× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চায়ের কাপে বাড়ল খরচ

কাউসার আহমেদ, ঢাকা ও ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:০৫ এএম

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২০ এএম

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

সোনালি বাগানের সকাল, হাওয়ায় মিলছে ভেজা মাটির ঘ্রাণ আর চায়ের পাতা কেটে ওঠার শব্দ। কিন্তু এই স্বপ্নময় দৃশ্যে এখন লুকিয়ে আছে উদ্বেগের ছায়া। ৫০ গ্রামের ৩০ টাকার চায়ের প্যাকেট এখন ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ ভোক্তাদের জন্য চা খাওয়া যেন বিলাসিতা। আর শতাব্দীজুড়ে চা বাগানের শ্রমিকরা আজও তাদের স্বপ্ন, সন্তানদের পড়াশোনা আর মৌলিক অধিকার রক্ষার লড়াই চালাচ্ছেন। শ্রমিকদের দুশ্চিন্তা, মালিকপক্ষের প্রচেষ্টা এবং ভোক্তাদের কপালে ভাঁজ- এমন এক গোলকধাঁধার মধ্যেই এখন বাংলাদেশের চা শিল্পের বাস্তবতা। বিক্রেতারা বলছে, আমরা বেশি দামে চা পাতি কিনি কিন্তু যারা ক্রেতা তারা তো চায়ের দাম বেশি দিতে চায় না। ফলে এক কাপ চায়ে আমাদের যেখানে ৩ টাকা থাকত এখন এক টাকা থাকে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৮টি জেলার ১৭১টি চা বাগানের মোট ভূমির পরিমাণ ২ লাখ ৮৪ হাজার ৩১ একর। এর মধ্যে চা চাষযোগ্য ভূমির পরিমাণ ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৭৭ একর। ২০২৪ সালে দেশের ১৭১টি চা বাগান থেকে মোট উৎপাদন হয়েছে ৯৩ দশমিক ০৪ মিলিয়ন কেজি। চলতি বছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০৩ মিলিয়ন কেজি।

জানা যায়, দেশের সংকটে থাকা চা বাগানের সহায়তায় এবং চা শিল্পকে গতিশীল করার লক্ষ্যে ন্যূনতম নিলাম মূল্য বাড়িয়েছে বাংলাদেশ চা বোর্ড। চলতি বছরের নতুন এ মূল্য কার্যকর করা হয়েছে। চা পাতার গুণগত মানের ওপর ভিত্তি করে প্রতি কেজিতে ১০ টাকা থেকে ৮৫ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের ১৭১টি চা বাগানের মধ্যে অন্তত ৩০টি বাগান বন্ধ হয়ে গেছে। এই সংকট নিরসনে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের লিকার রেটিংয়ে মান-৫-এর মধ্যে ৪ ও ৪ প্লাস গ্রেডের চায়ের দাম কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৩১৫ টাকা এবং বটলিফে ২৯০ টাকা করা হয়েছে। মান ৪ মাইনাস গ্রেডের চায়ের দাম ২৮০ থেকে বৃদ্ধি করে করা হয়েছে ৩০৫ টাকা এবং বটলিফে ২৬০ টাকা। মান ৩ প্লাস চায়ের দাম ২৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ২৮৫ টাকা এবং বটলিফে ২৩০ টাকা।

মোহাম্মদ জনি নামের এক দোকানদার জানিয়েছেন, ৫০ গ্রামের প্যাকেটের চায়ের দাম পূর্বে ৩০ টাকা ছিল, যা বর্তমানে ৫০ টাকা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, কখনও এক মসের ব্যবধানে ১০ টাকা বাড়ালেও ১০ দিনের ব্যবধানে মোট ২০ টাকা বাড়ছে।

চা শ্রমিক হাসনাহেনা জানিয়েছেন, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা তো দুরের কথা আমাদের বেতন দিয়ে সংসার চালানো দায় হয়ে গেছে।

নিয়মিত চা পিয়াসী বাবলু হাসান বলেন, বাসায় চায়ের খরচ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। দাম বাড়ানো হয়েছে তাদের নিজ ইচ্ছায়। সরকারের তদারকি প্রয়োজন, না হলে আমাদের মতো চা-খোররা কষ্টে পড়বে।

