মাদক
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৫ ১২:১৮ পিএম
আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৪৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
দেশের নতুন প্রজন্ম এখন ভয়াবহ সংকটে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কিশোর-তরুণদের বই হাতে ক্লাসে যাওয়ার কথা, খেলাধুলায় মেতে থাকার কথা মাঠে-ময়দানে; অথচ এর বদলে তাদের অনেকেই আসক্ত হয়ে পড়ছে ইয়াবা, আইস, কেটামিন কিংবা নতুন সিন্থেটিক মাদকে। রাজধানী ঢাকা থেকে সীমান্তের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত মাদক বিস্তারের ফলে এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতি বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে মাদক দমনে বিভাগীয় কমিশনারদের একগুচ্ছ নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে; যেসবের মধ্যে সীমান্তে নজরদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযান, গডফাদারদের গ্রেপ্তার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি অন্যতম। সভার কার্যপত্রসূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সীমান্তে ‘রক্তচাপ’ বাড়াচ্ছে কেটামিন
ইয়াবা ও আইসের পর মাদকের জগতে নতুন আতঙ্কের নাম কেটামিন। একসময় এটি শুধু অ্যানেসথেটিক ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখন তরুণদের মধ্যে ভয়াবহ গতিতে এই মাদক গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. রাফিয়া আফরোজ তুলি বলেন, ‘কেটামিন মস্তিষ্কের স্নায়ুকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর প্রভাবে স্মৃতিশক্তি হারানো, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও দীর্ঘমেয়াদে স্নায়বিক অবক্ষয় দেখা দেয়।’ তিনি সতর্ক করেন, ‘যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে ইয়াবার মতো কেটামিনও জনস্বাস্থ্য সংকট সৃষ্টি করবে।’
মাদক প্রবেশের প্রধান রুট এখনও টেকনাফ, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কয়েকটি এলাকা। প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে দেশের অভ্যন্তরে আসছে কোটি টাকার মাদক। বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও পুলিশের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে; কিন্তু একশ্রেণির স্থানীয় প্রভাবশালী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বদলে পাচারকারীদের সঙ্গে যোগসাজশ গড়ে তোলায় তাদের দমন সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যাপারে একজন সীমান্ত কর্মকর্তা অত্যন্ত অসহায় কণ্ঠে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পাহারা যতই দিই, ভেতরের সহযোগী চক্র না ভাঙা গেলে সীমান্তে সব সময়ই ফাঁক থেকে যাবে।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘নীরব মহামারি’
মাদক এখন শুধু রাতের গলিপথে নয়, পৌঁছে গেছে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে ছোট ছোট মাদকচক্র সক্রিয় রয়েছে। এই বাস্তবতায় সরকার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কমিটি সক্রিয় করতে ও নিয়মিত অভিযান চালাতে নির্দেশ দিয়েছে। কারণ শিক্ষার্থী-তরুণদের মানসিক দুর্বলতা ও কৌতূহলকে কাজে লাগিয়ে সহজেই অর্থপ্রাপ্তির হীন উদ্দেশ্যে মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের নেশাগ্রস্ত করে তুলছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ রাখতে হলে শিক্ষক-অভিভাবক-প্রশাসন সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাড়াতে হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ‘মূলত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করেই চক্রগুলো কাজ করে। কারণ এই বয়সে তাদের অনেকের মানসিক দুর্বলতা থাকে, বয়ঃসন্ধিকালীন সংকট থাকে। তা ছাড়া সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে অনেক সময় তাদের মধ্যে হতাশাও কাজ করে। মাদক ব্যবসায়ীরা এসব সমস্যাকে কাজে লাগায়।’ শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনের যৌথ তৎপরতা ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ রাখা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজধানীর এক কলেজশিক্ষক বলেন, ‘তাদের মধ্যে যদি প্রতিরোধের উপকরণ না পৌঁছানো যায়, বিকল্প আশাবাদের জায়গা তৈরি না করা যায়, তাহলে শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে তরুণদের মন থেকে মাদক তাড়ানো যাবে না। তা ছাড়া শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, পরিবারে বিকল্প আনন্দও তৈরি করতে হবে। সুস্থ রাজনৈতিক চর্চাও নিশ্চিত করতে হবে।’
বিচারহীনতার ফাঁদে মাদক মামলা
