প্রবা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২২ ২৩:৫২ পিএম
সংগৃহীত ছবি
কোটি কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের বিশ্বে অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়েই চলেছে। করোনা মহামারি, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, দেশে দেশে দুর্নীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েছে আরও অসংখ্য মানুষ। এই সংকট পাশ কাটিয়ে ভূরাজনীতির আধিপত্যের লড়াইয়ে থাকা দেশগুলো অস্ত্রের গুদাম বাড়াতে বেশি মনোযোগী।
ক্ষুধা ও অস্ত্রের ব্যবসা নিয়ে গবেষণা করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পাওয়া তথ্য রীতিমতো গা শিউরে ওঠার মতো। করোনা শুরুর পর থেকে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধবাস্তবতায় দরিদ্র মানুষ বেড়েছে ৫০ কোটি। অনাহারি, অর্ধাহারি এসব মানুষের দিকে বিশ্বনেতাদের মনোযোগ কম। অথচ এই সময়েই তারা অস্ত্র কেনাবেচা করেছে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণে। ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বের মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় ২ দশমিক ১৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এপ্রিলে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৮২ কোটি ১০ লাখ মানুষ ক্ষুধার যন্ত্রণায় রয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলোতে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে পারে। এরপর গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের আরেক প্রতিবেদনে আরও নাজুক পরিস্থিতি উঠে আসে। তাতে দেখা যায়, ক্ষুধার যন্ত্রণায় থাকা প্রায় ৮২ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অনাহারি হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর-এই পাঁচ মাসেই ক্ষুধায় কাতর মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৪ কোটি বেড়েছে।
গত অক্টোবরে বিশ্বব্যাংকও একটি সতর্ক বার্তা দেয়। সংস্থাটি জানায়, ২০২২ সালের শেষ নাগাদ চরম দারিদ্র্যসীমায় চলে যাবে বিশে^র ৬০ কোটি ৫০ লাখ মানুষ, যা বিশে^র মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ। এই সংখ্যা ২০২৩ সালে আরও বাড়বে।
সম্প্রতি বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে জানিয়েছে, বিশে^র প্রায় ৫৫টি দেশ দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েছে। এর মধ্যে ৩৬টি দেশ খুবই মারাত্মক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। তার মধ্যে আবার ১০টি দেশÑইয়েমেন, কঙ্গো, আফগানিস্তান, ভেনিজুয়েলা, ইথিওপিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, নাইজেরিয়া ও হাইতির অবস্থা অবর্ণনীয় হতে পারে। এসব দেশের প্রায় ১০ লাখেরও বেশি মানুষ এখনই অনাহারে দিন কাটাচ্ছে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ডব্লিউএফপির নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বেসলি বলেছিলেন, ‘করোনার অভিঘাতের পাশাপাশি বিশ্ব এখন দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে। কঠিন বাস্তবতা হলো, করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর চেয়েও বেশি মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যেতে পারে।’
বৈশি^ক করোনা মহামারি এখন মহাবিপর্যয়ের পর্যায়ে নেই। তবে তা মোকাবিলায় দেশে দেশে জরুরি বিধিনিষেধ আরোপ ও সরকারি কার্যক্রমে দুর্নীতির কারণে বহু মানুষ কর্মসংস্থা হারিয়েছে। ছোট ছোট ব্যবসা আরও সংকুচিত হয়েছে। এর কারণে অসংখ্য স্বচ্ছল মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
ডব্লিউএফপি জানিয়েছে, করোনা ছাড়াও ভূরাজনৈতিক বিরোধ, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, অস্থিতিশীল তেলের বাজারসহ বিভিন্ন কারণে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। ফলে দুর্ভিক্ষ এড়াতে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি।
করোনা নিয়ন্ত্রণে এলেও তার অভিঘাত পুষিয়ে নিতে পারেনি বাংলাদেশও। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) গত বছর নভেম্বরে জানায়, দেশে করোনাকালেই ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। গত এক বছরে সেই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তাদের বেশিরভাগ এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এরই মধ্যে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ এবং একে ঘিরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় আরও নাজুক দেশের অর্থনীতি। সম্প্রতি দুর্ভিক্ষের সতর্ক বার্তা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরসঙ্গে দুর্নীতি ও অর্থপাচার পরিস্থিতিকে আরও কাবু করেছে।
সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে ডব্লিউএফপি জানায়, শুধু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণেই অনাহারে থাকতে হতে পারে সাত কোটি মানুষকে। বিশে^ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মাত্রা এতই বেশি যে, তা ২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরুর আগের তুলনায় আড়াই গুণ বেশি। তিনি বলেন, ‘এটি অবিশ্বস্যভাবে উদ্বেগজনক যে, ৪৫ দেশের পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে এবং দুর্ভিক্ষ তাদের দিকে ধেয়ে আসছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে ছিল বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার ঢেউ। আর এখন মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে ক্ষুধার সুনামি।’
জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক সিচুয়েশন অ্যান্ড প্রোসপেক্টস (ডব্লিউইএসপি) চলতি বছরের মে মাসে জানায়, ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বলানির মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চড়া বাজার, দেশে দেশে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকোচন করায় বৈশি^ক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি উদ্বেগজনকভাবে কমছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক যৌথ প্রতিবেদনে জানায়, করোনাকালে বিশ্বের ৫০ কোটি মানুষ নতুন করে চরম দারিদ্র্যের শিকার হয়েছেন। ১৯৩০ সালের পর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকট চলছে বিশ্বজুড়ে। বৈশ্বিক অর্থনীতির এই অবনতি গোটা বিশ্বের দরিদ্র মানুষের বেঁচে থাকাকে কঠিন করে তুলছে।
দরিদ্রের জন্য কঠিন বিশ্বে করোনার অভিঘাতের মধ্যেই অস্ত্র ব্যবসা চাঙা হয়েছে। গত ৫ ডিসেম্বর স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) জানায়, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি অস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানি অস্ত্র বিক্রি করে ২০২১ সালে ঘরে তুলেছে ৫৯২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।