স্ট্যাটিস্টিক্যাল হ্যান্ডবুক অন বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রি তথ্য অনুসারে, চা বাগানে শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজার ৭৪৭ জন। ২০১৮ সালে ১২০ টাকা, ২০২২ সালে ১৭৮ টাকা এবং ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট থেকে ১৮৭ টাকা ৪৩ পয়সা (দৈনিক ২৪ কেজি কাঁচা পাতা উত্তোলনের ক্ষেত্রে)।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) নিপেন পাল বলে বলেন, প্রায় পৌনে ২০০ বছরের এ শিল্পে কর্মরত শ্রমিকরা শুরু থেকে আজ অবধি নানা সংকটে নিপতিত। চা-শ্রমিকরা নানা সমস্যায় জর্জরিত। পৌনে ২০০ বছর ধরে এ দেশে বসবাস করলেও আমাদের নিজস্ব কোনো ভূমি নেই। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মাখন লাল কর্মকার বলেন, আমাদের সমস্যার অন্ত নেই। আমরা যেন নিজ দেশে পরবাসী। আমাদের নানাবিধ দাবির মধ্যে অন্যতম মূল দাবি হলো ভূমি অধিকার। চা বাগানের ভূমিতে যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় বসবাস করেও আমরা ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত। এ ছাড়া ২০ মে রাষ্ট্রীয়ভাবে 'চা-শ্রমিক' দিবস ঘোষণা আমাদের আরেকটি দাবি। আশা করছি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমাদের ভূমির অধিকার ও ২০ মে চা-শ্রমিক দিবস ঘোষণা দেবে।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগানের কারখানা ব্যবস্থাপক ফয়সল শামীম পাভেল বলেন, চায়ের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি চা শ্রমিকদের হাজিরাও (মজুরি) বেড়েছে। প্রতি ২৪ কেজি পাতা উত্তোলনের জন্য প্রায় ১০ টাকা করে হাজিরা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তথাপি চায়ের এ মূল্যবৃদ্ধির ফলে যেসব চা-বাগান বছরের পর বছর লোকসানে ছিল তাদের টিকে থাকার সুযোগ হলো।

ইস্পাহানী টি কোম্পানি লিমিটেডের মালিকানাধীন জেরিন চা বাগানের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সেলিম রেজা বলেন, ক্রমশ বাড়ছে চা-বাগানের আয়তন। দেশে চা উৎপাদন বাড়াতে সরকারের উৎসাহে বাগান মালিকরাও তাদের অনাবাদি জমিতে নতুন চারা রোপণ করছেন। বাগানের গাছের পরিচর্যা, কঠোর শ্রম, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ইত্যাদির মাধ্যমে দেশে চা-উৎপাদন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চলমান। নিলামে চায়ের মূল্যবৃদ্ধিতে ছোট ছোট বাগান লাভের মুখ দেখবে বলে আশা করছি।

ন্যাশনাল টি কোম্পানির পরিচালক মো. মহসীন মিয়া মধু বলেন, অমিত সম্ভাবনার অনুপাতে অনেকটা অর্জিত না হলেও এ শিল্পের অর্জনও একেবারে কম নয়। বিটিআরআই উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও জ্ঞান চা শিল্পে জেনেটিক মোডিফিকেশন ও মাইক্রোপোপাগেশনের মাধ্যমে চায়ের ক্লোন চারা রোপণে দেশে চা উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি সার, কীটনাশকসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। সরকার চায়ের নিলাম মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ায় অনেক বাগান টিকে থাকার সম্ভাবনা প্রবল হলো। গত বছরও বাগান পরিচালনায় অনেক বাগানের মালিকপক্ষকে হিমশিম খেতে হয়েছে।

বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশন সিলেট ব্রাঞ্চের চেয়ারম্যান জিএম শিবলী বলেন, দেশে চা উৎপাদনে এখন স্বর্ণালি সময় যাচ্ছে। অনুকূল পরিবেশ ও বাগান মালিকদের আন্তরিকতায় প্রতি ছরই বাড়ছে চায়ের উৎপাদন। চায়ের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষুদ্রায়তন চা বাগানের মালিকরা লাভবান হবেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা