সরবরাহ বন্ধের হুমকি আদানির
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৩৩ এএম
আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৩৩ এএম
ছবি: সংগৃহীত
বিদ্যুৎ নিয়ে আবারও শুরু হয়েছে ভেলকিবাজি। ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেড হুমকি দিয়েছে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার। এই হুমকি এলো এমন এক সময়ে, যখন অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক কমিটি বিদ্যুৎ খাতের নানা অনিয়ম, বিশেষ করে আদানির সঙ্গে করা চুক্তির বৈধতা, মূল্য কাঠামো ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি তদন্ত করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের বিশেষজ্ঞ কমিটি জানিয়েছে, দুর্নীতি প্রমাণিত হলে এই চুক্তি বাতিলও হতে পারে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এমন এক স্পর্শকাতর তদন্তকাজ চলার সময় একটি চক্র চাইছে, নানা অজুহাতে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে।
প্রসঙ্গত, আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধ না হলে পরদিন থেকেই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা হবে বলে জানিয়েছে আদানি পাওয়ার লিমিটেড। এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি গত ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যানের কাছে পাঠিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান অবিনাশ অনুরাগ।
বিপিডিবি সূত্র জানায়, আদানি পাওয়ারের কাছে এখন পর্যন্ত মোট ৪৯৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে ২৬২ মিলিয়ন ডলার বিপিডিবির নিজস্ব স্বীকৃত অপরিশোধিত বিল। চিঠিতে বলা হয়, ‘একাধিকবার যোগাযোগ ও চিঠিপত্র পাঠানোর পরও পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। তাই আমরা ১১ নভেম্বর থেকে সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হব।’
২০১৭ সালের ৫ নভেম্বর স্বাক্ষরিত পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্টের (পিপিএ) ১৩.২(র) ধারার অধীনে সরবরাহ বন্ধের অধিকার আদানির আছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপিডিবি বলছে, এ চুক্তির বৈধতা নিয়ে বর্তমানে একটি রিট মামলা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আদালতের নির্দেশেই বিষয়টি তদন্তাধীন।
মতভিন্নতার মূল কারণ হিসাবের পদ্ধতি
এর আগে গত বছরের ৩১ আগস্ট বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধে দেরি হওয়ায় আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে অর্ধেক করে দেয়। এরপর গত বছরের ১ নভেম্বর ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়। শীত মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাবে, সে কারণে বাংলাদেশও বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেক কমিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদানি পাওয়ার বিদ্যুৎ সরবরাহ অর্ধেক কমিয়ে দেয়; সেই সঙ্গে মূল্য পরিশোধের বিষয়টি তো ছিলই।
গত ডিসেম্বর মাসে আদানি পাওয়ারের মুখপাত্র বলেছিলেন, বিপিডিবির কাছে তাদের পাওনা প্রায় ৯০ কোটি ডলার; যদিও মো. রেজাউল করিম তখন বলেছিলেন, এই অঙ্ক ৬৫ কোটি ডলার। মতভিন্নতার মূল কারণ হলো, বিদ্যুতের দাম হিসাবের পদ্ধতি। এর আগে বিপিডিবি আদানি পাওয়ারের কাছে কয়েক লাখ ডলারের কর সুবিধা এবং গত বছরের মে পর্যন্ত যে ছাড় ছিল, তা পুনর্বহাল চেয়ে চিঠি দিয়েছিল।
রাজনৈতিক প্রভাবেই একতরফা চুক্তি
বিপিডিবির একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, গত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে আদানি একতরফা সুবিধাজনক শর্তে চুক্তি করেছে। তারা বলেন, ‘এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ কেনার দাম, কয়লার মান, পরিবহন খরচÑ সবদিক থেকেই আদানি বাড়তি সুবিধা নিয়েছে।’ একই অভিমত বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানেরও। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘যদি দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে চুক্তি বাতিলের পথ খোলা আছে। তবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়া সহজ নয়, সব তথ্য যাচাই শেষে দুদকের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
৩০০০ কোটি টাকার বাড়তি বিল
বিপিডিবির সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়, আদানি পাওয়ারের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে বাংলাদেশের খরচ হয় প্রায় ১২ থেকে ১৫ টাকা, যা ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর তুলনায় ৬৩ শতাংশ বেশি। একই ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদনে রামপাল ও পায়রা কেন্দ্রের তুলনায় আদানির খরচ অনেক বেশি। গত অর্থবছরে আদানির কেন্দ্র থেকে কেনা ৮১৬ কোটি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশকে ইউনিটপ্রতি গড়ে ১৫ টাকা ১৪ পয়সা পরিশোধ করতে হয়েছে। শুধু কয়লার দামেই আদানি বাড়তি নিয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। একই মানের কয়লা যেখানে পায়রা কিনেছে ৬৮ ডলারে, সেখানে আদানি নিয়েছে ৯০ ডলারে।
