কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৫ ১১:১৪ এএম
বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এখন আর বিলাসপণ্যের তালিকায় নেই; এটি গ্রামীণ ও শহর মব জায়গায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এলপিজির দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেট ব্যবস্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত কয়েক মাস ধরে সরকারি খাতায় দাম কমের নির্দেশনা থাকলেও ভোক্তা পর্যায়ে সে দাম কিছুতেই কমছে না।
বিক্রেতারা বলছেন, আমরা বেশি দামে কিনে আনি, তাই বেশি দামে বিক্রি করি। সরকার যে দাম বেঁধে দেয় সে দামে আমি কেন কোনো ব্যবসায়ী বিক্রি করতে পারবে না। আমরা এই দামে কিনতে পারি না। তার ওপর আবার যানবাহন ভাড়া আছে।
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি এখন কোনো গোপন বিষয় নয়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) অক্টোবর মাসের জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৯ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১,২৪১ টাকা। গত সেপ্টেম্বরে ৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ২৭০ টাকা এবং আগস্ট মাসে কমেছিল ৯১ টাকা। এই দাম সরকারের কাগজে বাস্তবায়ন হলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যক্রম নেই। বিপরীতে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে যেমন, কুষ্টিয়া, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১,৪০০ থেকে ১,৫৫০ টাকায়।
বিইআরসি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভ্যাট সমন্বয় করায় প্রতি কেজি এলপিজির দাম ৩৭ পয়সা বেড়েছিল। তখন ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১,৪৫৫ থেকে বেড়ে ১,৪৫৯ টাকা। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই দাম ছিল ১,২৮০ টাকা, অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে প্রায় ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা।
কুড়িলের জোয়ার সাহারা বাজারের বিক্রেতা মুক্ত বলেন, সরকারি দামে বিক্রি করলে ক্ষতি হয়। পরিবহন খরচ বেড়েছে, শ্রমিক মজুরি বেড়েছে। আমরা যদি ১,৪০০ টাকায় বিক্রি না করি, তাহলে টিকে থাকা কঠিন।
রাশেদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, আমি গত মাসে এক সিলিন্ডার গ্যাস কিনেছি ১৬০০ টাকা দিয়ে।
রাজধানী ও জেলা শহরের পাশাপাশি গ্রামেও অনেক পরিবার কাঠ, কয়লা বা কেরোসিন ব্যবহার শুরু করেছেন। নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, গ্যাসের দাম এখন আগুন। রান্নাঘরে আবার কাঠ জ্বালানো শুরু করেছি। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে যায়, কিন্তু পেট তো চালাতে হবে! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। পরিবেশবিদ ড. নুরুল আমিন বলেন, এভাবে যদি মানুষ আবার কাঠ বা কয়লায় ফিরে যায়, তাহলে বন নিধন ও বায়ুদূষণ ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ভ্যাট সমন্বয় করায় প্রতি কেজি এলপিজির দাম ৩৭ পয়সা বাড়ানো হয়। ফলে বেসরকারি কোম্পানির এলপিজির দাম প্রতি কেজি ১২১ টাকা ১৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১২১ টাকা ৫৬ পয়সা করা হয়েছিল। তখন ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৪৫৫ থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৪৫৯ টাকা নির্ধারণ করেছে কমিশন। অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে দাম বেড়েছিল ৪ টাকা।
বাংলাদেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করা হয়। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি আরামকো প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক দাম নির্ধারণ করে, যা সৌদি সিপ নামে পরিচিত। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে টনপ্রতি সৌদি সিপ ছিল ৫৮০ ডলার, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২০ ডলারে। এলপিজি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি জানান, আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বাড়লে সঙ্গে সঙ্গেই তা অনুভব করি। ডলার সংকট ও এলসি খোলার জটিলতায় আমদানি ব্যয় আরও বেড়েছে। ফলে এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়ে পড়ছে।
দাম বেশি রাখার কারণ সম্পর্কে বিইআরসির কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাম নির্ধারণ করি। দাম কমলে আমরা তা-ও সমন্বয় করি। তবে অনেকে বেশি দামে বিক্রি করে অযৌক্তিক মুনাফা করছে।
সম্প্রতি এক বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, বাজারে বাড়তি দামে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বিক্রি বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে অভিযান চালানো হবে। ১২০০ টাকার এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হয় ১৪০০ টাকায়। এটার দায় নিতে হবে ব্যবসায়ীদের। ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার টাকার কমে বিক্রি হওয়া উচিত।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাসুম আলীর নেতৃত্বে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অপরাধে কুষ্টিয়ায় আলিফ-আখলাক স্টোরকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বাজারে নিয়মিত অভিযান না চালানোর কারণে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের পকেট কাটছে। এ অবস্থায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইয়ের নিরবতা প্রশ্ন তুলেছে সাধারণ মানুষের মনে। তারা দায়িত্ব পালন না করে নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে, যা মূলত লুণ্ঠনকারীদের উৎসাহিত করছে। আর সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন বাড়তি দামের বোঝা বইতে বাধ্য করছে।