সিপিডির সভায় বক্তারা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ১৭:৫২ পিএম
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিবার আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বন্যায়। ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত গত ৫ বছরে দেশে ৫৪.৬৯ শতাংশ পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ক্লাইমেট উইক-২৫ এ এসব তথ্য জানানো হয়।
শনিবার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী সেশনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন- পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন, বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. সৈয়দ আমির আহমেদ, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টিয়ান ব্রিক্স মুলার, ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো ডিয়েস ফেরেস। দ্বিতীয় অধিবেশনে সিপিডির বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য খুশি কবিরের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ সময় বক্তব্য দেন- পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ু) জিয়াউল হক প্রমুখ।
পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, কপ থেকে ফিরলে সাংবাদিকদের প্রশ্ন আমরা কত টাকা পেলাম বা পাচ্ছি। আমাদের কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধান হচ্ছে, টেকনোলজির ব্যবহার। তিনি বলেন, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরিত হতে হবে, যাতে পুরো জাতির জন্য একটি উদাহরণ সৃষ্টি হয়।
রিজওয়ানা হাসান জানান, পরিবেশ অধিদপ্তর বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বিভিন্ন অঞ্চলে সবুজ অফিস ভবন নির্মাণ করছে এবং স্থপতি ও প্রকৌশলীদের সহযোগিতায় জ্বালানি দক্ষ পরিবেশবান্ধব ভবনের মডেল তৈরি করছে। তিনি জানান, নবগঠিত বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ (বিসিডিপি)–এর অধীনে চারটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়েছে এবং সেখানে সিভিল সোসাইটি ও অ্যাকাডেমিয়ার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা কারিগরি ও নীতিগত সহায়তা দিতে পারেন।
ইটভাটার পরিবেশগত ক্ষতির প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বিকল্প নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের আহবান জানান, যা কার্বন নিঃসরণ কমাবে, কৃষিজমি রক্ষা করবে এবং পাহাড় কাটার প্রবণতা প্রতিরোধ করবে। তিনি উর্বর মাটির পরিবর্তে নদী খননের পলি ব্যবহার করে ইট তৈরির প্রস্তাব দেন।
অভিযোজন পদক্ষেপে গুরুত্ব দিয়ে রিজওয়ানা হাসান বলেন, উপকূলীয় বনায়ন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও স্বল্পব্যয়ী লবণাক্ততা অপসারণ প্রযুক্তি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের সহনশীলতা বাড়াতে অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে স্থানীয় সমাধান বাস্তবায়নে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানোর জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, নদী বা বাঁধ মেরামতের জন্য বছরে ৪০০ কোটি টাকা থাকে বালুর বস্তার জন্য। এই ভাঙন মোকাবিলায় নতুন কিছু বুদ্ধি দিতে হবে। তিনি বলেন, কপে প্রতিবছর একটা করে নতুন শব্দ ধরিয়ে দেওয়া হয়। আমরা সেই শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কাজ করবো কীভাবে।
অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, বিশ্বের ৫০ শতাংশ পুষ্টি সমুদ্র থেকে আসতে পারে। অথচ আমরা সমুদ্রের মাছ খাই না। তিনি বলেন, বোমা মেরে বাংলাদেশকে উড়িয়ে দিলেও মিটিগেশনের কিছুই হবে না। আমাদের করতে হবে অ্যাডাপ্টেশন। মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। বাঁধ ভাঙলে কোন প্রতিষ্ঠান ঠিক করবে? এসব নিয়ে হযবরল অবস্থা।
টেকনোলজি সম্পর্কে অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, নদীর ভাঙনরোধে জিও ব্যাগ ব্যবহার হয়। এর ভালো কোন প্রযুক্তি আমরা গ্রহণ করতে পারিনি। তা ছাড়া রেগুলেটরির টেকনোলজি বদলাতে হবে। কেননা ৯৯ শতাংশ রেগুলেটর কাজ করছে না। টেকনোলজির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয় একটা রিপোর্ট তৈরি করেছিল। এটি কোথায় আছে সেটি এখন খুঁজতে হবে।
সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট ফখরুদ্দিন আল কবির তার প্রবন্ধে জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে যেসব দুর্যোগ হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বন্যার কারণে। তিনি জানান, ২০১৫-২০ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে যেসব দুর্যোগ হয়েছে তার মধ্যে খরায় আক্রান্ত হয়েছে ৪.৭২ শতাংশ পরিবার, জলাবদ্ধতায় ১০.১৬, ঘূর্ণিঝড়ে ৩৪ শতাংশ, টর্নেডোতে ৫.২৮ শতাংশ, ঝড়/জলোচ্ছ্বাসে ২.২৬, বজ্রপাতে ১৪.২২ শতাংশ, নদী/উপকূলীয় ক্ষয় ১০.৪, ভূমিধসে ০.৪০ শতাংশ, লবণাক্ততায় ৩.২৭, শিলাবৃষ্টিতে ১৭.৮৩ এবং অন্যান্য খাতে ০.০৯ শতাংশ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।