× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গ্রামীণ অবকাঠামো

অনিয়মে জর্জরিত প্রকল্পের ব্যয় লাফিয়ে বাড়ছেই

আরমান হেকিম

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৪১ এএম

অনিয়মে জর্জরিত প্রকল্পের ব্যয় লাফিয়ে বাড়ছেই

টেকসই গ্রামীণ অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল ‘গ্রামীণ মাটির রাস্তাসমূহ টেকসইকরণের লক্ষ্যে হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি)করণ’ প্রকল্প। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল দুর্যোগকালীন জরুরি সড়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, কৃষিপণ্য ও গবাদিপশুর পরিবহন সহজ করা এবং গ্রামীণ জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার, বালু-ইটের স্তরে কারচুপি এবং প্রকল্প নকশা অনুযায়ী কাজ না করার অভিযোগ প্রকল্পটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

প্রকল্পটির ব্যয় ও মেয়াদ ইতোমধ্যে দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে। এবার আরও ৭৭০ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে, যা আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তৃতীয় সংশোধিত প্রস্তাব হিসেবে অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্প অনুমোদনের সময় মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা এবং শেষ হওয়ার সময় নির্ধারিত হয়েছিল ২০২২ সালের জুন। বাস্তবায়ন কার্যক্রম শেষ না হওয়ায় প্রথমে এক বছর এবং পরে আরও দুই বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। দ্বিতীয় দফায় ব্যয়ও প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩৩৪ কোটি। এখন আরও এক বছর মেয়াদ এবং ৭৭০ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব থাকায় মোট ব্যয় হবে ৫ হাজার ১০৪ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকল্পের অনিয়ম, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং ঘনঘন ব্যয় বৃদ্ধি শুধু সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের সুশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং গ্রামীণ সড়ক নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য- দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকেও অনিশ্চিত করে তুলছে। ত্রুটিপূর্ণ বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণের অভাব ও অতিরিক্ত ব্যয় দেশের জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে এবং স্থানীয় জনগণের বিশ্বাসহীনতা বাড়াচ্ছে।

নিম্নমানের নির্মাণ ও ঘাটতির অভিযোগ

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকল্পের মান নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন তৈরি করেছে। খুলনার বটিয়াঘাটার ৭৫০ মিটার রাস্তা নির্মাণে ৬১ লাখ টাকা ব্যয় হলেও নিম্নমানের ইট ও বালুর স্তরের কারণে দ্রুত রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে স্থানীয়রা নতুন রাস্তা নির্মাণের দাবি জানাচ্ছেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দ্বিতীয় পর্যায়ে গ্রেড-১ ইট ব্যবহারের কথা থাকলেও অন্তত ২০ শতাংশ স্থানে নিম্নমানের ইট ব্যবহার হয়েছে। অনেক জায়গায় ইটের নিচে বালু স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী দেওয়া হয়নি, যার ফলে রাস্তার মসৃণতা নষ্ট হয়েছে এবং কিছু অংশের এইচবিবি উঠে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ৩ মিটার প্রস্থের রাস্তা তৈরি হওয়ার কথা থাকলেও তা কম প্রস্থে নির্মাণ করা হয়েছে। সাবগ্রেড কম্প্যাকশন যথাযথভাবে না হওয়ায় অন্তত ১০ শতাংশ স্থানে মাটি দেবে গেছে।

প্রকল্পে কোনো পূর্ণাঙ্গ ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি, নেই এক্সিট পরিকল্পনা বা রক্ষণাবেক্ষণ নির্দেশনা। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত চার অর্থবছরে ৩৫টি জেলায় ৩৬২টি আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে, যার নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।

মেয়াদ বাড়লেও অসমাপ্ত কাজ

প্রকল্পের মেয়াদ প্রথমে ২০১৯ জানুয়ারি থেকে ২০২২ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। পরে এক বছর বাড়িয়ে ২০২৩ জুন করা হয়। দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৫ জুন করা হয়েছে। বাস্তব অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৯৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ, তবে মাঠপর্যায়ে কিছু কাজ অসমাপ্ত থাকায় এবং চূড়ান্ত বিল পরিশোধ না হওয়ায় আবারও এক বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বর্তমানে ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলার ৪৯৫টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। সর্বশেষ অনুমোদিত ৬ হাজার ৭৮৮ কিলোমিটারের সঙ্গে নতুনভাবে এক হাজার কিলোমিটার রাস্তা যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৭৫ কিলোমিটার এইচবিবি ও ২৪ দশমিক ৯০ কিলোমিটার ইউনিব্লক (সলিড ব্লক) রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্যয় বাড়লেও সুফল সীমিত

আইএমইডির নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের ব্যয় ক্রমে বাড়লেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না। নির্মাণ ত্রুটি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং পরিকল্পনা ঘাটতির কারণে প্রকল্পের প্রভাব সীমিত। প্রতিবেদনে নতুনভাবে আরসিসি বা কংক্রিটকরণ প্রকল্প নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

আইএমইডি এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রকল্পগুলোর নিবিড় পরিবীক্ষণ ও প্রভাব মূল্যায়ন করেছি। যেখানে গ্যাপ পাওয়া গেছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প পরিচালককে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।’

এর আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান বলেছিলেন, কোথাও মানহীন কাজের অভিযোগ থাকলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ

প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য- দুর্যোগের সময় জনগণ যেন দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছতে পারে, চিকিৎসা পেতে পারে, গবাদিপশু নিরাপদে সরানো যায় এবং ঝুঁকি হ্রাস পায়। এ ছাড়া স্থানীয় হাটবাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে টেকসইকরণ, বর্ষায় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানো এবং নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও ছিল।

লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ৬৪ জেলার ৪৯৫টি উপজেলায় মোট ৭ হাজার ৭৮৮ কিলোমিটার গ্রামীণ মাটির রাস্তা এইচবিবি করা হবে। বন্যাদুর্গত এলাকায় ২৪ দশমিক ৯০ কিলোমিটার ইউনিব্লক রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এডিপি বরাদ্দ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকল্পটি ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দসহ অন্তর্ভুক্ত। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্ধিত মেয়াদে কাজ সমাপ্তির লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।

আইএমইডি বলছে, প্রকল্পের কার্যকারিতা ধরে রাখতে হলে মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদ, স্থানীয় পর্যায়ে কাজের মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং অডিট আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। তা না হলে বাড়তি ব্যয় ও সময় সত্ত্বেও জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা