সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ০৯:১৫ এএম
ফাইল ফটো
দেশের সমুদ্র পর্যটনের সিংহভাগই কক্সবাজার-কেন্দ্রিক। পর্যটকদের নিরাপত্তায় এক যুগ ধরে কাজ করছেন বেসরকারি সংস্থার লাইফগার্ড কর্মীরা। সরকারের অনুরোধে প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হলেও গত ৩০ সেপ্টেম্বর মেয়াদ শেষ হয়েছে দ্য সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) প্রকল্প। তাই কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের সুরক্ষায় এবার ট্যুরিস্ট পুলিশকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে সংস্থাটির অর্গানোগ্রামে লাইফগার্ড কর্মীর পদ সৃজনে চিঠি দিয়েছে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সিআইপিআরবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে গত ২৮ আগস্ট একটি বৈঠক হয় কক্সবাজারে। সেখানে প্রকল্পের মেয়াদ আরও বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু ওই বৈঠকে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফজলুর রহমান ও আন্তর্জাতিক সিনিয়র ম্যানেজার ড্যারেন উইলিয়াম প্রস্তাবটি গ্রহণ করেননি। এর বদলে সমুদ্রে নেমে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়া পর্যটকদের সুরক্ষায় সরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব দেন তারা। যদিও সিআইপিআরবিকে ইতোমধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গতকাল বৃহস্পতিবার মোবাইল ফোনে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পর্যটন) ফাতেমা রহিম ভীনা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সমুদ্র পর্যটনে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি বিষয়। ইতোমধ্যে সমুদ্র পর্যটনের ক্ষেত্রে ট্যুরিস্ট পুলিশের অর্গানোগ্রামে যাতে অন্তত ৬০ জনকে লাইফগার্ডের অন্তর্ভুক্ত করা হয়; বিষয়টি অবহিত করে তাদের গতকাল (বুধবার) চিঠি দেওয়া হয়েছে। আর সিআইপিআরবির প্রকল্পের মেয়াদ ছয় মাস বাড়াতে তাদের জানানো হয়েছে; যেহেতু ট্যুরিস্ট পুলিশের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ।
সিআইপিআরবির তথ্যমতে, ২০১৪ সাল থেকে কাজ শুরু করলেও ২০১৫ সাল থেকে সমুদ্রসৈকতে পর্যটকরা গোসলে নামার পর সমুদ্রে ভেসে যাওয়া থেকে উদ্ধারের তথ্য সংরক্ষণ করছে সিআইপিআরবি। ২০১৫ সাল থেকে চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৬ জন পর্যটক কক্সবাজার সৈকতে পানিতে ডুবে মারা গেছেন। এই সময়ে সিআইপিআরবির প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড কর্মীরা ৮২৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। ২০২৪ সালে রেকর্ড ১২ জন পর্যটক সমুদ্রে ডুবে মারা যাওয়ার পর চলতি বছর ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪ জন পর্যটক মারা গেছেন। চলতি অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে পর্যটন মৌসুম। প্রকল্প শেষ হওয়ার মাধ্যমে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত লাইফগার্ড কর্মীহীন হয়ে পড়লে আসন্ন শীতকালীন পর্যটন মৌসুমে সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
এ প্রসঙ্গে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসান বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে পর্যটকদের সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে যদি উদ্যোগ নেওয়া হয় তা ট্যুরিস্ট পুলিশও গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। যদিও প্রস্তাবনা পাস হওয়ার পদ সৃজন, জনবল নিয়োগের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ।’ কক্সবাজারের পর্যটকদের নিরাপত্তার ঝুঁকি এড়াতে উভয় মন্ত্রণালয়ের দ্রুত পরিকল্পনা হাতে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি বলেও মত দেন এই কর্মকর্তা।
