× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রশাসন

দীর্ঘ হচ্ছে বাধ্যতামূলক অবসর তালিকা

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:১৯ এএম

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:২২ এএম

দীর্ঘ হচ্ছে বাধ্যতামূলক অবসর তালিকা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনে চলছে অস্থিরতা। অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়েও যারা সরকারের নির্দেশনা মানছেন না বা রাষ্ট্রের স্বার্থের বিপরীতে কাজ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সিনিয়র সচিব ও সচিব সরকারবিরোধী অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) থাকা অবস্থায় তারা ‘সরকারবিরোধী গোপন বৈঠক’, ‘তথ্য ফাঁস’ ও ‘রাজনৈতিক তৎপরতা’ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে এমন অভিযোগ উঠে আসার পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি কয়েকজন সচিব ও সিনিয়র সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। নির্বাচনের আগে বাধ্যতামূলক অবসরের পরবর্তী তালিকায় আরও কয়েকজন সচিবের নাম থাকতে পারে। ইতোমধ্যে বিগত সরকারের আমলে সচিব হওয়া কর্মকর্তাদের আমলনামা পর্যালোচনা চলছে। তাদের কর্মকাণ্ডের ওপর একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে তাদের তালিকাও পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সিনিয়র সচিব ও সচিবের দায়িত্বে রয়েছেন কেউ কেউ। তবে প্রশাসনের বড় একটি পক্ষ তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর জন্য সরকারে ওপর জোর চাপ সৃষ্টি করছে। আবার অন্য একটি পক্ষ চাইছে, পেশাদারত্ব বজায় রেখে যদি তারা প্রশাসনে কাজ করেন, তাহলে অবসরের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের সরে আসা উচিত। কারণ প্রশাসন পরিচালনায় দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তার প্রয়োজন রয়েছে। শেষ পর্যন্ত সরকার কোনোটাই না রাখলে তখন সচিবদের অবসরের তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে। এটি ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়, প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া’। সরকার সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্রগুলো জানায়, এখন সরকারের অগ্রাধিকার একটি গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার মনে করছে, কিছু কর্মকর্তা এখনও ক্ষমতাচ্যুত ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ‘রাজনৈতিক আদর্শে অনুগত’। তারা অফিসে নিষ্ক্রিয়, নীতি বাস্তবায়নে অনীহা এবং গোপনে অপতৎপরতায় লিপ্ত। এমন প্রমাণ পাওয়া কর্মকর্তাদের জনস্বার্থে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হচ্ছে। তবে চাকরির মেয়াদ ২৫ বছরের কম যাদের, তাদের ওএসডি হিসেবে রাখা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি শুধু শাস্তিমূলক নয়, বরং প্রশাসনের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনাই লক্ষ্য। অন্যদিকে, ২০১৪, ’১৮ ও ’২৪ সালের বিতর্কিত ভোটারবিহীন সংসদ নির্বাচনে সহায়তা করা রিটার্নিং কমকর্তা ৪৩ জেলা প্রশাসককে (ডিসি) ওএসডি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ২২ সাবেক ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রশাসনের বর্তমান পরিস্থিতি আসলে দীর্ঘদিনের দলীয়করণের ফল। জনপ্রশাসনকে দলীয়করণের খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সময় এবং জিয়াউর রহমানের পরবর্তী পর্যায়েও এই প্রবণতা ছিল। তবে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকালে তা সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে। ফলে এখন নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগে অনেক কর্মকর্তা চাকরি হারাচ্ছেন। কারও ক্ষেত্রে তা ন্যায্য, আবার কারও ক্ষেত্রে অন্যায়ও হতে পারে। তাই সরকারকে সতর্ক হতে হবে যাতে ‘অতি উৎসাহী’ পদক্ষেপে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