নবায়নযোগ্য শক্তি বাস্তবায়নে অনীহা
এদিকে বিদ্যুৎ নিয়ে চাপে থাকার পরও বাংলাদেশ বিকল্প শক্তির দিকে না গিয়ে এখনও ফসিল জ্বালানিনির্ভর নীতিতে আটকে আছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইতোমধ্যে সরকারি ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল বসানোর নির্দেশ দিয়েছেন। গত ২৬ জুন যমুনায় ‘জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি’ বৈঠকে তিনি বলেন, ‘বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সরকারি ভবনের ছাদ দেওয়া যেতে পারে। তারা বসাবে, রক্ষণাবেক্ষণ করবে, সরকার শুধু ছাদ দেবে।’ তবে বিদ্যুৎ বিভাগ এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে অনাগ্রহী। কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবসায়িক চাপ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্পগুলো ধীরে এগোচ্ছে।
৩৭টি সৌর প্রকল্প বাতিল, বিনিয়োগে উদ্বেগ
ইতোমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। ১৪টি দেশের ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার, যার মোট সক্ষমতা ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ছিল চীনের ৪টি, সিঙ্গাপুরের ৭টি ও ভারতের ১টি প্রকল্প। চীনা বিনিয়োগকারীরা এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চাইনিজ ইনভেস্টর্স ইন বাংলাদেশের সভাপতি হা কুন বলেছেন, ‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে চীনের বড় বিনিয়োগ রয়েছে। প্রকল্প বাতিল করলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা যাবে।’
দক্ষিণ এশিয়ায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে পিছিয়ে বাংলাদেশ
ইন্টারন্যাশনাল রিনিউয়েবল এনার্জি এজেন্সির (আইরিনা) ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে। ভারতে বিদ্যুতের ২৪ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৪০ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। সেখানে বাংলাদেশে তা মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান গতিতে তা অর্জন কঠিন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিদ্যুৎ নিরাপত্তায় বড় হুমকি
এদিকে দেশে চলমান ডলার সংকটের কারণে বিদেশি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর বকেয়া পরিশোধে জটিলতা দেখা দিয়েছে। শুধু আদানিই নয়, অন্যান্য ভারতীয় কোম্পানির পাওনা মিলিয়ে বাংলাদেশকে প্রায় ১০০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। একদিকে আদানির হুমকি, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ বাস্তবায়নে অনাগ্রহ, আবার বকেয়া পরিশোধ সংকটÑ সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি খাত এখন এক জটিল সংকটে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘চুক্তি বাতিল বা সংশোধন এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ নিরাপত্তা আরও বড় হুমকিতে পড়বে।’
আন্তর্জাতিক সালিশে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও আদানি গ্রুপ
এদিকে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ ও ব্যয় হিসাব নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধ মেটাতে বাংলাদেশ ও ভারতের আদানি পাওয়ার আন্তর্জাতিক সালিশ প্রক্রিয়ায় যেতে সম্মত হয়েছে বলে জানা গেছে। আদানি পাওয়ারের এক মুখপাত্রের এক বক্তব্যের সূত্রে জানা গেছে, কিছু ব্যয় ও বিলিং নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। উভয়পক্ষ সালিশ আহ্বানে সম্মত হয়েছে। সংস্থাটি দ্রুত ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক সমাধানে আশাবাদী। তবে আরেক সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় কোম্পানি আদানি সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালতের মাধ্যমে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও এতে এখনও সম্মতি দেয়নি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। পিডিবি সূত্র বলছে, আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তির প্রক্রিয়া তদন্ত করতে গিয়ে চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি নানা অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে। যার প্রমাণ সংগ্রহে আরও মাসখানেক সময় লাগবে। তা ছাড়া এ চুক্তির বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলাও বিচারাধীন। আদালতের আদেশে এর তদন্ত চলছে এবং আদানিকে দেশি-বিদেশি আদালতে জবাবদিহি করার মতো নানা তথ্য-প্রমাণ আদালতে জমা দেওয়া হবে। এ কারণে পিডিবি মধ্যস্থতার জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়ে গত ২ নভেম্বর সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের রেজিস্ট্রারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আলোচনা প্রক্রিয়া এখনও চলছে, প্রয়োজন হলে আমরা আন্তর্জাতিক সালিশের পথে হাঁটব।’