২০২০ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মাদক সংক্রান্ত ১ লাখ ২২ হাজার ৪২২টি মামলা হয়েছে। কিন্তু সমাধান হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ৩৭৬টির। যা কিনা মোট মামলার ১১ শতাংশেরও কম। তার মধ্যে ৫৬ শতাংশ আসামি খালাস পেয়েছেন, মূলত সাক্ষীর অনুপস্থিতি ও তদন্তের ঘাটতির কারণে। বিচার কার্যক্রমে বড় বাধা হলো সাক্ষীর অভাব। অনেক মামলায় সময়মতো সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় বিচার স্থগিত হয়। সম্পূর্ণ বা সঠিক তদন্ত না হওয়ায় মূল মাদক সিন্ডিকেট ও গডফাদারদের ধরাই যাচ্ছে না। তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সাক্ষীরা আদালতে হাজির না হলে বিচারকের পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না মামলায় অগ্রগতি আনা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘তদন্তকারী কর্মকর্তা সময়মতো হাজির না হলে বিচারক কিছুই করতে পারেন না। ফলে আসামিরা জামিন পেয়ে আবারও অপতৎপরতা শুরু করে। বিচার প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতায় নিচুতলার দালাল ও পরিবহনকারীই কেবল ধরা পড়ছে; কিন্তু গডফাদাররা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভ্যন্তরীণ রেকর্ড অনুযায়ী দেশে ১৪১ থেকে ২৯২ জন গডফাদার শনাক্ত করা গেলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার অগ্রসর হয়নি।’
মাদকবিরোধী আন্দোলনের সংগঠক সেলিম মিজান বলেন, ‘যতদিন রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকবে, ততদিন গডফাদারদের ধরা সম্ভব হবে না। অভিযান নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছাই আসল অস্ত্র।’
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন, নীতিমালা ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সবই রয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নে রয়েছে ভয়াবহ ঘাটতি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘নীতিগতভাবে বাংলাদেশে মাদকবিরোধী লড়াই নতুন কিছু নয়। কিন্তু সমন্বয়ের অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব ও জবাবদিহির ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।’
এদিকে মাঠপর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার করা যতটা সহজ, বিচার সম্পন্ন করা তার চেয়ে কঠিন। এক জেলা পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন অভিযান চালাই। কিন্তু আদালতে মামলা ঝুলে যায়। জামিনে বের হয়ে কারবারিরা আবার একই কাজ শুরু করে।’
বরিশালের এক এনজিওকর্মীর অভিজ্ঞতা আরও কষ্টদায়ক। তিনি বলেন, মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন করতে গেলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ আসে। তারা বলেন, অতি বাড়াবাড়ি করো না। ফলে কাজের গতি কমে যায়।’
বাস্তবসম্মত কর্মসূচি নিতে হবে
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণ কেবল পুলিশের দায়িত্ব নয় এটি সামাজিক, ধর্মীয় ও পারিবারিক দায়ও বটে। মাদকবিরোধী সংগঠন আধূনিকের সভাপতি সেলিম মিজান বলেন, ‘শুধু বক্তৃতা নয়, মসজিদ, মন্দির, গির্জা সব জায়গা থেকেই বাস্তবসম্মত কর্মসূচি নিতে হবে। ইমামরা যদি জুমার খুতবায় মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে নিয়মিত বলেন, প্রভাব পড়বে।’
কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ফিল্ম ও টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জহির বিশ্বাস মনে করেন, ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধে জিততে হলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার যুদ্ধ নয়, এটি সমাজের আত্মার যুদ্ধ।’ তিনি বলেন, ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধ জেতা সম্ভব, যদি রাষ্ট্র ও সমাজ একই সুরে কথা বলে। নইলে সীমান্ত থেকে রাজধানী পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলতেই থাকবে, কিন্তু বিজয় আসবে না।’
পুনর্বাসন ছাড়া মুক্তি অসম্ভব
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা একশোরও কম, যেখানে সম্ভাব্য ব্যবহারকারীর সংখ্যা কয়েক লাখ। ফলে অনেকেই চিকিৎসা অব্যাহত রাখতে পারে না এবং আবারও মাদকে জড়িয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে ডা. রাফিয়া আফরোজ তুলি বলেন, ‘ব্যবহারকারীকে কেবল গ্রেপ্তার করলেই হবে না। তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। নইলে জেল থেকে বের হয়েই তারা আগের চক্রে ফিরে যাবে।’
সমন্বিত প্রয়াস ছাড়া সাফল্য আসবে না
মাদকবিরোধী কার্যক্রমে অন্তত ১৫টি মন্ত্রণালয় ও সংস্থা পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, সুরক্ষা সেবা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, ধর্ম মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয় সংযুক্ত। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের অভাবই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, গডফাদারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর জন্য দরকার আন্তঃমন্ত্রণালয় সহযোগিতা, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই সময় আইন প্রয়োগ, সামাজিক জাগরণ ও পুনর্বাসনের পথকে সমন্বিত করে মাদক নির্মূলের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করার।