বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ১০:৪৫ এএম
বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, জুলাই সনদে যেসব বিষয় নিয়ে ঐকমত্য হওয়ার দরকার ছিল, তা হয়নি। বিভিন্ন দলের মতপার্থক্য থাকতে পারে। তবে মৌলিক বিষয়ে সবার একমত হওয়া জরুরি। জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের পর গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তারা এসব কথা বলেন।
শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ঐতিহাসিক জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ রাজনৈতিক দলের নেতারা। এই অনুষ্ঠানে ২৫টি রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত থাকলেও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ও বাম ধারার চারটি দল অনুপস্থিত ছিল এবং সনদে স্বাক্ষর করেনি। এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি কেননা তারা জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি চায়। সনদে স্বাক্ষর না দেওয়া বামদলগুলোর তরফ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিকে প্রকারান্তরে ‘অস্বীকার’করা হচ্ছে এই সনদে। এ ছাড়া আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না, এমন বিষয়ে অঙ্গীকার করে সনদে স্বাক্ষর করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সনদে সবাই স্বাক্ষর করলে কি হতো? সব দল একমত হয়ে গেলে বাকশালের মতো অবস্থা হতো। আমরা নিশ্চয়ই তা চাইনি। বিভিন্ন দলের মতপার্থক্য ও আদর্শিক ভিন্নতা থাকবেÑ এটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ। সবাই এক হলে একদলীয় শাসনÑ বাকশালের মতো হয়ে যেত। তিনি প্রশ্ন রাখেন, তা হলে বাকশালের সমালোচনা কেন? জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, এসব বিষয় স্বাভাবিকভাবেই কেউ দ্বিমত করে না। তবে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হওয়ার দরকার ছিল তা হয়নি। গণভোট আহ্বানের প্রক্রিয়া ও সময় নিয়ে ঐকমত্য না হওয়ার বিষয়ে শাহদীন মালিক বলেন, গণভোট হয় সব সময় গুরত্বপূর্ণ বিষয়ে। এর আগে সংসদে একমত হওয়া, তারপর গণভোট আয়োজনের বিষয়টি আসে। কারণ এসব বিষয় সংসদে উত্থাপন না করে আগানো যায় না। সে ক্ষেত্রে একটি ধোঁয়াশা থেকে গেল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘যারা সনদে স্বাক্ষর করেনি তারা রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছে। এতে আমি কোনো অনৈক্য দেখি না। এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি) সনদে স্বাক্ষর দিয়ে তারপর এর গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ বা অংশ বাস্তবায়ন ও সংশোধনের দাবি তুলতে পারত। এ ক্ষেত্রে জামায়াত স্বাক্ষর দিয়ে রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে। এনসিপির স্বাক্ষর না দেওয়ায় জাতীয় নির্বাচনে কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। এতে বরং তরুণদের এই দলটি (এনসিপি) রাজনৈতিকভাবে শূন্যÑ তা প্রমাণ হলো। তারা যেকোনো বিষয়ে স্বতন্ত্র একটা অবস্থান নিতেই পারে। তবে নির্বাচিত সরকার এসে জুলাই সনদ বাধ্যবাধকতায় জায়গায়টি দুর্বল করে দিল। এনসিপিও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে গেল এবং বেকায়দায় পড়ল। এতে আগামীতে এনসিপির শক্ত বিরোধিতার জায়গা থাকল না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সব দল এক হলে ভালো হতো। যদিও সব বিষয়ে এক হওয়া সম্ভব না। এনসিপির জুলাই সনদে স্বাক্ষর না করার বিষয়ে তিনি বলেন, আগামীর রাজনীতিতে এর প্রভাব তো থাকবেই। প্রথম থেকে মনে হচ্ছিল কিছু ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো যা করতে পারেনি ছাত্ররা তা করে দেখিয়েছে। ১৯৪৮, ৬৯ সালসহ অতীতে ছাত্রদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। ৫ আগস্টের পর একটা কাঠামোগত সংস্কারের চেষ্টা করা হয়েছে, যা দরকার ছিল। তবে কোথাও নীরবে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ছাত্রদের বাদ দিয়ে কোনো দালিলিক সংস্কার করা ও ঐকমত্য তৈরি করা ঠিক হবে না। পরবর্তীতে এতে একটা বিভাজনের উপলক্ষ তৈরি হতে পারে। দেশের রাজনীতি ও জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। প্রবীণ এই অধ্যাপক বলেন, বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিলগ্ন পার করছে, এই সময়ে সকল রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সঠিক বোঝাপড়া জরুরি। সবকিছুতে ঐকমত্য হওয়ার পর সময়মতো জাতীয় নির্বাচন করে ফেলা জরুরি। তা না হলে দেশে সংকট তৈরি হতে পারে।