বিএসটিআই
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৩০ এএম
আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৩০ এএম
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। মূলত সেবা ও পণ্যের গুণমান নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠানটি গঠিত। অথচ শিল্পপণ্যের মান নির্ধারক, সনদ প্রদান ও রপ্তানি সক্ষমতার স্বীকৃতি প্রদানকারী গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানটিতেই প্রশাসনিক অনিয়ম, ব্যক্তি সখ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে পদোন্নতি ও বদলির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসন উইংয়ে অনিয়ম অব্যাহত থাকায় দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিএসটিআইয়ের প্রশাসন উইংয়ের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিস্বার্থে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, একজন উপ-পরিচালক নিজের প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে পছন্দের কর্মকর্তাদের বসাচ্ছেন। প্রাধান্য দিচ্ছেন তার নিজ জেলার কর্মকর্তাদের। এদিকে তার অনুগতরাও অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বলা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসন উইং থেকে আর্থিক সুবিধা ছাড়া কোনো বদলি বা পদোন্নতি হয় না। গত দুই বছরে যত নিয়োগ ও বদলি হয়েছেÑ তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘অস্বচ্ছতা’ ও ‘ব্যক্তিগত প্রভাব’ কাজ করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রশাসনের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থে দক্ষ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে অনভিজ্ঞদের পদোন্নতি দিচ্ছেন। এর ফলে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন যোগ্য কর্মকর্তারা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রশাসন উইংয়ের একজন উপ-পরিচালক ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে যোগদানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি ভোল পাল্টে ফেলেছেন। আরও অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার প্রভাবেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও পরিচালক (প্রশাসন) পদে উন্নীত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। বরং তিনি তার পছন্দের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করছেন।
প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বিএসটিআইতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং ‘চাহিদামতো সুবিধা’ দিলে তবেই পুরস্কার বা ইনক্রিমেন্ট পাওয়া যায়। সম্প্রতি কয়েকজন কর্মকর্তাকে ‘শুদ্ধাচার পুরস্কার’ দেওয়া হয়েছে, তবে তা যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়। দেওয়া হয়েছে ব্যক্তিগত আনুগত্যের ভিত্তিতে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগীয় অফিসের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও অনৈতিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যে উপ-পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ দাবি, সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, এমনকি প্রশাসন উইংয়ের সহায়তায় বারবার বিদেশ সফরের সুযোগ গ্রহণ করেছেন। তার ছত্রছায়ায় থাকা কর্মকর্তারাই বছর বছর ‘বিশেষ ইনক্রিমেন্ট’ পেয়েছেন অভিযোগ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, এখানে যারা অনৈতিক সুবিধা দেয়, তারাই পুরস্কৃত হয়। অন্যদিকে সৎ কর্মকর্তারা পদোন্নতি তো দূরের কথা, মৌলিক ইনক্রিমেন্টও পান না।
ভুক্তভোগীরা বিএসটিআইর ভাবমূর্তি রক্ষায় শিল্প সচিবের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেছেন, প্রশাসন উইংয়ের একাংশের অনিয়ম ও দুর্নীতি বিএসটিআইয়ের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করছে। নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে কোনো কোনো কর্মকর্তা সংস্থার নীতিমালা সংশোধন ও জনবল কাঠামো প্রণয়নেও প্রভাব খাটাচ্ছেন, যা পরবর্তীতে প্রস্তাব চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, যেখানে সংশ্লিষ্ট কমিটির পূর্ণ সভাও হয় না।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রশাসন উইংয়ের এই উপ-পরিচালক গত সরকারের সময়ে যেমন, বর্তমানেও প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন। বিএসটিআই প্রশাসনে তার প্রভাব ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলেন না। অতীতে যারাই বিরুদ্ধাচরণ করেছেন, তাদের বদলি হতে হয়েছে।
এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব ওবায়দুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিএসটিআই একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা। এখানে প্রশাসনিক অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। শুধু তাই নয়, সংস্থাটিতে কর্মরতদের মধ্যে যাদের চাকরি স্থায়ী হয়নি, তাদের চাকরি স্থায়ীকরণেরও দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসটিআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সংস্থাটি দেশের শিল্পোন্নয়নের একটি প্রধান ভিত্তি। এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব থাকলে তা সমগ্র শিল্প খাতের ওপর প্রভাব ফেলবে। প্রশাসন উইংয়ের নিয়োগ, বদলি ও পুরস্কার প্রদানের পদ্ধতি যদি দুর্নীতিমুক্ত না হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা কমতে থাকবে।
তারা বলেন, বিএসটিআই দেশের শিল্পপণ্যের মান নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠান। এখানে দুর্নীতি থাকলে তা শুধু সংস্থার ভাবমূর্তি নয়, ভোক্তা অধিকার ও রপ্তানি খাতের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ভুক্তভোগীরা মন্ত্রণালয়ের সুষ্ঠু তদন্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। তারা মনে করছেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটিতে পদোন্নতি ও পদায়ন করলে বিএসটিআই আবার তার প্রকৃত মর্যাদায় ফিরবে।