× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জুলাই সনদ

রয়ে গেল অনৈক্য ও অনেক প্রশ্ন

দীপক দেব

প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৪৯ এএম

রয়ে গেল অনৈক্য ও অনেক প্রশ্ন

জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রশ্নে ভিন্নমত পোষণ করায় সনদে স্বাক্ষর করেনি জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) চারটি বামদল। এই সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়নে নিশ্চয়তা পাওয়ার পরেই সনদে স্বাক্ষর করার কথা জানিয়েছে এনসিপি। এ অবস্থায় গতকাল মঙ্গলবার ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশের চূড়ান্ত খসড়া হস্তান্তর করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে। একই সঙ্গে এই সুপারিশমালা পাঠানো হয়েছে দলগুলোর কাছেও। ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর মাধ্যমে গণভোট আহ্বান করে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। তবে যে ৪৮টি বিষয় তফসিলে রেখে প্যাকেজ আকারে গণভোট হবে, তাতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর বিষয়ে উল্লেখ থাকবে না বলে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ভোটের সংখ্যানুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে, এমন কথাও জানানো হয়েছে। 

তবে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশে গণভোটের সুনির্দিষ্ট সময়, নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে উল্লেখ না থাকা এবং উচ্চকক্ষ গঠন বিষয়ে বিএনপির মতামত উপেক্ষা করা এসব বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির পক্ষ থেকে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ নিয়ে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সনদে নেই এমন বিষয়ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বদলে জাতীয় অনৈক্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এ অবস্থায় অনেকেই মনে করছেন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াতে গণভোট ও নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান না রাখার কারণে দলগুলোর মধ্যকার অনৈক্য ও অনেক প্রশ্ন দূর করা সম্ভব হয়নি। তাই গণভোট নিয়ে সরকারকে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কেউ কেউ। 

গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ হস্তান্তর করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। পরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরেন ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ। জুলাই জাতীয় সনদকে আইনি ভিত্তি দিয়ে তিন ভাগে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে এতে। প্রথমে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি, আদেশের প্রশ্নে গণভোট আয়োজন এবং সবশেষ আগামী জাতীয় সংসদকে দ্বৈত ভূমিকার (সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও জাতীয় সংসদ) ক্ষমতা দিয়ে প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে এতে। সংলাপে ঐকমত্য হওয়া সনদের ৮৫টি প্রস্তাবের মধ্যে ৯টি নির্বাহী আদেশে, ২৮টি অধ্যাদেশে এবং সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুই ভাগের বিষয়গুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর শেষ ভাগের প্রস্তাবগুলো দুটো বিকল্প রাখার এবং গণভোটে জনগণের বৈধতা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন।

গণভোট নিয়ে আগের অবস্থানেই বিএনপি-জামায়াত

বারবার চেষ্টা করেও গণভোট প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে এক জায়গায় আনতে না পারায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সুপারিশে গণভোটের সুনির্দিষ্ট কোনো সময়ের কথা উল্লেখ করা হয়নি বলে কমিশনের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন। তারা বিষয়টি সরকারের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন বা আগে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। 

এ বিষয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এটার (গণভোট আগে হবে) সঙ্গে বিএনপি একমত নয়। আমরা পরিষ্কারভাবে এটা বলে দিয়েছি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে পুরো আলোচনায় বিএনপির অবস্থান ছিল যে, গণভোট আর নির্বাচন একই দিনে হবে, দুইটা আলাদা ব্যালটের মাধ্যমে। এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।’ তিনি বলেন, ‘নতুন করে এই বিষয়কে সামনে আনার কোনো সুযোগ নাই। সেটা যেই বলুক, যারাই প্রতিবেদন দিক, সেটা তাদের সমস্যা। এটা বিএনপির সমস্যা না। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। এই বিষয়ে (গণভোট আগে) বিএনপি ঐকমত্য পোষণ করে না, সেহেতু সেদিকে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নাই।’ 

অন্যদিকে এইদিন রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচন কমিশনকে ১৮ দফা সুপারিশ দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এসব সুপারিশে জাতীয় নির্বাচনের আগে আগামী নভেম্বর মাসে গণভোট চেয়েছে দলটি। পাশাপাশি রাজধানীতে অন্য এক অনুষ্ঠানে সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার। রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারিসহ জাতীয় নির্বাচনের আগেই গণভোটের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেছেন, ‘একই দিনে গণভোট যারা করতে চাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্য হলো জুলাই সনদকে অকার্যকর করা।’

নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে নাখোশ বিএনপি

গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার পরিষদকে ‘কন্সটিটুয়েন্ট পাওয়ার’ (গাঠনিক ক্ষমতা) দেওয়া হলেও তারা নিজেদের মতো করে সংস্কার করতে পারবে না বলে স্পষ্ট করেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। কেন পারবে নাÑ এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কন্সটিটুয়েন্ট পাওয়ার দেওয়া হচ্ছে এই বিবেচনা থেকে যে মৌলিক সংস্কার করা হবে। তবে তাদের গাইড করবে জুলাই জাতীয় সনদ। কন্সটিটুয়েন্ট পাওয়ার মানে এই নয় যে যা খুশি তাই লিখতে পারা যাবে।’ সংবিধান সংস্কার পরিষদে যাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে, সংস্কারের যেসব প্রস্তাবে তাদের আপত্তি বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে, তারা তাদের মতো করে সংস্কার করতে পারবে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি বলেন, ‘গণভোটের প্রস্তাবটি এসেছে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার আলোচনায়, যেখানে প্রস্তাব ছিল সবকিছুই জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার। জনগণ যদি রায় দেয়, তাহলে রাজনৈতিক দল তার ভূমিকা নির্ধারণ করবে। কমিশন মনে করে, কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের রায় পাওয়া জিনিসকে কেবল নিজস্ব দলীয় অবস্থান থেকে বিবেচনা করবেন না।’ 

কমিশনের এমন বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, এ বক্তব্যের মাধ্যমে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বদলে জাতীয় অনৈক্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে। কার্যক্রম শেষ করায় ঐকমত্য কমিশনকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘যে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষর করেছে, সেই স্বাক্ষরিত সনদবহির্ভূত অনেক পরামর্শ বা সুপারিশ, সনদ বাস্তবায়নের আদেশের খসড়ায় যুক্ত করা হয়েছে।’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ৮৪টি দফা সম্ভবত, সেখানে বিভিন্ন দফায় আমাদের এবং বিভিন্ন দলের কিছু ভিন্নমত আছে, নোট অব ডিসেন্ট আছে। পরিষ্কারভাবে সেখানে উল্লেখ করা আছে যে এই সমস্ত নোট অব ডিসেন্টের বিষয়গুলো রাজনৈতিক দলসমূহ যারা দিয়েছে, তারা যদি নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখপূর্বক ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হয়, তাহলে তারা সেভাবে সেটা বাস্তবায়ন করতে পারবে। সেটা এই প্রিন্টেড জাতীয় জুলাই সনদের যে বই এখানে আপনারা পাবেন, সমস্ত দফায় দফায়, যেখানে যেখানে ডিসেন্ট আছে সেখানে আছে। অথচ বিস্ময়করভাবে আজকে যে সংযুক্তিগুলো দেওয়া হলো সুপারিশমালার সাথে, সেখানে এই নোট অব ডিসেন্টের কোনো উল্লেখ নাই।’

কিছু জায়গায় অস্পষ্টতা দেখছে এনসিপি

জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করে আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়নের নিশ্চয়তার শর্ত জুড়ে দিয়েছে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতাদের হাতে গড়ে ওঠা দল জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি। কমিশনের সুপারিশের পর সরকারের পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে দলটি। তবে কমিশনের এই পদক্ষেপে সাধুবাদ জানিয়েছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি বলেন, ‘আমরা কমিশনকে সাধুবাদ জানাই, তারা কাজটা কমপ্লিট (সম্পন্ন) করেছে। যদি আমরা সেদিন স্বাক্ষর করে ফেলতাম, তাহলে কাজটা হতো কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আমাদের স্বাক্ষর না করার কারণে তারা ব্যাপারটাকে গুরুত্বসহকারে নিয়েছে এবং একটা সুপারিশ সরকারের কাছে দিয়েছে। এটাকে আমরা সাধুবাদ জানাই।’ চূড়ান্ত সুপারিশে ভাষাগত অস্পষ্টতা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু ভাষাগত অস্পষ্টতা আছে, যেগুলোর ব্যাপারে আমরা আরও ক্ল্যারিটি (স্পষ্টতা) প্রত্যাশা করি। সেগুলো হয়তো আমরা সরকারের কাছে তুলে ধরব।’

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়ায় আদেশ কে দেবেন তা নিয়ে অষ্পষ্টতা রয়েছে উল্লেখ করে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব ইউনুছ আহমেদ বলেছেন, এতে আগামীর রাজনীতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বল সরকারের কোর্টে, বলছেন দিলারা চৌধুরী

গণভোট প্রশ্নে বড় দুই দলের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে বলে মনে করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গণভোট ছাড়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব না। আর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে নির্বাচনও ঝুলে যেতে পারে। এ অবস্থায় দলগুলোর অনৈক্যের মধ্যে সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।’

বল এখন সরকারের কোর্টে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এ অবস্থায় সরকারের উচিত একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা