ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:২৩ পিএম
আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৩১ পিএম
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘দলনিরপেক্ষ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে’ মাঠ প্রশাসন পুনর্গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতারাও এ দাবি জানিয়েছেন। এসব রাজনৈতিক দলের প্রত্যেকেরই অভিযোগ, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে এখনও এমন অনেক সচিব ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ, তারা থাকলে মাঠ প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে না।
এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান উপদেষ্টা ও জনপ্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মুহাম্মদ ইউনূস দলগুলোর প্রতিনিধিদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, নির্বাচনের আগে প্রশাসনের যাবতীয় রদবদল সরাসরি তার তত্ত্বাবধানে হবে। জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হবে। দায়িত্বে নিরপেক্ষ থেকে যেখানে যিনি শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সক্ষম, সেই ব্যক্তিকেই তারা বেছে নেবেন। প্রশাসনে বদলি বা পদায়নে কোনো পক্ষপাত যেন না ঘটে, সে বিষয়ে তিনি নিজেই তদারকি করবেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আসতে পারে। এরই অংশ হিসেবে প্রশাসনকে দল নিরপেক্ষ করতে তিনি জনপ্রশাসন সচিবকে নির্দেশ দিয়েছেন। ভূমি ও খাদ্য উপদেষ্টা এবং সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদারকে এসব বিষয় দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
পক্ষপাত নিয়ে উপদেষ্টারাও সমালোচনায় : অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সম্প্রতি একটি দলের অনুকূলে কাজ করার অভিযোগ তুলেছে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতারা। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি এক বৈঠকের পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘প্রশাসনকে জনগণের কাছে পুরোপুরি নিরপেক্ষ করে তৈরি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কিছু বদলি ও নিয়োগে ‘দলীয় প্রভাব’ কাজে লাগানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনেও একই রকম পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ এখনও যারা জেলা প্রশাসনে আছেন, তারা ফ্যাসিস্ট সরকারের স্বার্থ পূরণ করছেন। পুলিশের ক্ষেত্রেও একই কথা বলেছি। যারা আওয়ামী আমলে সুবিধাভোগী ছিলেন, তাদের রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’
অন্যদিকে, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের অভিযোগ করেন, ‘ইলেকশন কমিশনের, সচিবালয়ের, পুলিশ প্রশাসনে ৭০-৮০ শতাংশ কর্মকর্তা একটি দলের আনুগত্য করছেন। যারা প্রসিকিউটর (পিপি) হয়েছেন, তাদের ৮০ শতাংশ একটি বিশেষ দলের। ফলে সারা দেশের প্রশাসন ভারসাম্যহীন হয়ে আছে। তাই নির্বাচনের আগে প্রধান উপদেষ্টাকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগীদের প্রত্যাহার না করলে নিরপেক্ষতার বিশ্বাসযোগ্যতা থাকবে না।
আবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে জনপ্রশাসনে বদলি–পদায়নে ‘ভাগবাটোয়ারায়’ উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকে সহায়তা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। যে উপদেষ্টা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন, তার বিরুদ্ধে প্রধান উপদেষ্টাকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করেছেন দলটির নেতারা। যমুনায় বৈঠক শেষে বেরিয়ে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বদলি ও নিয়োগে ভাগবাটোয়ারা হচ্ছে। বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে যারা পরিচিত, তারা নিজেদের মধ্যে প্রশাসন, এসপি-ডিসি ভাগবাঁটোয়ারা করছে। নির্বাচনের জন্য তারা সেই তালিকা সরকারকে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর এমন পরস্পরবিরোধী অভিযোগে বিব্রত অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকরা। এরপরই বিগত আমলে পদোন্নতিপ্রাপ্ত সচিবদের তালিকা নিয়ে পর্যালোচনায় বসেছে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দুই বছরে পদোন্নতি পাওয়া ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ পাওয়া সচিবদের একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। ওই তালিকা এখন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পর্যালোচনার অপেক্ষায় রয়েছে।
তালিকায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন সচিব আছেন, যারা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে পদোন্নতি পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি নীতিগতভাবে বিবেচনায় নিয়েছে সরকার।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব একে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘নির্বাচনের আগে প্রশাসনে আস্থা ফেরানো এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার জন্যে এমন একটি কাঠামো গড়া জরুরি, যেখানে কর্মকর্তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করবেন। এজন্য উপদেষ্টামণ্ডলীর প্রয়োজন প্রতিটি বদলি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে পেশাদারত্বকে প্রধান মানদণ্ড করা।
অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর বলেন, ‘গত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারা এখনও প্রশাসনে সক্রিয়। তাদের বহাল রাখলে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তবে প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও যথাযথ প্রমাণ নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। প্রশাসনের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও বিবেচনা করা উচিত।
প্রশাসন পুনর্গঠনের রোডম্যাপ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ইতোমধ্যে নির্বাচনপূর্ব প্রশাসন পুনর্গঠনের একটি রোডম্যাপ তৈরি করছে। এতে তিনটি ধাপের কথা বলা হয়েছে- প্রশাসনে বদলি ও পুনর্বিন্যাস : গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে রদবদল। মাঠ প্রশাসনে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারদের পর্যায়ে নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অধীনে একটি বিশেষ সেল থাকবে, যেটি নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক বদলির সব সিদ্ধান্ত তদারকি করবে। এই মনিটরিং সেল সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার অধীনে থাকবে, যাতে উপদেষ্টারা নিজ নিজ প্রভাব খাটাতে না পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে নির্বাচনের আগে আস্থার সংকট অনেকটাই কাটবে। তবে সময় স্বল্পতার কারণে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের সামনে বড় প্রশাসনিক চাপ তৈরি হতে পারে।
আস্থার লড়াইয়ে প্রশাসন এখন রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনেই প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তবে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এবার সুযোগ রয়েছে একটি ‘দৃষ্টান্তমূলক’ নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ার।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘যদি সরকার দলীয় প্রভাবমুক্ত, পেশাদার প্রশাসন গড়ে তোলার সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তবে এটি হবে দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সবার চোখ এখন তাই প্রধান উপদেষ্টার দিকে।