× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইতিহাসের বাঁকবদল ঘটল

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:০৬ এএম

ইতিহাসের বাঁকবদল ঘটল

ইতিহাসের বাঁক বদল ঘটল। সব জল্পনা-কল্পনা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে বহুল প্রতীক্ষিত ঐতিহাসিক জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫ স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বৃষ্টিবিঘ্নিত বিকালে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এই সনদে স্বাক্ষর করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। একই সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজসহ কমিশনের সদস্যরাও এ সনদে সই করেন। এই সনদে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র ও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। 

তবে ‘শর্ত পূরণ না হওয়ায়’ সংলাপে অংশ নেওয়া ৩০টি দলের মধ্যে সনদে স্বাক্ষর করেনি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ। এদিকে জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর হলেও এর বাস্তবায়ের পন্থা গণভোট কখন ও কোন পদ্ধতিতে আহ্বান করা হবে তা নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) নিয়েও ঐকমত্যে আসতে পারেনি দলগুলো। যদিও কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘আমরা আশা করি, এই যে জাতীয় দলিল তৈরি হয়েছে, তার বাস্তবায়ন ঘটবে। দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন ঘটবে।’ 

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়াও জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছেন বিএনপির পক্ষে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসানসহ বিভিন্ন দলের নেতারা। স্বাক্ষর করার পর সবার উদ্দেশে জুলাই জাতীয় সনদ তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। অন্যান্য দলের নেতারাও একই ভাবে সনদ তুলে ধরেন উপস্থিত অতিথি ও সাধারণ জনতার সামনে। 

বৃষ্টি ও বৈরী পরিস্থিতির কারণে কিছুটা দেরি করে বিকাল সাড়ে ৪টার কিছু পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শুরুর কিছু আগে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ। উপদেষ্টা পরিষদের অন্য সদস্যরাও এতে যোগ দেন। এ ছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ছাড়াও রাজনৈতিক দলের নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় তিন হাজার অতিথি এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। 

তিন দফা দাবিতে অবস্থান জুলাই যোদ্ধাদের

গতকাল বেলা ১টার দিকে জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দিয়ে একদল লোক অনুষ্ঠানস্থলে অবস্থান নেয়। সনদের আইনি ভিত্তি ও নিজেদের দায়মুক্তিসহ তিন দফা দাবিতে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদ সইয়ের মঞ্চে অবস্থান নেন তারা। একপর্যায়ে পুলিশ লাঠিপেটা করে সরিয়ে দেয় তাদের। এরপর পুলিশ ও জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়াধাওয়ির ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এই ঘটনায় জুলাই যোদ্ধাদের কয়েকজন আহত হন। তাদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা যায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগেই পুরো এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। 

অঙ্গীকারনামার পঞ্চম দফা সংশোধন

আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ-বিক্ষোভের মুখে তাৎক্ষণিকভাবে জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারনামার পঞ্চম দফা সংশোধন করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। বেলা ২টার দিকে কমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সংশোধনের কথা জানানো হয়। কমিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জুলাই বীর যোদ্ধাদের দাবির প্রতিফলন ঘটিয়ে সনদের অঙ্গীকারনামার পঞ্চম দফা সংশোধন করা হয়েছে। কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘জুলাই বীর যোদ্ধাদের সঙ্গে গতকালের আলোচনাসহ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর অঙ্গীকারনামার পঞ্চম দফাটিতে প্রয়োজনীয় জরুরি পরিবর্তন করা হয়েছে।

যা রয়েছে জুলাই সনদে

রাজনৈতিক দলগুলোকে জুলাই সনদের অনুলিপি দেওয়া হয়েছিল গত ১১ সেপ্টেম্বর। সেটিই চূড়ান্ত করে গত ১৪ জুলাই রাতে দলগুলোকে ফের দেওয়া হয়। তাতে খুব বেশি পরিবর্তন করা হয়নি। তবে সনদ স্বাক্ষরের দিন ‘জুলাই যোদ্ধাদের’ আন্দোলনের মুখে সনদের পাঁচ নম্বর অঙ্গীকার নামায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। সাত দফা অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে প্রণীত ৪০ পৃষ্ঠার এই সনদের তিনটি ভাগের মধ্যে রয়েছে- প্রথম ভাগে পটভূমি, দ্বিতীয় ভাগে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব ও তৃতীয় ভাগে সনদ বাস্তবায়নের ৭ দফা অঙ্গীকার। এই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি বিষয়কে ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কার’ এবং বাকি ৩৭টি বিষয়কে ‘আইন বা অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সংস্কার’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ঐকমত্য কমিশন। জুলাই সনদে পটভূমি ব্যাখ্যা করে সংস্কারযজ্ঞ নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম তুলে ধরার পর ১০টি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টসহ সংস্কারের ৮৪ দফা তুলে ধরা হয়েছে। 

সংবিধান সংস্কার করে বাস্তবায়িত বিষয়ের মধ্যে বাংলার পাশাপাশি অন্য ভাষার স্বীকৃতি, বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়, সংবিধান সংস্কারের বিধান, সংবিধান বিলুপ্তি ও স্থগিতকরণ ইত্যাদির অপরাধের অনুচ্ছেদ বাতিল এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধানে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের বিধান সংযুক্তি, মৌলিক অধিকারের তালিকা সম্প্রসারণ, উচ্চকক্ষ ও নিম্মকক্ষের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব সুনির্দিষ্টকরণ, রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়ায় সংশোধন এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে মামলার বাদী বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সম্মতি নেওয়ার বিধান যুক্ত করার কথা রয়েছে।

সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কিত অংশে প্রধানমন্ত্রী পদে এক ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর থাকার সীমা, প্রধানমন্ত্রীর দলীয় প্রধানের পদে না থাকা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার গঠন প্রক্রিয়া, কার্যাবলি ও মেয়াদ প্রভৃতি বিষয়ে সংবিধান সংশোধন করা হবে। একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব পালনের মেয়াদ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গঠন নিয়ে ৩০টি দল ও জোট একমত পোষণ করলেও প্রধানমন্ত্রী পদে দলীয় প্রধানের থাকা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ও গঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ভিন্নমত ও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার ক্ষেত্রে ২৫টি রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করেছে। পাঁচটি দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে। কমিশনের দেওয়া নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত ভোটে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবে ২৪টি রাজনৈতিক দল ঐকমত্য প্রকাশ করেছে। সেখানে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে বিএনপিসহ ৭টি দলের। 

বিচার ব্যবস্থা অংশে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্টের প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারপতি নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে ‘স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন’ গঠন ও এই কমিশনকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণ, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, সুপ্রিম কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ, সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালীকরণ, অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরি নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টকে দেওয়া এবং স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে। বাছাই কমিটি গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন এবং তাদের কাজের ক্ষেত্রে যেসব সংশোধনীর প্রস্তাব জুলাই সনদে রাখা হয়েছে, তাতে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট একমত পোষণ করেছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের বিধান হিসেবে ন্যায়পাল নিয়োগ, সরকারি কর্ম কমিশনে এবং মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগের ক্ষেত্রে সংস্কারের অঙ্গীকারও থাকছে জুলাই সনদে। 

যেভাবে প্রণয়ণ হলো সনদ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার গত ১২ ফেব্রুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সাত সদস্যবিশিষ্ট জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করে। 

গত মার্চ থেকে জুলাই মাস অবধি বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে ও বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে কমিশন ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’ চূড়ান্ত করে। এরপর সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর থেকে তৃতীয় দফায় সংলাপ শুরু হয়, যা শেষ হয় গত ৮ অক্টোবর। গত ১৪ অক্টোবর সনদের চূড়ান্ত অনুলিপি রাজনৈতিক দলগুলোকে পাঠায় কমিশন। এরপর জুলাই সনদ স্বাক্ষরের দিন গতকাল শুক্রবারও অঙ্গীকারনামার পঞ্চম ধারায় খানিকটা পরিবর্তন আনা হয়। গতকাল সনদ স্বাক্ষরের পর কমিশনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো গণভোটের সময় ও ভোট আহ্বানের পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোকে অভিন্ন অবস্থানে নিয়ে আসা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা