ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৫ ১০:১৭ এএম
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:৪০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ইলিশ মাছ রক্ষা আর হয়তো সম্ভব হবে না বলে আক্ষেপ করছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. আবু নঈম মুহাম্মদ আবদুছ ছবুর। তিনি বলেছেন, আমাদের কর্মকর্তারা দিন-রাত প্রজননকালে মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান চালাচ্ছেন। তারা একদিকে গেলে অপর পাশে জেলেরা নদীতে নেমে যাচ্ছেন। তারা নানা জায়গায় ওঁৎ পেতে থাকেন। একটু সুযোগ পেলেই নদী বা সাগরে চলে যায়। এভাবে ইলিশের প্রজনন ঠিক রাখা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, ইলিশ রক্ষায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিসহ সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ নাসির উদ্দীন শনিবার অভিযান পরিচালনা করতে গেলে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, আমরা গত শনিবার মেঘনায় অভিযানে গিয়েছিলাম। সেখানে হিজলা, মেহেদীগঞ্জ, ভোলা, হাইমচর, রায়পুরাসহ বেশ কয়েকটি উপজেলা। অন্যত্র যেখানে একটি জালে ১০ কেজি মা ইলিশ ধরা পড়ে, এখানে এক জালে ২০০ কেজি ইলিশ ধরা পড়ে। এই অঞ্চলে বেশকিছু জেলে রয়েছেন, যারা ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। তাদের কারণে স্থানীয় অন্য জেলেরাও তটস্থ থাকেন। আমরা বড় ৮টি স্পিড বোটে ৩৫ জন কোস্ট গার্ড সদস্য নিয়ে অভিযানে গিয়ে ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছি।
তিনি বলেন, এ অঞ্চলে ১ লাখ জেলে রয়েছে। মেহেন্দিগঞ্জে ৪০ হাজার জেলের মধ্যে ৪-৫ হাজার মাছ ধরতে যায়, হিজলায় ৩০ হাজার জেলের মধ্যে ৫ হাজার যায়। হাইমচরেও একই অবস্থা। এ স্থানটি মৎস্যসম্পদে ভরা। এখানে এক বোটে ৩০-৪০ জন জেলে থাকে। এসব জেলের সঙ্গে রামদা, ছুরি, বল্লম, চাইনিজ কুড়ালসহ দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র থাকে। তারা সরকারি স্পিড বোটে আগুনও ধরিয়ে দেন।
গত ৪-৭ অক্টোবর পর্যন্ত ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী জেলেপাড়ায় সরেজমিন পর্যবেক্ষণে জানা যায়, এ এলাকায় মাছ ধরা ও সামান্য কৃষিকাজ ছাড়া কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। মাছ প্রসেসিংয়ের কোনো কারখানা গড়ে ওঠেনি। ফলে নিষিদ্ধ সময়ে তারা নদী বা সাগরে চলে যায়।
তেঁতুলিয়া নদীর তীরে বাড়ি খলিলুর রহমানের। তিনি বলেন, আমাদের অঞ্চলের ৯০ শতাংশ জেলেই কোনো ধরনের ভিজিএফ কার্ড পাননি। আমি নিজেও জাল ঠিক করতেছি। রাতে এ জাল পাতব।
এলাকায় উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন রাজীব হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের ভোলায় অনেক ধনী মানুষ রয়েছে। কিন্তু কেউই এলাকায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেননি।
ইলিশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক গবেষক মো. আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, নিষিদ্ধ সময়েও অনেক জেলে নদী ও সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন। এদের শাস্তি দিয়েও ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, যেভাবে আইন অমান্য করে মা ইলিশ ধরা হচ্ছে, তাতে ৪-৫ বছরের মধ্যে ইলিশের আকাল দেখা দেবে। এজন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
গত সোমবার চট্টগ্রামে সচেতনতামূলক কাজ করছিলেন ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্যাহ। তিনি বলেন, মানুষের স্বভাব পাল্টাতে হবে। একটি মা ইলিশের পেটে লাখ লাখ ডিম থাকে। এটা কীভাবে খায়? আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। আমার মনে হয় মাত্র ১০ শতাংশ জেলে নিধেষাজ্ঞা মানছেন না। প্রচারণা আরও বাড়াতে হবে।
ভোলার ক্ষুদ্র জেলেদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে কোস্ট ফাউন্ডেশন। গবেষণায় দেখা গেছে, ভোলায় ১ লাখ ৭০ হাজার জেলে রয়েছে। এর মধ্যে ৮১ হাজার জেলে পরিবার এখনও সরকারি সহায়তা পাচ্ছে না। এমনকি সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রকৃত জেলে পরিবার ২০ হাজার বেশি। ভোলা সদরে ২৫ হাজার জেলে পরিবারের মধ্যে ৪৫ শতাংশের কার্ড নেই। তা ছাড়া ক্ষুদ্র জেলেদের মধ্যে সরকারি সহায়তার হার ২৪ শতাংশের কম। চলতি বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৩ শতাংশ জেলে পরিবারের কাছে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার ১-২ মাস পর সহায়তা পৌঁছেছে। ৮৭ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তাদের আয়ে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। এতে পারিবারিক কলহ সৃষ্টি হচ্ছে। নারীর ওপর সহিংসতা ৩০-৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। ৬৫ শতাংশ জেলে ঋণ শোধে পুনরায় দাদনের দ্বারস্থ হন। ৮৭ শতাংশ পরিবারের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৮ শতাংশ জেলে পরিবারের একজন কর্মক্ষম, ৬৭ শতাংশ জেলে অন্যের নৌকায় কাজ করেন।
এ ব্যাপারে কোস্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, এসব জেলেকে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। মাছ প্রসেসিংসহ বিভিন্ন ধরনের বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করতে হবে।
জাল যার, জলা তারÑ এই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার জেলেদের প্রয়োজনীয় ঋণসহায়তা দেবে কি নাÑ এ প্রশ্নে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, সরকার তো ঋণ দিতে চাচ্ছে না। জেলেরা যাতে সহজে ঋণ পান সে ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে দাদনের ওপর তারা আর কতকাল নির্ভর করবেন?
জেলেদের মাছ ধরতে যত ধরনের সহায়তা দরকার সরকার তা দেবে; পরে পর্যায়ক্রমে তারা তা শোধ করবে। এমন কাজ করা সম্ভব কি না জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, কৃষিঋণের একটি বিশাল অংশ মৎস্য খাতে যাতে দেওয়া হয়, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে প্রান্তিক লোকগুলোকে ঋণ দেওয়া হচ্ছে না। এজন্য আইন সহজ করা হচ্ছে, যাতে সহজে জেলেরা ঋণ পেতে পারেন।