সাক্ষাৎকার
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১৩:৩০ পিএম
ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। প্রবা ফটো
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ‘এনরোলমেন্ট কমিটির’ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। ব্যারিস্টার কাজল টানা তিনবার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার, গণভোটসহ সমসাময়িক ইস্যুতে কথা বলেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মাসুদুল হাসান
প্রবা : জুলাই সনদ নিয়ে কিছু বলুন।
রুহুল কুদ্দুস : আমি মনে করি ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরে নতুন বাংলাদেশের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার অংশীজনদের আস্থা-অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ হলো জুলাই সনদ। সব রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তি যারা একত্রিত হয়ে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন করেছে, তারা জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে ঐকমত্য হলে জুলাই সনদের মতো এমন দীর্ঘমেয়াদি চর্চার কোনো প্রয়োজন হতো না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পারিক আস্থা নেই বলে ৫ আগস্ট যে গণআন্দোলন হয়েছে সেই আন্দোলনের যে স্পিরিট তা ধারণ করে আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালিত হবে নাÑ এই আশঙ্কা থেকেই এর একটা আইনি কাঠামো দেওয়ার জন্যই তারা জুলাই সনদের মতো একটি সনদ প্রতিষ্ঠা করেছে। হয়তো এটা প্রয়োজন, আমি এটাকে সাধুবাদ জানাই। দেশের এত বড় একটি ঘটনা লিপিবদ্ধ করার জন্য আমাদের দেশে অন্য কোনো আইনি কাঠামো নেই। সে ক্ষেত্রে অংশীজন ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে আগামীর বাংলাদেশে পরিচালনা এবং ২৪-এর গণআন্দোলনের একটা রাজনৈতিক আইনি ও সাংবিধানিক স্বীকৃতির উদ্দেশ্যে এটা করা।
প্রবা : প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন বিষয়ে তারা ঐকমত্যে পৌঁছলেও কিছু বিষয়ে তারা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি। এ বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
রুহুল কুদ্দুস : যেসব বিষয়ে তারা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি সেগুলোর বাস্তবায়ন পরবর্তী সরকারের গুড সেন্সের ওপর নির্ভর করে। যেগুলো ঐকমত্য হয়েছে সেগুলোর একটা আইনি বাধ্যবাধকতা দেওয়ার জন্য সর্বশেষ পর্যায়েও মতবিরোধ ছিল। রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে যে, জুলাই সনদ যেটা হবে তার একটা আইনি স্বীকৃতি গণভোটের মাধ্যমে মানুষের সমর্থন অর্জন করবে। সেটা পরবর্তী সরকার কর্তৃক সংবিধানে সংযোজিত হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনও বিরোধ আছেÑ এটি কি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন হবে, নাকি আগে-পরে হবে। এনসিপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে এটি আগে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিএনপি যেটা মনে করে, একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য একটি বিশাল জনগোষ্ঠী, জনশক্তি, জনসমর্থন প্রয়োজন, এর সঙ্গে রাষ্ট্রের ক্ষতির সম্পর্ক আছে। সুতরাং একই দিনে দুটি নির্বাচন করলে গণভোটও হলো সংসদ নির্বাচনও হলো। বাংলাদেশে অতীতে এমন ঘটনা না হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বাংলাদেশের ভোটারদের একই জায়গায় দুটি ব্যালটে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। আমি মনে করি, এতে কোনো সমস্যা হবে না, গণভোট হতে পারে নির্বাচনের দিন।
প্রবা : গণভোট আয়োজন নিয়ে কী ভাবছেন?
রুহুল কুদ্দুস : একজন আইনজীবী হিসেবে মনে করি, বাংলাদেশের সংবিধান এবং আইনে গণভোটের কোনো বিধান নেই। গণভোটের বিধান সংবলিত বিদ্যমান একমাত্র আইন গণভোট আইন-১৯৯১, সেই আইনটি হচ্ছে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫টি ক্ষেত্রে, সংসদে কোনো বিল আইন হিসেবে পাস করার পর রাষ্ট্রপতির সম্মতির আগে গণভোটের বিধান আছে। সে অনুযায়ী ১৯৯১ সালে গণভোট আইনটি প্রণয়ন করা হয়, যার ভিত্তিতে সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনী আনা হয় এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকারের দিকে ধাবিত হয়। সেটি সাংবিধানিক সংশোধনী ছিল এবং সে ক্ষেত্রে গণভোট হয়েছিল। এর আগে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক বৈধতা ও ১৯৮৫ সালে এরশাদের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে ২টা হ্যাঁ না ভোট হয়েছে। সেই ভোটগুলো নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। সেখানে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে কি হয়নি, সেই বিতর্কে না গিয়েও আমি মনে করি বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক জুলাই আন্দোলনের চেতনা ধারন করেন এবং এই গণভোটের পক্ষে মতামত দেবেন। রাষ্ট্রের যখন একটা শূন্যতার ভিত্তিতে আইনি কাঠামো তৈরি করা হয় তখন তার সুবিধা-অসুবিধা দুটোই থাকে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে একটা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক শূন্যতার মধ্য দিয়ে। সুতরাং এই সরকারেরও অনেক কাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে অ্যাডহক ভিত্তিতে, যার সাংবিধানিক ও আইনি সমর্থন সব সময় পাওয়া যায় না। তবে এই সরকারের বৈধতা ও কার্যক্রম, জুলাই সনদ এবং ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে, যা কিছু করা হবে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত তার সবকিছুই আমাদের বিদ্যমান সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশোধন করে পরবর্তীতে সেটা আমাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ ছাড়াও জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে এবং যে ঐকমত্যগুলোর জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন, তাও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
প্রবা: সাংবিধানিক সংস্কারগুলো কীভাবে দেখেন?
রুহুল কুদ্দুস : আমি সাংবিধানিক সংস্কারগুলোকে খুবই ইতিবাচকভাবে দেখি। সংবিধান ও সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর করার জন্য একনায়কতন্ত্র কায়েম হওয়ার কারণে কোনো ভারসাম্য ছিল না। রাষ্ট্রপতি ছিলেন ঠুঁটো জগন্নাথ। সুতরাং, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার জন্য যে সাংবিধানিক সংশোধনী– এ বিষয়টিকে আমি স্বাগত জানাই। প্রধানমন্ত্রী পদে এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন থাকার ফলে তার মধ্যে ফ্যাসিবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, সেটাকে সীমিত করে ১০ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার যে সিদ্ধান্ত, সেটাকে আমি ভালো চোখে দেখি। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দল কর্তৃক নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্যের স্বাধীন মতামত প্রকাশের কোনো সুযোগ ছিল না। এই সংশোধনীর ফলে তিনি স্বাধীনভাবে নিজ দলের বিরুদ্ধে হলেও মত প্রকাশ করতে পারবেন। এই বিষয়টিকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখি।
প্রবা : দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদের বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
রুহুল কুদ্দুস : দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদের বিষয়টিকে আমি ভালো চোখে দেখি। আমাদের দেশের মার্জিত ও বুদ্ধিজীবী মানুষ যারা দেশ ও জাতির জন্য অবদান রাখতে পারেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায় তারা সরাসরি ভোটে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়ে আসেন না। বরং কালো টাকার মালিকরা পেশী শক্তি ব্যবহার করে সংসদে চলে আসে। সমাজের যারা সৎ ও বিদ্বান মানুষ তাদের সংসদের উচ্চ কক্ষে এনে ভারসাম্য রক্ষা করা যেতে পারে।
