প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২২ ২১:৫৯ পিএম
আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২২ ২২:১০ পিএম
ফাইল ফটো
বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠালের বারোমাসি জাত বারি কাঁঠাল-৩-এর পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্সিং শেষে এর জীবনরহস্য উন্মোচনের দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা৷ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, কানাডার গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর ফুড সিকিউরিটি, ন্যাশনাল রিচার্স কাউন্সিল, কানাডা এবং ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এই গবেষণা চালান।
আইজিবিইর অধ্যাপক ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির ফেলো তোফাজ্জল ইসলাম গবেষক দলের নেতৃত্ব দেন৷ তিনি শনিবার (১৭ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তাদের এই গবষেণা প্রবন্ধটি বিজ্ঞান সাময়িকি ফ্রন্টিয়ারস ইন প্লান্ট সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে।
কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। এটি পরপরাগী বর্ষা মৌসুমের যৌগিক ফল। কাঁঠাল অতি পচনশীল হওয়ায় উৎপাদিত ফলের এক বিরাট অংশ নষ্ট হয়। জাতের মধ্যে বিশাল বৈচিত্র্য থাকায় এবং শুধু এক মৌসুমের ফল হওয়ায় দেশে এর কোনো বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু হয়নি।
অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, কাঁঠাল অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং পৃথিবীর সবচাইতে বড় ফল। বারোমাসি কাঁঠালের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মোচিত হওয়ায় জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে নানা স্বাদের এবং বৈশিষ্ট্যের নতুন কাঁঠালের জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে, যা দেশে কাঁঠালের বানিজ্যিক চাষাবাদ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশে সহায়ক হবে।
তিনি জানান, বিজ্ঞানীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলুমিনা সিকোয়েন্সিং প্লাটফর্ম ব্যবহার করে কাঁঠালের জিনোম সিকুয়েন্স সম্পন্ন করেছেন। কাঁঠালের জিনোম আকার ১.০৪ গিগাবেজ পেয়ারস। বায়োইনফরমেটিকস বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা কাঁঠালের জিনোমে ফলের বৈশিষ্ট্য এবং বারোমাস ফল উৎপাদনকারী জিন ও ডিএনএ সিকুয়েন্সের স্বাতন্ত্র্য খুঁজে পেয়েছেন, যা কাঁঠালের জিন প্রকৌশল বা মলিকুলার ব্রিডিংয়ে সহায়ক হবে।
গবেষক দলের প্রধান বিজ্ঞানী ড. তোফাজ্জল ইসলাম জানান, গবেষক দল পৃথিবীতে প্রথম বারোমাসি কাঁঠালের একটি জাত বারি কাঁঠাল-৩-এর পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকুয়েন্স সম্পন্ন করেছেন৷ প্রাকৃতিকভাবে চট্টগ্রামের রামগরের পাহাড়ে জন্মানো একটি কাঁঠালকে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে জাত হিসেবে ‘বারি কাঁঠাল-৩’ নামে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এটি সেপ্টেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত ফল দেয়, যার ফলন মৌসুমি কাঁঠালের চেয়ে চার গুণ বেশি। স্বাদ ও পুষ্টিমানও খুব ভালো। গবেষণায় কাঁঠাল ফলের মধ্যে বিশাল বৈচিত্র্য এবং বারোমাস ফল প্রদানের সাথে সম্পর্কিত জিনসমূহকে শনাক্ত করা হয়েছে।
তোফাজ্জল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গবেষণার ফলাফল জীবপ্রযুক্তির মাধ্যমে বারোমাসি কাঁঠালের নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাত উদ্ভাবনে সহায়ক হবে। কাঁঠালের বানিজ্যিক চাষের জন্য বারোমাসি এবং ফলের নানা বৈশিষ্ট্যের জাত প্রয়োজন, যা কাঁঠালভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশের পূর্বশর্ত। কাঁঠালের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকুয়েন্স ডাটা যা আমরা জিনব্যাংকে জমা দিয়েছি, তা ভবিষ্যৎ জীবপ্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণায় বিশেষভাবে কাজে লাগবে।’
কাঁঠালের জীবনরহস্য উন্মোচনকারী বিজ্ঞানীদের অন্যতম ড. অ্যান্ড্রু শার্প বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল নিয়ে খুব একটা মলিকুলার পর্যায়ে গবেষণা হয়নি। এটি পুষ্টি এবং খাদ্য নিরাপত্তার জন্য খুবই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল। এদেশে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো একটি বারোমাসি জাতের কাঁঠালের জিনোম সিকুয়েন্স এবং সম্ভাব্য জিনের শনাক্তকরণ কাঁঠালের গবেষণার এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। উন্নত স্বাদ এবং উচ্চ পুষ্টিমানবিশিষ্ট কাঁঠালের জাত উদ্ভাবনের গবেষণায় তা কাজে লাগবে। দেশে কাঁঠালভিত্তিক নতুন শিল্পের প্রসারের সম্ভাবনা তৈরি হলো। যেহেতু বাংলাদেশের কাঁঠালের পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকুয়েন্স বিশ্ব জিনব্যাংকে প্রকাশিত হয়েছে, এখন তা পৃথিবীর সকল আগ্রহী বিজ্ঞানী গবেষণায় ব্যবহার করতে পারবেন। কাঁঠালের উৎপত্তিস্থল নির্ণয় এবং কিভাবে কাঁঠাল বন্য অবস্থা থেকে মানুষের খাবার উপযোগী হলো তাও জানা যাবে।
কাঁঠালের জীবনরহস্য উন্মোচন প্রকল্পটির অর্থায়ন করে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রাণালয়। ডেটা বিশ্লেষণে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে স্থাপিত বিডিরেন সার্ভার ব্যবহার করা হয়েছে।
ইতোপূর্বে ড. তোফাজ্জল ইসলাম দেশে গমের মহামারি ব্লাস্ট রোগ সৃষ্টিকারী ছত্রাকের জিনোম বিশ্লেষণ করে রোগটির কৌলিক বৈশিষ্ট এবং উৎপত্তিস্থল নিরূপণে গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। তার আবিষ্কারের ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হয়। তিনি অগ্রসরমান প্রযুক্তি ব্যবহারে মাত্র ৩০ মিনিটে গমের ব্লাস্ট রোগ শনাক্তকরণের জীবপ্রযুক্তিও উদ্ভাবন করেন।