২০১৪ সালে সি সেইফ প্রজেক্ট নামে সৈকতে পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা প্রদানে প্রকল্প শুরু করে দ্য সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ। কক্সবাজারের জনপ্রিয় তিনটি সমুদ্রসৈকতে ২৭ জন প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড কর্মী পর্যটকদের সেবা দিয়ে আসছে। জেলা প্রশাসন ও সিআইপিআরবির তথ্যমতে, কক্সবাজারে তিনটি সৈকতে লাইফগার্ড কর্মীরা কাজ করেন। ৯টি স্কি টিউব, ১টি রেসকিউ বোট দিয়ে ৫ ওয়াচ টাওয়ার থেকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমুদ্রের পানিতে নেমে বিপদে পড়া পর্যটকদের উদ্ধার করেন এসব কর্মী। এ ছাড়া সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার হিসাবে হাঁটুপানিতে নামার স্থান নির্ধারণে লাল ও লাল-হলুদ পতাকা উত্তোলন, হুইসেল প্রদানের কাজও করেন তারা। তবে তিনটি সৈকতের কথা বলা হলেও কর্মীর অভাবে এসব সৈকতের মাত্র অর্ধেক অংশই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম বলে জানিয়েছেন সি সেইফ লাইফগার্ড কর্মীরা।
সিআইপিআরবির সি সেইফ প্রকল্পের ফিল্ড টিম ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, প্রকল্পের অধীনে স্বল্প জনবল নিয়েও কক্সবাজারের মতো বিশাল একটি সমুদ্র উপকূলের মাত্র তিনটি পয়েন্টে লাইফগার্ড সদস্যরা কাজ করেন। তাও প্রতিটি বিচের মাত্র ৫০ শতাংশ আমাদের সদস্যদের আওতায় থাকে। সীমিত সুবিধা, প্রতিনিয়ত প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে আমাদের কর্মীরা সিদ্ধান্তহীনতায় আছে।
২০১৫ সাল থেকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন বিচ পয়েন্টে সমুদ্রে ভেসে যাওয়া পর্যটকের মৃত্যু ও উদ্ধারের তথ্য :
সাল মৃত্যু জীবিত উদ্ধার
২০১৫ ১০ ৯৫
২০১৬ ৬ ৫৬
২০১৭ ২ ২৮
২০১৮ ২ ৪৩
২০১৯ ৩ ৫৪
২০২০ ২ ৩৯
২০২১ ৩ ৭০
২০২২ ৬ ১১৫
২০২৩ ৬ ৯৯
২০২৪ ১২ ১৪৩
২০২৫ (১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) ১৪ ৮২
সর্বমোট : ৬৬ ৮২৪
সূত্র : সিআইপিআরবি
জানা যায়, সিআইপিআরবির সঙ্গে গত ২৮ আগস্ট আলোচনার পর বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে নিরাপদ সমুদ্র পর্যটন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণে একটি চিঠি দেওয়া হয়। ৩ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব একেএম মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিশেষত সমুদ্রসৈকত এলাকায় প্রতিবছর পর্যটকদের অসচেতনতা ও বেপরোয়া আচরণের কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধকল্পে নিরাপদ সমুদ্র পর্যটন নিশ্চিতকরণ এবং পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় থেকে ‘জরুরি সতর্কবার্তা’ প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রণীত জরুরি সতর্কবার্তা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রদর্শন, সমুদ্র পর্যটনে পরিষেবা প্রদানকারী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান/সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারের পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসাকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নিলেও পর্যটকদের সুরক্ষা ও নিরাপদ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমের অর্থ ব্যয় করে না। এজন্য প্রতিটি হোটেল-মোটেল মালিক কর্তৃপক্ষের লাইফগার্ড কর্মীর কাজে সম্পৃক্ততা, হোটেল-মোটেলসহ কক্সবাজার শহরে সচেতনতামূলক প্রচারণায় অংশ নেওয়ার বিষয়েও স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি ড্রোনের মাধ্যমে পর্যটকদের নিরাপত্তা প্রদানসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।