ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৪৭ এএম
প্রশাসনের শীর্ষ পদ চুক্তিভিত্তিক মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিয়োগ নিয়ে ‘নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়েছে প্রশাসনে। বিসিএস নবম ব্যাচের পদোন্নতি পাওয়া সিনিয়র সচিব সামসুল আলম এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে এমন অভিযোগ করায় সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসনে তুমুল বিতর্ক ও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেছেন, বর্তমান চুক্তিতে থাকা বিসিএস ৮২ ব্যাচের মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ, চুক্তিভিত্তিকভাবে মাত্র দুই মাসের জন্য যার নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের বিশেষ অনুকূল্য নিয়ে তিনি আরও অতিরিক্ত দশ মাস পদে রয়েছেন। বিষয়টি ঘিরে শুধু তার নয়, সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসনের ভেতরে তৈরি হয়েছে তীব্র অস্থিরতা ও ক্ষোভ।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিগত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে থাকা কিছু সংখ্যক নিয়মিত সচিবকে অবসর ও চুক্তিভিত্তিক সচিবের নিয়োগ বাতিল করা হয়। তবে বিগত সরকারের নিয়োগকৃত মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেনকে স্বপদে রাখা হয়। তার চাকরির মেয়াদ কয়েক মাস থাকায় সরকার বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে ওই পদে রেখেছিল। মেয়াদ শেষ হলে গত বছর ২০২৪ সালের অক্টোবরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিয়োগের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষপর্যায় ও সরকারের এক উপদেষ্টার সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা বৈঠক হয়। সিদ্ধান্ত হয়, কয়েক বছর আগে অবসরে যাওয়া বিসিএস ৮২ ব্যাচের প্রথম হওয়া ড. শেখ আব্দুর রশিদকে দুই মাসের জন্য চুক্তিভিত্তিক মন্ত্রিপরিষদ সচিব নিয়োগ দেওয়া হবে। ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর তাকে দুই বছরের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান তিনি। তার আগে ১৮ আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে চুক্তিতে সিনিয়র সচিব হিসেবে যোগদান করেন। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় দুদক চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব দুদকে যোগ দেবেন। আর সেই সময়ে বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক কারণে পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়া প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সামসুল আলম মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব নেবেন। দীর্ঘ ১৬ বছর শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত থাকায় তার নিয়োগের এই প্রক্রিয়ায় সব পক্ষের সম্মতি ছিল।
প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনও জনপ্রশাসনে ফাইল বন্দি
সূত্র জানায়, ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার ধারাবাহিকতায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর এ-সংক্রান্ত একটি সারসংক্ষেপ অনুমোদন করেন। সেখানে নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে সামসুল আলমের নাম অনুমোদিত হয়। কিন্তু সেই অনুমোদিত ফাইলটি এখনও প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সচিব সামসুল আলম ফেসবুকে বলেন, অবসরপ্রাপ্ত প্রভাবশালী একদল কর্মকর্তা সচিবালয়ে ফাইলটি একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রেখেছেন। এমনকি ওই সিদ্ধান্ত ঠেকাতে তিনজন সাবেক আমলা সেনাপ্রধানের কাছেও গিয়েছিলেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধান উপদেষ্টার স্বাক্ষরিত ফাইলটি কবে প্রকাশ পাবে এবং তিনি নিজে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কী অবস্থান নেবেন, এটিই এখন প্রশ্ন। কারণ মন্ত্রিপরিষদ সচিববের ইস্যুটি এখন শুধু একজন কর্মকর্তার পদ-পদবির প্রশ্ন নয়; এটি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ন্যায্যতা এবং রাজনৈতিক নৈতিকতার পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে ‘এই অসন্তোষ বিস্ফোরকে রূপ নিতে পারে’।
সদ্য অবসরে যাওয়া সিনিয়র সচিব সামসুল আলম বলেছেন, যারা ১৬ বছরব্যাপী স্বৈরাচার শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে কিংবা ২০২৪ সালের ‘জুলাই আন্দোলন’-এর প্রবর্তক ছিলেন, তাদের কেউই এখন গুরুত্বপূর্ণ পদে নেই। অথচ আন্দোলনে সম্পৃক্ত না থাকা ব্যক্তিরাই আজ প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলো দখল করে আছেন। তার মতে, জনপ্রশাসন এখন একদল আমলার হাতে জিম্মি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার ন্যায়বিচার, মেধা ও যোগ্যতাকে পদে পদে অপমান করছেন।
এই সাবেক সিনিয়র সচিব তার ফেসবুকে পরিকল্পনা কমিশনে সদস্য পদে বদলি হয়ে যাওয়া সাবেক জনপ্রশাসন সচিব মোখলেসুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গত এক বছরের বেশি তিনি ‘দুর্নীতি ও অপেশাদারত্বের চূড়ান্ত অধোপাতে’ নিয়ে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) এখন যোগ্য কর্মকর্তাদের জন্য নয়, বরং দুর্নীতিবাজদের। মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তা হলেও তাদের ভাগ্যে পদোন্নতি জুটছে না। ব্যক্তি সখ্য ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পদোন্নতি ও সচিব হওয়ার অভিযোগ এখন প্রশাসনের ওপেন সিক্রেট।
সামাজিক মাধ্যমে তিনি আরও মন্তব্য করেন, বর্তমানে প্রশাসনে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমলের দুই ডজন সচিব বহাল আছেন। বিগত সরকারের মতো একই অন্যায় যদি নতুন সরকারের অধীনেও চলতে থাকে, তবে পরিবর্তনের অর্থ কী?
এ প্রসঙ্গে আরেক বঞ্চিত বিসিএস বিশেষ ব্যাচের সাবেক কর্মকর্তা ড আব্দুস সবুর ক্ষোভের সাথে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অনেক সময় পার হয়ে গেছে। জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে বসে একাধিক কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।’ তিনি বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। জনগণের টাকায় গড়া এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতার দাপটে জিম্মি করলে চলবে না। একদিন কড়ায় গন্ডায় সব হিসেবে সাধারণ কর্মকর্তাদের কাছে দিয়ে যেতে বাধ্য থাকবেন।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, সামাজিক মাধ্যমে সদ্য অবসরে যাওয়া একজন সিনিয়র সচিবের মন্তব্যে সরকারের অভ্যন্তরে আলোচনা চলছে। এমন বিস্ফোরক মন্তব্যের পর প্রশাসনের মধ্যে ‘গভীর নীরব ক্ষোভ’ বিরাজ করছে। প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলছেন না, কিন্তু সবাই জানেন যে, ক্ষমতার ভারসাম্য এখন মারাত্মকভাবে একপেশে হয়ে পড়েছে।
সাবেক আমলা ড. আব্দুস সবুর বলেন, বিষয়টি এখন কেবল ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি প্রশাসনের নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন। যদি যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না হয়, তবে প্রশাসন রাজনৈতিকভাবে অচল হয়ে পড়বে।