ বাস্তবায়নে ট্রাস্ট ফান্ড এবং উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জলবায়ু
সংশ্লিষ্ট অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে; জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন, ২০১০ সংশোধন
করতে হবে; রাজস্ব বাজেটের বাইরে বিসিসিটিকে উদ্ভাবনীমূলক কার্যক্রম যেমন, আন্তর্জাতিক
জলবায়ু তহবিল, কার্বন ট্রেডিং, ক্লিন ডেভেলপমেন্ট ম্যাকানিজমসহ বেসরকারি অর্থায়ন উৎস
থেকে তহবিল সংগ্রহে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে; থিমভিত্তিক, বিপদাপন্নতা ও ঝুঁকির ভৌগোলিক
বিন্যাসভিত্তিকএবং বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে বিসিসিটি
প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি সমন্বিত পথনকশা প্রস্তুত করতে হবে; পথনকশায় মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি
কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করে সেই অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন
করতে হবে; বিসিসিটির আওতায় স্বল্পমেয়াদি এবং টাকার অঙ্কে ক্ষুদ্র প্রকল্প বাস্তবায়ন
পরিহার করতে হবে। তবে নিরীক্ষার জন্য একটি পৃথক, স্বাধীন তদারকি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা
করতে হবে।