আলোচিত ৯ সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসর

অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি (গত সোমবার) ওএসডি থাকা ৯ সচিব ও সিনিয়র সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। এ-সংক্রান্ত পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তাদের সবাই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদোন্নতি পান এবং গত বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ওএসডি হয়েছিলেন। তারা হলেনÑ মো. আজিজুর রহমান, মো. নূরুল আলম, ড. এ কে এম মতিউর রহমান, ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ, মো. মিজানুর রহমান, শফিউল আজিম, মো. মনজুর হোসেন, মো. মশিউর রহমান এবং মো. সামসুল আরেফিন। এসব কর্মকর্তা অতীতে প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। নির্বাচনের সময় দলীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নে অতি উৎসাহী ভূমিকা রেখেছেন। তাদের কর্মকাণ্ডে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনকালে বেশকিছু কর্মকর্তা ভোটের পরিবর্তে ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশলে সহায়তা করেছিলেন। বিনিময়ে তারা পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা পান। সরকার পরিবর্তনের পর অনেকেই ওএসডি হন। এরপরও কিছু কর্মকর্তা গোপন বৈঠক, সরকারের গোপন তথ্য ফাঁস ও রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।

ওএসডি থাকা মানে সরকারি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি। কিন্তু তারা এটি ব্যবহার করেছেন বিগত সরকারের স্বার্থে। এটা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। এমন তথ্য সরকারের কাছে থাকার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে। 

নির্বাচনে বিতর্কিত ভূমিকার অভিযোগে ইতোমধ্যে অবসরে পাঠানো হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুল হাসান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব জাকিয়া সুলতানা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামানকে। তা ছাড়া অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে আছেনÑ মোখলেসুর রহমান সরকার, মোহাম্মদ শফিউল আরিফ, এনামুল হাবীব, সায়লা ফারজানা, রাব্বী মিয়া, এস এম আলম, তন্ময় দাস, তোফায়েল ইসলাম, শওকত আলী, সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, কামরুন নাহার সিদ্দীকা, আবদুল আওয়াল, হামিদুল হক, দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, ফয়েজ আহাম্মদ, মাসুদ করিম, উম্মে সালমা তানজিয়া এবং আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস। তাদের কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ না থাকলে তারা স্বাভাবিক নিয়মে চাকরি-পরবর্তী সুবিধা পাবেন।

বিতর্কিত নির্বাচনে সহযোগিতার অভিযোগে ১০ জন সাবেক সচিব ও শীর্ষ কর্মকর্তা কারাগারে রয়েছেন। বিগত সরকারের আমলে তারা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। তারা হলেনÑ ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী, মো. জাহাঙ্গীর আলম, মেজবা উদ্দিন, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. আমিনুল ইসলাম খান, নজিবুর রহমান, মোস্তফা কামাল উদ্দিন, হেলাল উদ্দিন আহম্মদ, ইসমাঈল হোসেন ও শাহ কামাল। তারা সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচনী কারচুপি, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থে কাজে লাগিয়েছিলেন।

নির্বাচনী অনিয়মের হিসাব

২০১৮ সালের নির্বাচনে ১০৩টি আসনের ২১৩ কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছিল, যেখানে সব ভোটই নৌকার পক্ষে যায়। অন্তত ৫৮৬ কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ১০০% ভোট পান, অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি ১,২৮৫ কেন্দ্রে একটি ভোটও পায়নি। এমন নজিরবিহীন পরিসংখ্যানের কারণেই এখন সেই সময়ের রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, এসপি ও ওসিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৮০টির বেশি মামলা চলছে। 

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে বলেন, ‘নির্বাচনের সময় অতি উৎসাহী কর্মকর্তারা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নষ্ট করেছেন। এবার তাদের কেউ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না। ভবিষ্যতের জন্য এটা একটি বার্তাÑ দলবাজির পরিণতি সর্বদা করুণ।

প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনের এই ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ অভিযান অনেকের কাছে রাজনৈতিক বার্তা। আবার কারও কাছে নিরপেক্ষতার স্বার্থে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ।

অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য যদি সত্যিই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হয়, তবে তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তবে সমালোচকদের প্রশ্নও জোরালোÑ এই অবসরের তরঙ্গ কি শুধুই শুদ্ধি অভিযান, নাকি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশাসনের পুনর্বিন্যাস?

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা