তানভীর হাসান ও আরমান হেকিম
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ১২:০৯ পিএম
চরম যানবাহন সংকটে ভুগছে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। এ কারণে তাদের নিয়মিত অভিযান-টহলসহ নানা কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, র্যাবের যানবাহনের ৬৪ শতাংশই অতি পুরাতন এবং ব্যবহারের অনুপযোগী। এসব যানবাহন রাস্তায় বের হলেই বিকল হয়ে যাচ্ছে। নষ্ট যানবাহন মেরামতের জন্য ওয়ার্কশপে নেওয়া হচ্ছে। এতে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বাড়ছে। এরই মধ্যে ১৩ শতাংশ যানবাহন অকেজো ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে যানবাহনের অভাবে এখন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে অপরাধ দমনে বড় ভূমিকা পালনকারী পুলিশের এই ইউনিট।
এদিকে নির্বাচনের আগে র্যাবের এমন যানবাহন সংকট কাটাতে ৫৪৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। র্যাব ফোর্সেসের আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রমতে, প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল এক হাজার ৩৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকাল ছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি বাংলাদেশ পুলিশ। তিন দফায় প্রকল্পের মেয়াদ পাঁচ বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। বর্তমানে প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এই প্রস্তাবে প্রকল্পের ব্যয় ২০৬ কোটি টাকা কমানো হয়েছে।
প্রকল্পটিতে ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ৮৬ কোটি টাকা পর্যন্ত। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোনো বরাদ্দ ছিল না। নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫৪৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ২৮৪ কোটি টাকা। আর বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ২৮ শতাংশ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে র্যাবের আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ জাহিদুল করিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমান র্যাব গঠনের সময় মোটরসাইকেলসহ ২৬৯৪টি যানবাহন দেওয়ার কথা থাকলেও সে সময় ২০৭০টি যানবাহন দেওয়া হয়। অর্থাৎ শুরু থেকেই যানবাহনের ঘাটতি ছিল ৬২৪টি। বর্তমান ২০৭০টি যানবাহনের মধ্যে পুরো অকেজো অবস্থায় আছে ৩৪১টি, মেয়াদ শেষ হয়েছে ৯৩৭টি ও আগুনে পুড়ে গেছে ৭টি যানবাহন। এসব যানবাহন রাস্তায় বের হলেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও একই যানবাহন অধিক ব্যবহারের কারণে জ্বালানি খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন অবস্থায় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নতুন টাকা ছাড় করা হয়েছে। ওই টাকা দিয়ে নির্বাচনের আগেই যানবাহনের ঘাটতি পূরণ করা হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান যানবাহনের কারণে র্যাবের টহল, প্যাট্রল ও আভিযানিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই দ্রুতই গাড়ি কেনার তোড়জোড় চলছে।
জানা যায়, র্যাবের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন; অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক জাতীয় অন্যান্য বস্তু উদ্ধার এবং অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অন্যান্য বাহিনীকে সহায়তা, সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সরকার নির্দেশিত যেকোনো অপরাধের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা ও সরকার নির্দেশিত যেকোনো জাতীয় দায়িত্ব পালন করা। এর বাইরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নজরদারিতে রাখা এবং তাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও র্যাবের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, র্যাব পুলিশের একটি বিশেষায়িত ফোর্স হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের কার্যক্রমে বিশেষায়িত অর্জন ক্ষীণ হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের শেষ কয়েক বছরে শীর্ষ সন্ত্রাসী দমন, অবৈধ অস্ত্র-মাদক উদ্ধারে তাদের ভূমিকা যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়নি। এরপর গত বছরের ৫ আগস্টের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে তা নিয়ন্ত্রণে র্যাবের নিষ্ক্রিয়তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ঢাকাসহ সারা দেশে একের পর এক মব, হত্যা, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটলেও তা দমনে মাঠে র্যাবকে কার্যকর ভূমিকায় দেখা যায়নি বলেই মনে করছেন অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে র্যাবকে অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে কাজে লাগাবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। এ বিষয়ে র্যাবের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অপরাধী শনাক্তের পরও অনেক সময় যানবাহনের অভাবে তাৎক্ষণিক অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে অপরাধীরা মুহূর্তেই সটকে পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে ২০১৮ সাল থেকে বারবার সরকারকে জানানোর পরও কোনো কাজে আসেনি। এমন পরিস্থিতিতে র্যাবকে সম্প্রতি ৫৪৩ কোটি টাকা অর্থছাড় করেছে মন্ত্রণালয়। এর আগে র্যাব থেকে ‘র্যাব ফোর্সেসের আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি’ নামের একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়।
সেখানে বলা হয়, র্যাব ফোর্সেসের আভিযানিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য যানবাহনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। র্যাব ফোর্সেস গঠনের শুরু থেকে মাদক, সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবিরোধী সব কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সদা তৎপর। বর্তমান ১৯৫৯টি যানবাহনের প্রকৃত ঘাটতি রয়েছে। ফলে আভিযানিক কর্মকাণ্ডে নিরবচ্ছিন্নভাবে যানবাহন ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না। র্যাব ফোর্সেসের আভিযানিক কাজে প্যাট্রল কার, প্যাট্রল পিকআপ, মাইক্রোবাস (এসি) এবং মোটরসাইকেল (১৫০ সিসি) বেশি ব্যবহৃত হয়। যেগুলো যানবাহন আছে সেগুলো নিয়মিত বিভিন্ন আভিযানিক কর্মকাণ্ডে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে এবং রিকভারির মাধ্যমে এসব গাড়ি ওয়ার্কশপে নিতে হয়। যানবাহনের এই সমস্যা সমাধান হলে স্বভাবতই র্যাবের বর্তমান অর্জন বহু গুণে বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক সর্বক্ষেত্রেই দৃশ্যমান প্রভাব ফেলবে। র্যাবের এমন আবেদনের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৪ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই ১০০টি প্যাট্রল পিকআপ, ৬০টি এসি মাইক্রোবাস ও ৩টি জিপ সরাসরি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়।
জানা গেছে, সদর দপ্তর ছাড়াও র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ও আশপাশের এলাকা দেখভাল করে র্যাব-১, ২, ৩, ৪ ও ১০। বাকি ব্যাটালিয়নগুলো বিভাগ ও জেলা শহরে নিয়োজিত। এই ব্যাটালিয়নগুলোর মধ্যে আবার বিভিন্ন কোম্পানিতে বিভক্ত। প্রতিটি কোম্পানির রয়েছে আলাদা আলাদা আভিযানিক ও টহল টিম। এ কারণে তাদের যানবাহনের প্রয়োজন বেশি। বর্তমান পুলিশের বিশেষায়িত এই ইউনিটে প্রায় ১২ হাজার সদস্য কর্মরত রয়েছেন।