শাহরিয়ার জামান দীপ
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৫ ১১:১০ এএম
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধির পর সারা দেশে এর দোকানগুলোতে বেড়েছে চুরি। কয়েকটি ঘটনায় চুরির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা গেলেও উদ্ধার করা যায়নি বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ। মানুষের মনে প্রশ্নÑ চুরি হওয়া এসব স্বর্ণ যায় কোথায়?
অনুসন্ধানে জানা যায়, চুরি হওয়া স্বর্ণের পেছনে কাজ করে দেশি এবং আন্তর্জাতিক চক্র। চুরির সঙ্গে জড়িতদের পেছনেও ব্যয় করা হয় বিপুল অর্থ। বিভিন্ন দোকান থেকে চুরি হওয়া স্বর্ণ রাজধানীর তাঁতীবাজার, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করে চোরা চক্রের সদস্যরা। কোনো কিছু না দেখেই তাদের কাছ থেকে কম দামে কিনে নেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এরপর স্বর্ণগুলো গলিয়ে ফেলা হয়। তারপর বার বানিয়ে বেশি দামে পুনরায় স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। আর কিছু অংশ চলে যায় পার্শ্ববর্তী দেশে। এভাবে চুরি হওয়া স্বর্ণ চলে যায় বিভিন্ন জায়গায়।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মতে, এদেশ থেকে সবচেযে বেশি স্বর্ণ পাচার হয় ভারতে। ভারতের জুয়েলারি ব্যবসা বিশ্ববিখ্যাত। এ কারণে ভারতে স্বর্ণ আমদানিতে কর বেশি। তবে বাংলাদেশে তুলনামূলক কম। কর বেশি হওয়ায় বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশকে চোরাচালানের রুট হিসেবে বেশি ব্যবহার করা হয়। কারণ কর ফাঁকি দিয়ে কালোবাজার থেকে যদি স্বর্ণ সংগ্রহ করা যায়, তাহলে লাভ বেশি হয়।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) জানায়, আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের ট্রানজিট রুট বাংলাদেশ। চোরাচালান ও পাচারকারীদের চক্র ছড়িয়ে আছে দেশে-বিদেশে। সীমান্ত এলাকায়ও আছে চক্রের সদস্যরা। আকাশ, সমুদ্র ও স্থলপথে দেশে প্রতিদিন চোরাচালানের মাধ্যমে কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকার স্বর্ণালংকার ও বার প্রবেশ করছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, স্বর্ণ চুরির সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো কাটআউট পদ্ধতিতে কাজ করে থাকে। একটি পক্ষ চুরি করে আরেকপক্ষের কাছে সেগুলো বিক্রি করে দেয়। এরপর বিক্রীত স্বর্ণগুলো গলিয়ে ফেলা হয়। সেখানে কাজ করে আরেকটি পক্ষ। গলিয়ে বার বানিয়ে বিক্রি করে আরেকটি পক্ষ। অনেকগুলো পক্ষ থাকার কারণে মূল চোরাকারবারিদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় বিদেশে বসেও তারা এসব কাজ সম্পাদন করে। যার কারণে চুরির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা গেলেও স্বর্ণ উদ্ধার করা কঠিন হয়ে যায়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসবের বাইরে একটি পক্ষ আছে, যারা স্বর্ণ চোরাকারবারিদের পক্ষ হয়ে বিভিন্ন দোকানের মালিকের সঙ্গে চুরি যাওয়া পণ্য ফেরত পাওয়া যাবে বলে যোগাযোগ করে। এক্ষেত্রে অনেক সময় কিছু মাল ফেরত পাওয়া গেলেও বেশিরভাগ সময়ই টাকা নিয়ে চম্পট দেয়।
স্বর্ণ চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেট অত্যন্ত শক্তিশালী। গ্রেপ্তারের পর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তারা জামিন নিয়ে এসে একই কাজ শুরু করে জানিয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, চক্রের সদস্যরা পরিচয় লুকিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সাধারণত যেখানে চুরি করবে আগে থেকেই সে স্থানের আশপাশে পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন পেশায় চাকরি নেয়। চুরি করার পর তারা চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবেও তারা এ ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে। গ্রেপ্তারের পর তাদের জামিনের ব্যবস্থাও করে দেয় চক্রের সদস্যরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলারি উৎপাদন ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, কম দামে স্বর্ণ কিনে বেশি দামে বিক্রি করছে এসব চোরাই চক্র। যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সমস্যা সমাধানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও এগিয়ে আসতে হবে। গত কয়েক বছরে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন স্বর্ণ চোরাকারবারিকে গ্রেপ্তার করলেও বন্ধ করা যায়নি দেশে চুরি ও পাচার।