প্রবা: আদালতের বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
রুহুল কুদ্দুস : এটা একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মো. এরশাদের আমলেও উচ্চ আদালতকে দেশের ৮টি জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট সেটি বাতিল করে দেন। আমাদের বিদ্যমান সংবিধানে কোনো কারণে, কোনো প্রয়োজনে প্রধান বিচারপতি মনে করলে ঢাকার বাইরে যেকোনো জায়গায় সার্কিট বেঞ্চ গঠন করতে পারেন। যেমনÑ চট্টগ্রাম ও বেনাপোলে অনেক কাস্টমসের মামলা হয়, বন্দরেও অনেক মামলা হয়। প্রধান বিচারপতি মনে করলে চট্টগ্রামে একটা আদালত বসাতে পারেন। উচ্চ আদালতের ক্ষমতাসম্পন্ন একজন বিচারপতি ওখানে যাবেন। যেন বাদী-বিবাদীসহ শত শত লোককে ঢাকায় আসতে না হয়। মোটকথা, আমি বিকেন্দ্রীকরণ ততটুকু সমর্থন করি, যাতে বিচারের কাজ বিচারপ্রার্থীদের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া যায়। আমাদের একক রাষ্ট্র কোনো প্রাদেশিক সরকার নয়। সুপ্রিম কোর্টকে বিভাজন করলে অপরাধপ্রবণতা বাড়বে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সমস্ত হাইকোর্টের ওপর তার একটা নিয়ন্ত্রণ থাকে, ঢাকার বাইরে এসব বেঞ্চ হলে সুপ্রিম কোর্ট ও প্রধান বিচারপতির নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
প্রবা : গণভোট আয়োজন নিয়ে কী মতামত আপনার?
রুহুল কুদ্দুস : রাষ্ট্র সাংবিধানিক আদেশের কথা বলেছে, তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা সংবিধানে বিদ্যমান আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একটা অসাংবিধানিক পন্থায় এই অন্তর্বর্তী সরকারকে দিয়ে একটা আদেশ জারি করাতে চেয়েছে। জামায়াত তাদের কিছু প্রস্তাব প্রভিশনাল কনস্টিটিউশন অর্ডার/ বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ একই জিনিস। প্রচলিত সাংবিধানের ভিত্তিতে যে সরকার পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রধান বিচারপতি, রাষ্ট্রের সমস্ত সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হয়েছে, বিচারপতিরা অবসর নিচ্ছে সাংবিধানিক নিয়ম অনুসারে। সেই সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে এই ধরনের একটি প্রভিশনাল অর্ডার কিংবা সাংবিধানিক আদেশ করানোর বাস্তবতা বিবর্জিত যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা কার্যকর হয়নি। এই ধরনের প্রস্তাব আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বলেছি, জামায়াতের এই প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়। সরকার কর্তৃক তথাকথিত বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে, সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে, সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে এই ধরনের সংবিধান সংশোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করাটা আত্মঘাতী। আমি বলেছি, বিদ্যমান সংবিধানের মধ্যেই আমাদের জিনিসটি খুঁজতে হবে।
গণভোট আইন ১৯৯১ সংশোধনের মাধ্যমে গণভোট আয়োজন করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে এই মর্মে ক্ষমতা দিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংশোধনী আনতে হবে, তারা যেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ভিন্ন ব্যালটে গণভোট করতে পারে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইতঃপূর্বে যারা ইগোস্টিকলি প্রভিশনাল কনস্টিটিউশনাল অর্ডার বা অন্তর্বর্তীকালীন সাংবিধানিক আদেশের প্রস্তাব দিয়েছিল তারা সম্ভবত তাদের ইগো থেকে বের হতে পারেনি। সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে তারা নতুন একটা আদেশ করার চেষ্টা করছে। ইগো বাদ দিয়ে আইন এবং সংবিধানের মধ্য থেকে, সংবিধানে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের আদেশ জারির ক্ষমতা আছে তেমন একটা অধ্যাদেশ জারি করা হতে পারে। অথবা অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বিদ্যমান গণভোট অধ্যাদেশ ১৯৯১ সংশোধন করে গণভোট আয়োজন করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে জুলাই সনদেরও আইনগত ভিত্তি দেওয়া সম্ভব।